Wednesday, October 19, 2016

জিরো টলারেন্স দুর্নীতিতে

সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করছেন বিশ্বব্যাংকের
প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম -যুগান্তর
উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের অবস্থান জানিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছেন, আমাদের এ ভূমিকা বিশ্বব্যাপী একই। প্রত্যেকটি প্রকল্পই দুর্নীতিমুক্ত থাকা উচিত। এ ছাড়া তিনটি বিষয়ে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এর অন্যতম হচ্ছে, সব ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগ, সরকারি ব্যাংক, রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের নতুন নতুন সহায়তার কথা ঘোষণা করে তিনি বলেন, আগামী ৩ বছরের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দেয়া হবে। এর আগে সোমবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আগামী ৩ বছরে বাংলাদেশের জন্য ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুর অপুষ্টি রোধে আগামী ২ বছরে বাড়তি ১০০ কোটি ডলার সহায়তার ঘোষণা দেন তিনি।
সব মিলিয়ে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চুক্তি ডিসেম্বরে হবে আশা করছেন তিনি। মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিশ্বব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বাতিল সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে জিম ইয়ং কিম দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে কথা বলেন। এ সময় বেসরকারি খাতে অধিক বিনিয়োগের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সংক্রান্ত নীতি সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন, ঢাকায় নিযুক্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান, আইএফসির পরিচালক মিনজিতসু আলামায়েতু এবং ঢাকা অফিসের যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরিন এ মাহবুব উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের আগে জিম ইয়ং কিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সকালে তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প পরিদর্শনে বরিশাল সফর করেন। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত হবে বাংলাদেশ। এর আগে নিু আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ে যেতে বাংলাদেশ অনেক কিছু মোকাবেলা করছে। তিনি বলেন, আমরা তিনটি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। প্রথমটি হচ্ছে, বাণিজ্য পরিবেশ উন্নয়নে নীতির সংশোধন করা।
বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগ বাংলাদেশে কম আসছে। বেসরকারি খাতে যদি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হয়, সে ক্ষেত্রে অবকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পে অর্থায়ন বেশি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগ, সরকারি ব্যাংক, রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সাইক্লোন ও বন্যাকে হুমকি মনে করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের দিক থেকে বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক সহায়তা করবে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছালে বিশ্বব্যাংকের ঋণের সুদের হার সমন্বয় করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে জিম ইয়ং কিম বলেন, মধ্যম আয়ের দেশের জন্য উচ্চ সুদ এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্য সুদেও ঋণ দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে সুদের হার সমন্বয় করা হবে। তবে বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের রেকর্ড ভালো। সুদ সমন্বয় করা হলেও সেটি ২ শতাংশের বেশি হবে না। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগে বিশ্বব্যাংক ঝুঁকি মনে করছে কিনা সংবাদিকদের এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নিরাপত্তা বিষয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট। তবে বিশ্বের কোনো দেশেই সন্ত্রাসের ঝুঁকি মুক্ত নয়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোও সম্প্রতি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে।
আগামীতে বাংলাদেশে কোন কোন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন বলেন, আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন, যোগাযোগ এবং জলবায়ু খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। এসব পরিকল্পনা সরকারের গৃহীত সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিশ্রুতির অনেকাংশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় আস্থা সংকট তৈরি হয় কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বের ১৮৯টি সদস্য দেশই বিশ্বব্যাংক পরিচালনা করছে। সেখানে বাংলাদেশের শক্ত অংশগ্রহণ রয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো গোপনীয়তার বিষয় থাকছে না। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) ফান্ড থেকে সহায়তা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আইডিএর প্রতিশ্রুতি রয়েছে ৯৭০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪০০ কোটি ডলার ছিল। একই সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) বিনিয়োগ গত অর্থবছর ৬৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০১২ সাল পর্যন্ত এটা ছিল ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আগামীতে এ দুই ক্ষেত্রেই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বরিশাল সফর সম্পর্কে বলেন, সেখানে স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার ও সাইক্লোন শেল্টার একই ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। এটি শিক্ষণীয় বিষয়। প্রশংসা করে তিনি বলেন, সামনে বাংলাদেশের জনগণের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। ৩ দিনের সফর শেষে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার রাতেই ঢাকা ত্যাগ করেন।

No comments:

Post a Comment