Saturday, October 1, 2016

একের পর এক মিথ্যের পাহাড় বানাচ্ছি

মেহতাব খানম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম। তিনি আপনার মানসিক বিভিন্ন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান দেবেন। অল্প কথায় আপনার সমস্যা তুলে ধরুন।—বি. স. 
সমস্যা
আমার বাবা-মা চান, আমি যেন চিকিৎসক হই। অন্তত বেসরকারি মেডিকেল কলেজে হলেও যেন পড়ালেখা করি। এ জন্য আমাকে কোচিংয়ে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু মেডিকেলের ফরম পূরণ করার মতো জিপিএ আমার আসেনি। বাবা-মায়ের এত দিনের স্বপ্ন আর এত দিন এতগুলো টাকা খরচ করে এসেছি, এই ভয়ে আমি বাবা-মাকে জিপিএ অনেক বাড়িয়ে বলেছি। তা ছাড়া, আমি আমার বাবাকে অনেক ভয় পাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফরম পূরণ করার মতো জিপিএ এসেছে। তাই আমি কাউকে না জানিয়ে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাবা-মা জানে, আমি সামনে মেডিকেল পরীক্ষা দেব আর আমি এদিকে একের পর এক মিথ্যের পাহাড় বানাচ্ছি। এখন এক মানসিক অস্থিরতায় ভুগছি।
সাব্বির আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
পরামর্শ
শুধু বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য তুমি মেডিকেলে পড়ার কথা ভাবছিলে, নাকি নিজেও একজন ডাক্তার হিসেবে মানুষের সেবা করতে চেয়েছ? সেটি খুব ভালোভাবে ভেবে দেখবে, কেমন? কারণ তোমার চিঠিতে কোথাও উল্লেখ নেই, তুমি নিজেকে আজ থেকে ৫ কিংবা ১০ বছর পর কোথায় দেখতে চাইছ। শৈশব থেকে তোমার জীবনের আরও কোনো লক্ষ্য নিয়ে ভেবেছ কি না। সন্তানেরা যখন বাবা-মায়ের জীবনে আসে, তখনই কিন্তু তারা সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে একটি বড় উপহার হিসেবেই আসে। কাজেই বাবা-মায়েরও দায়িত্ব হচ্ছে শুধু তাদের নিজেদের স্বপ্নপূরণের কথা না ভেবে সন্তানকে ভাবতে সাহায্য করা, তার আগ্রহ এবং প্রবণতার জায়গাগুলো বুঝতে চেষ্টা করা। সন্তানটি নিজেকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখছে, সেটি তাদের সঙ্গে আলোচনা করা। যেমন কেউ যদি অঙ্কে দুর্বল হয় এবং তার বাবা-মায়ের ইচ্ছেতে সে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে, তাহলে তার পক্ষে ভালো ফল করা কখনোই সম্ভব হবে না। বাবার সঙ্গে তোমার এত ভয়ের সম্পর্ক না হলে খুব ভালো হতো। তাঁরা যদি তোমার সঙ্গে ছোটবেলা থেকে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন,
তাহলে এত বড় একটা মিথ্যে তোমাকে বলতে হতো না। তাঁরা যখন সত্যটা জানবেন তখন খুব কষ্ট পাবেন, তা তুমি বুঝতে পারছ। এ কারণেই একটি মিথ্যেকে ঢাকতে গিয়ে তোমাকে ক্রমাগত বানিয়ে অনেকগুলো কথা বলতে হচ্ছে। এটি এখন যেমন তোমার জন্য খুব পীড়াদায়ক, তেমনি অপরাধবোধও তৈরি হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের জন্যও খুব কঠিন হবে এটি মানতে যে তাঁদের আদরের সন্তান এ ধরনের একটি কাজ করেছে। মনের এই অস্থিরতা নিয়ে তুমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার জন্যও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছ না, তাই নয় কি? কাজেই আমার অনুরোধ হচ্ছে, তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে সত্য কথা বলে দাও। এতে করে তোমার মন থেকে ভারী বোঝা নেমে যাবে এবং তুমি অনেক হালকা বোধ করে বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারবে। তাঁরা প্রথমে রাগ করবেন এবং অনেক দুঃখও প্রকাশ করবেন। তবে শেষ পর্যন্ত নিশ্চয়ই বুঝতে চেষ্টা করবেন যে তুমি আসলে তাঁদের খুব ভালোবাস বলেই তারা কষ্ট পাক সেটি একেবারেই চাও না। সন্তান অনেক বড় অন্যায় করে ফেললেও শেষ পর্যন্ত শুধু বাবা-মা-ই তাদের আবার নিঃশর্তভাবে ভালোবাসা দিতে এবং তাদের গ্রহণ করে নিতে পারেন।

No comments:

Post a Comment