Sunday, October 9, 2016

চীনা প্রেসিডেন্টের সফর আমাদের জন্য বড় সুযোগ

আশফাকুর রহমান
* সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো :চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে আসছেন। বলা যায়, বহুদিন পর একজন চীনা শীর্ষ নেতা বাংলাদেশে আসছেন। এই সফরের বার্তাটি কী?
আশফাকুর রহমান : অনেক বছর পর চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায় উদ্দীপনারও। চীনের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। চীনকে আমরা আমাদের পাশে চাই। শি জিনপিংয়ের এই সফরকে আমি শুধু একটি বন্ধুদেশের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর বলে মনে করি না। এটি আরও বাড়তি কিছু। চীনের কাছ থেকে আমাদের পাওয়ার অনেক কিছু রয়েছে, আবার দেওয়ারও রয়েছে।
প্রথম আলো :বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো। এই বাস্তবতায় এ অঞ্চলের ভূরাজনীতি বিবেচনায় নিলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক আসলে কোন পর্যায়ে রয়েছে?
আশফাকুর রহমান : চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন বিষয় নয়। আমাদের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ও যোগাযোগ দুই হাজার বছরের পুরোনো। চীনের পর্যটকেরা এ অঞ্চলে এসেছেন, অনেকে এখানকার বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে এসে ধর্মশিক্ষা নিয়ে গেছেন। দুই দেশের সম্পর্ক ও যোগাযোগের একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কয়েক বছর আমাদের সম্পর্কের মধ্যে একটি ছেদ পড়েছিল বলতে পারেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পঁচাত্তরের পর এটি আনুষ্ঠানিকতা পায়। চীনের সঙ্গে আমাদের যে আত্মিক সম্পর্ক, তা অব্যাহত আছে এবং এর মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
প্রথম আলো :চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে আপনি আমাদের জন্য উদ্দীপনামূলক বললেন, কোন বিবেচনা থেকে?
আশফাকুর রহমান : চীনের এই নেতা আগেও বাংলাদেশ সফর করেছেন, তবে তখন তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আমরা শি জিনপিংকে চীনের নতুন প্রজন্মের একজন নেতা হিসেবে জানি। তিনি একজন প্রকৃত ও দলের নিচ থেকে পর্যায়ক্রমে এবং ধারাবাহিকভাবে উঠে আসা নেতা। দেশে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয় একজন নেতা হিসেবে বিবেচিত। তাঁর এই সফরকে আমি আলাদা গুরুত্ব দিতে ও বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখতে চাই। কারণ, আগেই বলেছি আমি মনে করি, চীনের কাছ থেকে আমাদের পাওয়ার অনেক কিছু রয়েছে। আসলে বিষয়টি দেওয়া ও নেওয়ার। আমরা যেমন পেতে চাই, তেমনি দিতেও আমাদের তরফ থেকে আপত্তি থাকা উচিত নয়। এই সফর সেই পথকে সহজ করবে।
প্রথম আলো :চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরের সময় চীনের আর্থিক সহায়তায় বেশ কিছু প্রকল্পের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে শোনা যাচ্ছে।
আশফাকুর রহমান : আমি যতটুকু জেনেছি, ১৫ থেকে ২৩ বিলিয়ন ডলারের চীনা সহায়তায় বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক সই হবে এই সফরের সময়। ফলে এই সফর নিয়ে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। চীনের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে আমরা প্রস্তুত।
প্রথম আলো :চীন-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে?
আশফাকুর রহমান : সীমান্ত নিয়ে পুরোনো বিরোধ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে চীন-ভারত সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো। বাণিজ্য সম্পর্ক ভালো, কৌশলগত সম্পর্ক ঠিকভাবে বজায় রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে যে বিরোধ, তা দুই পক্ষই পাশে রেখে দিয়েছে, বলা যায় সে ক্ষেত্রে একধরনের স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে।
প্রথম আলো :কিন্তু এ অঞ্চলে চীনের শক্তিশালী অবস্থান ভারতের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক? সম্প্রতি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার চুক্তি করেছে। এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটুকু ঘনিষ্ঠ করা সম্ভব?
আশফাকুর রহমান : আসলে এই ক্ষেত্রে আমি সব কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দিতে চাই। তিনি যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গে বিষয়গুলো সামাল দিতে পারছেন। সব বড় দেশের সঙ্গে তিনি আমাদের শর্তেই ভালো সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব বজায় রেখে চলেছেন। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো, চীনের সঙ্গে ভালো, রাশিয়ার সঙ্গে ভালো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক ঠিক পর্যায়েই রয়েছে। ফলে আমাদের উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক স্বার্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতে কোনো সমস্যা হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের যেহেতু সম্ভাবনা আছে, ফলে দেশগুলো তাদের স্বার্থেই আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব বজায় রাখবে। এতে সব পক্ষই নিজেদের মতো করে লাভবান হবে।
