Wednesday, October 19, 2016

ত্যাগের মধ্য দিয়ে মহান উদ্দেশ্য অর্জিত হয়

কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে মঙ্গলবার শেখ রাসেলের
জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -যুগান্তর
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু-কিশোরদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া শিখে নিজেদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলে দেশের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আজকের শিশু এবং আগামী দিনের কর্ণধারদের আমি বলব, দেশের জন্য জাতির জন্য সব সময় যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ মহান ত্যাগের মধ্য দিয়েই যে কোনো মহান উদ্দেশ্য অর্জন করা যায়, জাতির পিতা এটাই আমাদের শিখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঙ্গলবার রাজধানীর কৃষিবিদ মিলনায়তনে শেখ রাসেলের ৫২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘শেখ রাসেল শিশু-কিশোর পরিষদ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।
শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমি শুধু আমাদের ছেলেমেয়েদের একটা কথাই বলব, সবাইকে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। কারণ এদেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার তোমরাই। তাই তোমাদের আজকের বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই না এদেশে কোনো জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ থাকুক। কারণ এই জঙ্গিবাদের সত্যিকার আঘাতটা আমরাই পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি চাই এদেশ একটি শান্তির দেশ হবে। উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হবে। আমি জানি এটা অর্জন করা খুব কঠিন। আজকে বাংলাদেশ যে পর্যায়ে এসেছে তা আনতে প্রচণ্ড কষ্ট করতে হয়েছে। অনেক সংগ্রাম-ত্যাগ করতে হয়েছে। তিনি গুরুজনকে সম্মান জানানোর জন্য আগামী প্রজন্মের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, পিতা-মাতা, শিক্ষক তাদের সম্মান করতে হবে। বড়দের কথা শুনতে হবে। নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। আর মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। কারণ শিক্ষিত না হলে একটা জাতি উন্নতি করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ জন্যই আমরা প্রযুক্তি শিক্ষাকে সব থেকে গুরুত্ব দিয়েছি। একটা মানুষও এদেশে ক্ষুধার্ত থাকবে না, গৃহহারা থাকবে না, শিশুরা শিক্ষার জন্য সবাই স্কুলে যাবে। মানুষের মতো মানুষ হবে। তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ হবে- এ ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। শেখ রাসেল শিশু-কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রাকিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী,
সংগঠনের উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মোল্লা এমপি, মহাসচিব মাহমুদুস সামাদ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক মুজাহিদুর রহমান এবং লায়ন মো. মজিবুর রহমান হাওলাদার। সংগঠনের ঢাকা মহানগরীর সভাপতি কেএম শহীদুল্লাহ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন। শিশু নাফিস বিন নাদিম শিশুদের পক্ষে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ’৬৪ সালে রাসেলের যখন জন্ম হয় তখন আব্বা (বঙ্গবন্ধু) নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ফাতেমা জিন্নাহকে সর্বদলীয় বিরোধী দলের প্রার্থী করে প্রচারণা চালাচ্ছে। আব্বা তখন নির্বাচনের কাজে চট্টগ্রামে। আইয়ুব খানের মার্শাল ল’র যুগ সেটা। সেই সময় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে রাসেলের জন্ম হয়। জন্মলগ্ন থেকে সবার মাঝে বেড়ে উঠলেও পিতৃস্নেহ সে খুব কমই পেয়েছে। ’৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিলেন এই ৬ দফা প্রচার করতে গিয়ে বারবার তাকে গ্রেফতার হতে হয়েছে। ৮ মে ছোট্ট রাসেলের কাছ থেকে তার বাবাকে গ্রেফতার করে নেয়ার পর ’৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান। সেই ছোট্ট রাসেলকে কিন্তু সব সময় পিতার স্নেহবঞ্চিতভাবে বড় হতে হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, যখনই আমরা কারাগারে যেতাম দেখা করতে তাকে (রাসেল) নিয়ে আসা কঠিন ছিল। অনেক কষ্ট করে তাকে নিয়ে আসতে হতো।
