Thursday, October 6, 2016

খাদিজার অবস্থা অপরিবর্তিত

ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলমের চাপাতির কোপে মারাত্মক আহত কলেজছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। আর এ অপরিবর্তনই আশা জোগাচ্ছে চিকিৎসকদের। যদিও চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের পর থেকেই বলে আসছেন, ৭২ ঘণ্টা পেরোনোর আগে কিছুই বলা যাবে না। মঙ্গলবার দুপুরে স্কয়ার হাসপাতালে খাদিজার মাথায় অস্ত্রোপচার চালানো হয়। খাদিজার ওপর হামলার প্রতিবাদে সিলেট এখনও উত্তাল। বদরুলের ফাঁসির দাবিতে বুধবারও বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, সড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠন। বুকে ছিল কালো ব্যাজ। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানেও বিক্ষোভ হয়েছে। আর যথারীতি প্রতিবাদের ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর মধ্যেই এদিন বদরুলকে তোলা হয়েছে সিলেটের অতিরিক্ত মহানগর মুখ্য হাকিমের আদালতে। সেখানে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে সে। আদালতকে বদরুল জানায়, ‘খাদিজার সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
ওই সম্পর্ক অস্বীকার করায় ক্ষুব্ধ হয়ে আমি তাকে চাপাতি দিয়ে কোপাই।’ বুধবার হাসপাতালে খাদিজাকে দেখতে আসেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় চুমকি বলেন, ‘আমি মনে করি, এক্ষেত্রে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হামলাকারীর বিচার দ্রুত করা জরুরি। সে ক্ষেত্রে আমরা পদক্ষেপ নেব। সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সক্রিয়। আমাদের সরকার কোনোভাবেই অন্যায়কারীকে ছাড় দেবে না।’ খাদিজার চিকিৎসায় যখন যা প্রয়োজন তা সরকারিভাবেই করা হবে বলে জানান তিনি। চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাকে যত ভালো চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন তা দেয়া হচ্ছে।’ বদরুল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) শাখা ছাত্রলীগের ১ নম্বর সহ-সম্পাদক। তা সত্ত্বেও বুধবার আবারও সংগঠনটি দাবি করেছে, বদরুল শাবি ছাত্রলীগের কেউ নয়। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনের নেতারা এ দাবি করেন।
স্কয়ার হাসপাতালের মেডিসিন অ্যান্ড ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের কনসালট্যান্ট ও হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট মেডিকেল ডিরেক্টর ড. মির্জা নাজিম উদ্দিন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। তার অবস্থা সংকটাপন্ন। তবু আমরা এখনও আশাবাদী। তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের পর থেকে তার শারীরিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্লাড সার্কুলেশন, ব্লাড প্রেসার ও হার্টবিট একই পর্যায়ে আছে। যেহেতু শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি, তাই চিকিৎসক হিসেবে আমরা আশাবাদী। খাদিজাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশে নেয়ার মতো অবস্থায় সে নেই। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে অস্ত্রোপচার শুরু হয়ে সাড়ে ৫টার দিকে শেষ হয়। অস্ত্রোপচার দলের নেতৃত্ব দেন হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান সার্জন ডা. রেজাউস সাত্তার। ওই সময় ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন জানিয়েছিলেন, খাদিজার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। মাথায় ও হাতে অসংখ্য কোপের আঘাত রয়েছে। তিনি ঝুঁকিতে আছেন। এ ধরনের রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা শতকরা ৫ ভাগ। বদরুল ছাড় পাবে না বলে মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ওই বক্তব্যের বাস্তবায়ন দেখতে চান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রিয়াজুল হক। বুধবার সকালে খাদিজাকে দেখতে এসে তিনি বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুবা এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এ নৃশংস ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। এ ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটার প্রতিফলন আমরা বাস্তবেও দেখতে চাই। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, জনমনে যে ভীতি সঞ্চার হয়েছে সেই ভীতি দূর করা প্রয়োজন। ভীতি দূর করতে হলে এ ঘটনার বিচার জরুরি। এ ঘটনায় পুলিশকে দ্রুত চার্জশিট দেয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
