Sunday, October 9, 2016

দাবি উঠলেও ট্রাম্পকে বাদ দেওয়া প্রায় অসম্ভব

ডোনাল্ড ট্রাম্প
নারীদের বিষয়ে অশ্লীল ও অবমাননাকর মন্তব্যসংবলিত পুরোনো ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর নতুন করে তোপের মুখে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প। এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প ‘ক্ষমা’ চাইলেও তা যে রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের প্রত্যাশিত নিঃশর্ত ক্ষমা নয় এবং সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হওয়ার মতো নয়, সে বিষয়ে কমবেশি সব বিশ্লেষকই একমত। ওই ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে দলের অনেক নেতাই তাঁর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছেন। সিনেট এবং প্রতিনিধি সভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রিপাবলিকান প্রার্থীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে যতটা সম্ভব ততটাই দূরত্ব তৈরি করছেন। প্রতিনিধি সভার স্পিকার পল রায়ান এবং ট্রাম্পের একত্রে প্রথমবারের মতো শনিবার এক অনুষ্ঠানে থাকার কথা ছিল। স্পিকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাতে ‘ট্রাম্প অংশ নেবেন না’। এতৎসত্ত্বেও ট্রাম্প যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়াবেন না, সেটা তাঁর ভিডিও বিবৃতিতেই স্পষ্ট। তিনি তাঁর ‘এক দশকের পুরোনো কথাবার্তা’কে ‘দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
রিপাবলিকান পার্টির নেতারা যে এভাবে ট্রাম্পের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তাঁর অন্যতম কারণ তাঁরা জানেন ট্রাম্পের বক্তব্য নারী ভোটারদের এক বড় অংশের কাছে দলটির গ্রহণযোগ্যতা আরও হ্রাস করবে। ট্রাম্পের অতীতের অনেক আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে ইতিমধ্যেই নারী ভোটারদের মধ্যে তাঁর ও দলের সমর্থন নিম্নমুখী। রিপাবলিকান পার্টির নেতাদের এখন প্রথম লক্ষ্য সিনেটে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষা করা। কেননা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি সিনেটের ৩৪টি আসনেও নির্বাচন হচ্ছে। এর ২৪টি হচ্ছে রিপাবলিকান পার্টির। এর মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটি রিপাবলিকান প্রার্থীদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে তাঁদের মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা এই আসনগুলো পেলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হবে। এখন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে আছে ২৪৬টি আসন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে আছে ১৮৬টি। ফলে সেখানে তাঁদের বিপদ কম।  
প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সরে যাওয়ার বা সরিয়ে দেওয়ার কোনো উদাহরণ মার্কিন রাজনীতিতে তো নেই-ই, এমনকি দলের মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে নিজ দলের ভেতর থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানোর ঘটনা মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে এই প্রথম ঘটছে। এ পর্যন্ত প্রায় এই ধরনের ঘটনা বলতে একটিমাত্র উদাহরণ দেওয়া যাবে, তা হলো ১৯৭২ সালে মনোনীত ভাইস প্রেসিডেন্টকে টিকিট থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা। ১৯৭২ সালে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জর্জ ম্যাকগভার্ন দলের সম্মেলনে মনোনয়ন লাভের পর তাঁর রানিংমেট নির্বাচনের ভোট হয় এবং ছয়জন প্রার্থীর মধ্য থেকে কয়েক দফা ভোটের পর মিসৌরি থেকে নির্বাচিত সিনেটের টমাস ইগলটন মনোনয়ন লাভ করেন। কিন্তু সম্মেলনের আগে থেকে যা ছিল গুঞ্জন পরে তা নিশ্চিত হলে জানা যায় ইগলটন ডিপ্রেশনে ভুগেছেন। জোর দাবি ওঠে যে ইগলটনকে টিকিট থেকে বাদ দেওয়ার, এ সত্ত্বেও মাকগভার্ন বলেন, তিনি তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টের পেছনে ‘১ হাজার শতাংশ’ আছেন। কিন্তু চাপের মুখে ৩১ জুলাই ইগলটনই নিজেকে সরিয়ে নেন। সার্জেন্ট স্রাইভার তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। সেই নির্বাচনে জর্জ ম্যাকগভার্ন হেরেছিলেন মাত্র একটি অঙ্গরাজ্যে এবং ডিসি জিতেছিলেন, তাঁর পাওয়া ইলেক্টোরাল ভোটের সংখ্যা ছিল মাত্রই ১৭। প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সন পেয়েছিলেন ৫২০টি ইলেকটোরাল ভোট।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার যে দাবি উঠেছে তার জোরদার নৈতিক ভিত্তি থাকলেও এবং রাজনৈতিকভাবে তা রিপাবলিকান পার্টির জন্য সম্ভবত ইতিবাচক হবে বলে মনে হলেও তাঁর বাস্তব সমস্যাগুলো প্রায় অনতিক্রম্য। কেননা রিপাবলিকান পার্টির গঠনতন্ত্রে এমন কোনো প্রত্যক্ষ বিধান নেই, যা দলের নেতারা তাঁকে সরিয়ে দিতে ব্যবহার করতে পারেন। দলের ১৫০ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কমিটি যে ধারার আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে তা হচ্ছে গঠনতন্ত্রের নয় নম্বর ধারা। কিন্তু সেখানে বলা হয়েছে, ‘মৃত্যু, নিজে থেকে সরে যাওয়া (ডিক্লাইনেশন) বা অন্য কোনো কারণে’ যদি দলের প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হয় তবে দলের জাতীয় কমিটি তা পূর্ণ করতে পারবে বা ওই পদ পূরণ করতে আবার সম্মেলন ডাকতে পারবে। এই ধারায় ‘অন্য কারণ’ বলে যে অস্পষ্টতা আছে তা ব্যবহারের চেষ্টা করলে তা যে আদালতে গড়াবে সেটা প্রায় নিশ্চিত। অন্যদিকে আছে কিছু বাস্তব সমস্যা। রিপাবলিকান পার্টি দেশের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে তাদের প্রার্থী হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প-মাইক পেন্স। এখন যদি তারা তা বদলাতে চায় তবে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে আলাদা আলাদা করে আবেদন করতে হবে।
তার জন্য যে এখন সময় নেই তা সহজেই বোঝা যায়। কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে এর সময়সীমা অনেক আগেই পার হয়েছে।  কোথাও কোথাও ইতিমধ্যেই ভোট গ্রহণও শুরু হয়ে গেছে (দেখুন, ‘আগেভাগে ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা,’ মতামত পৃষ্ঠা প্রথম আলো, ৮ অক্টোবর)। ইউএস ইলেকশন প্রজেক্ট বলে একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, রিপাবলিকান পার্টির কমপক্ষে ৩৪ হাজার সমর্থক ইতিমধ্যেই ভোট দিয়েছেন। তার সবটাই যে ট্রাম্প পেয়েছেন এমন মনে করার কারণ না থাকলেও, প্রার্থী বদল হলে ওই ভোটের কী হবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ফলে রিপাবলিকান পার্টির নেতারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিন্দা করে প্রার্থী হিসেবে তাঁকে বাদ দিতে চাইলেও তাঁদের সামনে দৃশ্যত কোনো পথ খোলা নেই। তবে অস্বীকারের উপায় নেই ২০১৬ সালের নির্বাচন অনেক কারণেই অভূতপূর্ব, শুক্রবার সকালেও কেউ কি জানতেন, যুক্তরাষ্ট্রে দিনভর আলোচনার বিষয় হবে একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় কি না?

No comments:

Post a Comment