তখন তো কথাও বলতে শুরু করেনি। এরপর যখন রাসেল কথা বলতে আরম্ভ করল সে বাবাকে খুঁজে বেড়াত। তাই হয়তো খেলার সময়ও কিছুক্ষণ পরপর সে বাবাকে একবার দেখতে যেত, তার মনে হয়তো হারানোর ভয়টা কাজ করত। প্রধানমন্ত্রী বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, মাঝে মাঝে মা রাসেলকে সান্ত্বনা দিত- আমিই তোমার বাবা, আবার আমিই তোমার মা। এরপর যখন কারাগারে আমাদের সঙ্গে বাবাকে দেখতে যেত, সে একবার বাবাকে আব্বা বলে ডাকত আবার একবার মাকে আব্বা বলে ডেকে হতবিহ্বল হয়ে পড়ত। এভাবেই ছোট্ট রাসেল বেড়ে উঠেছে। এরপর ’৬৮ সালে বাবাকে ক্যান্টনমেন্টে ৬ মাস বন্দি করে রাখল, আমরা তার কোনো খবর পাইনি, তিনি বেঁচে আছেন কিনা সে খবরও আমাদের কাছে ছিল না। তখন শিশু রাসেল মাঝে মাঝেই রাতে খুব কান্নাকাটি করত। আমরা সবাই আসতাম তাকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তুু আমরা কি সান্ত্বনা দেব, আমরাও তো বাবার স্নেহবঞ্চিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন ধানমণ্ডি ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে বন্দি থাকাবস্থায় সঙ্গীহীন রাসেলের দুঃসহ জীবনের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর কেবল সাড়ে ৩ বছর সে পিতৃস্নেহ পেলেও ঘাতকদের নির্মম বুলেটে তাকে শাহাদতবরণ করতে হয়েছে।
ঘাতকরা তাকেও ছাড়েনি। সবার শেষে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করল। কত ছোট্ট একটা জীবন রাসেলের। একটা উদ্দেশ্য হয়তো ঘাতকদের ছিল, বঙ্গবন্ধুর রক্তের কাউকে বাঁচিয়ে না রাখা। সবার শেষে এই অবুঝ শিশুটিকেও কষ্ট দিয়ে তারা হত্যা করল। চিরকালই পিতৃস্নেহবঞ্চিত রাসেলকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সব সময় ব্যস্ত থাকতাম লেখাপড়া নিয়ে। বাবা কারাগারের বাইরে থাকলে ব্যস্ত থাকতেন তার সংগঠন নিয়ে। মা সংসার সামলানো ছাড়াও বাবার মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। কাজেই রাসেলকে অনেক সময় একা বাড়িতে থাকতে হতো, সেই সময়টা ওর জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। তিনি বলেন, তারপরও আমরা যতটুকু সময় পেতাম ওকে (রাসেলকে) সময় দিতে চেষ্টা করতাম। আজকে বেঁচে থাকলে কত বড় হতো? সেটা মাঝে মধ্যেই চিন্তা হয়। রাসেলের নামকরণ বিখ্যাত মনীষী বার্ট্রান্ড রাসেলের নামানুসারে রাখা মর্মে স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, রাসেলের নামটি আমার মায়েরই রাখা। সে সময় তাদের বাড়িতে বই পড়ার রেওয়াজ ছিল। বঙ্গবন্ধু সময় পেলেই কবিতা আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতেন। বার্ট্রান্ড রাসেলের বইগুলো থেকে তরজমা করে মাকে শোনাতেন। তার ফিলোসফি আব্বার খুব পছন্দ ছিল।
আমার মা খুব জ্ঞানপিপাসু ছিলেন, লেখাপড়ার তেমন সুযোগ না পেলেও আব্বার বাংলা তর্জমা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শুনতে শুনতে তিনিও রাসেলের ফিলোসফির প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন এবং রাসেল জন্মানোর পর তার নাম রাসেল রাখেন। শেখ হাসিনা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায় স্মরণ করে বলেন, ওই ধানমণ্ডির বাড়ির সিঁড়িতে পড়ে আছে পিতার লাশ, নিচে পড়ে আছে ভাইয়ের লাশ, মায়ের লাশ, সেখান থেকে নিয়ে রাসেলকেও হত্যা করা হল। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটুক আমরা চাই না। কারণ ১৫ আগস্ট যে ঘটনা ঘটেছে একমাত্র কারবালার ঘটনার সঙ্গেই এর তুলনা চলে। কারবালাতেও হয়তো শিশুদের এভাবে হত্যা করা হয়নি। কিন্তু এখানে অসহায় নারী, সন্তান সম্ভবা স্ত্রী, শিশু কাউকেই বাদ দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ইনডেমনিটি আইন করে বঙ্গবন্ধু, বেগম মুজিব, শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের বিচারের পথ রুদ্ধ করায় জিয়াউর রহমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও সে সময় জিয়া সরকার কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়ার মাধ্যমে পুরস্কৃত করাকে কোনো সভ্য সমাজের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

No comments:

Post a Comment