প্রথম আলো :চীনের তরফ থেকে বড় ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার কথা শোনা যাচ্ছে, আপনিও বললেন। কিন্তু চীনেরও তো আমাদের কাছ থেকে চাওয়া রয়েছে, সেগুলো কী?
আশফাকুর রহমান : ভৌগোলিক অবস্থান এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চীনের কুনমিং থেকে বেইজিং যেতে উড়োজাহাজে যেখানে তিন ঘণ্টা লাগে, সেখানে আমাদের চট্টগ্রাম আসতে লাগে দুই ঘণ্টা। এত কাছের দুটি দেশ। আমাদের সমুদ্র আছে, সমুদ্রবন্দর আছে ও সেই সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ আছে এবং মনে রাখতে হবে, আমাদের বন্দর হচ্ছে ওয়ার্ম ওয়াটার বন্দর। বাংলাদেশের এই যে সম্ভাবনা, তা চীনের জন্যও বড় সম্ভাবনা। আমরা যদি আমাদের এই ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারি, তবে আমাদের জন্য তা যেমন অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি এনে দেবে, তেমনি চীনও লাভবান হবে। ফলে বন্দর বা যোগাযোগের যে সুবিধাগুলো চীনের জন্য লাভজনক হবে, তা কাজে লাগিয়ে আমরাও লাভবান হতে পারি। এসবই চীনের তরফে আমাদের কাছ থেকে চাওয়া।
প্রথম আলো :চীন বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পরিকল্পনামন্ত্রী পরে বলেছেন যে ভারতের আপত্তির কারণে তা হয়নি। বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর তো কার্যত অচলাবস্থার
মধ্যে রয়েছে।
আশফাকুর রহমান : কথা হচ্ছে, যে বা যারাই করুক, গভীর সমুদ্রবন্দর আমাদের লাগবে। যে দেশের সক্ষমতা আছে, যারা তা আমাদের বানিয়ে দিতে পারবে, তাদের সাহায্য নিয়েই তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমি মনে করি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। চীনের প্রেসিডেন্ট আসছেন, এসব নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রথম আলো :এ রকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বেশি। এই অবস্থায় কি পরিবর্তন এসেছে?
আশফাকুর রহমান : অবশ্যই। চীনের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতা বেশি, এটা একটা ধারণা। নানা কারণে কোনো দলের সঙ্গে কোনো দেশের ঘনিষ্ঠতা থাকে। তবে কূটনীতির হিসাব-নিকাশে বিষয়টিকে সেভাবে দেখা যায় না। দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক ও স্বার্থের বিষয়টিই বিবেচনায় নেওয়া হয়। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বদলায়। কূটনীতি ও দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক একটি পরিবর্তনশীল বিষয়। এটা কখনো এক জায়গায় আটকে থাকে না। বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক যে যথেষ্ট ভালো, তার প্রমাণ হচ্ছে চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর।
প্রথম আলো :ব্রহ্মপুত্র নদে বাঁধ দেওয়া ও সেখান থেকে পানি প্রত্যাহার নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের বিরোধের কথা আমরা জানি। যৌথ নদী নিয়ে অববাহিকার সব দেশ মিলে নদী ব্যবস্থাপনার কথা আমরা বিশেষজ্ঞদের মুখে শুনে আসছি। এ ধরনের উদ্যোগে চীনকে যুক্ত করার বিষয়টি কতটা বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন?
আশফাকুর রহমান : ব্রহ্মপুত্র নদে চীনের বাঁধ দেওয়া বা পানি প্রত্যাহারের উদ্যোগের পর ভারত হয়তো বুঝতে পেরেছে যে নদীর নিচের দিকে যে দেশগুলোর অবস্থান, তারা এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী সমস্যার মধ্যে পড়ে। যৌথ নদীর পানির ওপর সংশ্লিষ্ট সব দেশেরই অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে চীন বা ভারতসহ সব দেশেরই পানির সংকট রয়েছে। ফলে এই দেশ দুটি যদি নিজেদের মতো করে পানির চাহিদা পূরণ করতে চায়, তবে আমরা সমস্যায় পড়ব, এটা খুবই স্বাভাবিক। এই অঞ্চলে যে পানিসম্পদ রয়েছে, তার যুক্তিসংগত ভাগাভাগির বিষয়টি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব দেশ মিলে তা করতে পারলে খুবই ভালো। তবে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সমস্যাটি দ্বিপক্ষীয়ভাবেই সমাধান করতে চায়। ভারত এই উদ্যোগে চীন বা অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আমলে নেবে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমাদের স্বার্থ আমাদের দেখতে হবে।
প্রথম আলো :অবকাঠামো ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতার বিষয়টি দৃশ্যমান। বাণিজ্য ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের মধ্যে ভারসাম্য নেই। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে আর কী কী ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিতে পারে? বাণিজ্য ক্ষেত্রে আমরা আর কোন ধরনের সুফল পেতে পারি?
আশফাকুর রহমান : বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা চীনের প্রযুক্তি সহায়তা নিতে পারি। শিক্ষা ক্ষেত্রে আমরা সহযোগিতা পেতে পারি। বাংলাদেশের ওষুধ চীনের বাজারের জন্য সম্ভাবনাময় হতে পারে।
প্রথম আলো :আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আশফাকুর রহমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

No comments:

Post a Comment