বিক্ষোভ অব্যাহত : সিলেট ব্যুরো জানায়, সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা তিন দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিছিল বের করে। মিছিলটি চৌহাট্টা, রিকাবিবাজার, জিন্দাবাজার ঘুরে পুনরায় ক্যাম্পাসে এসে শেষ হয়। পরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এ সময় ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো চৌহাট্টা এলাকা। সড়ক অবরোধের ফলে চৌহাট্টা-জিন্দাবাজার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ আন্দোলনের আহ্বায়ক ফজিলাতুন্নেসা বলেন, আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের মা-বাবা আমাদের স্কুল- কলেজে পাঠান, কিন্তু আসলেই কি সেখানে আমরা নিরাপদ। কোপানোর সংস্কৃতি আজ কলেজেও ঢুকে গেছে। আর কত খাদিজা মরলে আমরা নিরাপত্তা পাব। হামলাকারী বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি আজ সিলেটের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ সফল করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। কলেজের শিক্ষকদের আশ্বাসে দেড় ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা। মঙ্গলবার বিক্ষোভ সমাবেশ করে তিন দফা দাবিতে ৩ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবিগুলো হচ্ছে- মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর, বদরুলের ফাঁসি নিশ্চিত করা এবং পরীক্ষার হল ও যাতায়াতের সময় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ঘটনাস্থল এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে সূর্যোদয় ফাউন্ডেশন। এ সময় বক্তারা বদরুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই দাবিতে মানববন্ধন করেছেন খাদিজার বাড়ি সদর উপজেলার বাসিন্দারা। দুপুরে টুকেরবাজার তেমুখীতে ‘সদর উপজেলার সচেতন নাগরিকবৃন্দ’র ব্যানারে আয়োজিত এ মানববন্ধনে একই কাতারে দাঁড়িয়ে বদরুলের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব স্তরের মানুষ। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ছাত্র নামধারী বখাটে নরপশু বদরুলকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন কামরান, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
খাদিজার ওপর বর্বর হামলা ও হত্যা চেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতারা। মঙ্গলবার যৌথ বিবৃতিতে সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, সিলেট মহানগর সভাপতি নাসিম হেসাইন ও সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সিলেট জেলা সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বদরুলের শাস্তির দাবি জানিয়ে খাদিজার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। ছাত্রলীগের সেই একই গান : শাবি প্রতিনিধি জানান, এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে সংঘটিত নৃশংসতায় ‘শাবি ছাত্রলীগকে জড়ানো ও ছাত্রলীগের সুনাম ক্ষুণœ করার’ প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি। বুধবার দুপুর ২টায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। এতে শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ এবং সাধারণ সম্পাদক ইমরান খানসহ সিনিয়র নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। ৮ মে কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত ১৫১ সদস্যের কমিটিতে ১নং সহ-সম্পাদক পদে নাম রয়েছে বদরুলের। এরপরও সে বর্তমানে ছাত্রলীগের কেউ নয় বলে সংবাদ সম্মেলনে ফের দাবি করেন ছাত্রলীগ নেতারা। লিখিত বক্তব্যে পার্থ বলেন, ‘ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শুধু নিয়মিত ছাত্ররাই সংগঠনের সদস্য হতে পারবে, চাকরিজীবীরা নয়। বদরুল চাকরিতে যোগ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংগঠন থেকে সদস্যপদ হারিয়েছে।’ তবে স্কুল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে ছাতকের আয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক বদরুল। অথচ তাকে পদ দেয়া হয়েছে সম্প্রতি।
সোমবার বিকালে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে সরকারি মহিলা কলেজের ডিগ্রি ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগম নার্গিসের ওপর হামলা চালায় শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষবর্ষের ছাত্র ও শাবি ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদরুল আলম। খাদিজা এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বদরুল ছাতক উপজেলার মুনিরজ্ঞাতি গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে এবং খাদিজা সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ আউশা গ্রামের সৌদি প্রবাসী মাসুক মিয়ার মেয়ে। সৌদি আরব থেকে দেশে আসছেন খাদিজার বাবা : সিলেট ব্যুরো জানায়, ছাত্রলীগ নেতার হাতে গুরুতর আহত সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা বেগম নার্গিসের বাবা দেশে আসছেন। মেয়ের ওপর নৃশংস হামলার খবর শুনে পাগলপ্রায় পিতা মাসুক মিয়া সৌদি আরব থেকে রওনা দিয়েছেন। এদিকে, একই দিন দেশে আসছেন খাদিজার বড় ভাই শাহীন আহমদ। তিনি চীনে চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়নরত আছেন। বোনের দুঃসময়ে পাশে থাকতে দেশে ছুটে আসছেন তিনি। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কুয়েত এয়ারওয়েজের একটি বিমানে মাসুক মিয়া সৌদি আরব থেকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছবেন বলে জানান খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস। তিনি বলেন, খাদিজার বাবা মুঠোফোনে জানিয়েছেন, আমার পরিবার নিরাপদে নেই, তাই আমি দেশে ফিরছি। হামলাকারী বদরুলের কঠিন শাস্তির দাবি জানিয়েছেন খাদিজার বাবা।

No comments:

Post a Comment