Thursday, October 6, 2016

গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন নয়

প্রথম আলো কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে গতকাল আয়োজিত
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী
মুজিবুল হক। পাশে রাশেদা কে চৌধূরী। প্রথম আলো
শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক গৃহকর্মী, বিশেষ করে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে সবাইকে ‘মানুষ’ হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সবাই মানুষ হতে পারলে গৃহকর্মীদের ওপর কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটত না। গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় একটি নীতিমালা আছে, নীতির আলোকে খুব শিগগির সরকার একটি আইন প্রণয়ন করবে বলে জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে ১৫ থেকে ২০ লাখ গৃহকর্মী কাজ করছে। গৃহকর্মীদের মানুষ মনে করা হয় না। ভাবা হয়, সে তো কাজের মানুষ। তার বিনোদন, বিশ্রামের কোনো প্রয়োজন নেই। শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরাই এদের ওপর নির্যাতন করছেন। বাড়িতে টেলিভিশন, ফ্রিজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থাকলেও গৃহকর্মীদের ঘুমানোর কোনো জায়গা থাকে না। সরকারের নীতিমালায় গৃহকর্মীদের নিবন্ধন ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা আছে। এগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। শিশুদের নিয়ে কাজ করছে যে মন্ত্রণালয়গুলো,
তাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও চেষ্টা চালানো হবে। গতকাল বুধবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘আসুন শিশু গৃহকর্মীদের প্রতি মানবিক হই’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এই বৈঠক সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। বক্তাদের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসে শিশু গৃহকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌসের কথা। এই শিশুর মাথায় গরম ইস্তিরি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। এক বছর ধরে চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিষয়টি প্রকাশ পায়। বর্তমানে জান্নাতুলকে প্রথম আলো ট্রাস্টের উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর থেকে এনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। ট্রাস্ট শিশুটির পুনর্বাসন ও আইনি সহায়তা দিচ্ছে। আলোচনায় গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘শিশু গৃহকর্মীদের প্রতি মানবিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, আমরা আমাদের ঘরে শিশু গৃহকর্মী রাখবই না। নিজের সন্তান স্কুলে যাচ্ছে, তার সঙ্গে পানির ফ্লাস্ক দিয়ে পাঠানো হচ্ছে আরেক শিশুকে।
এটি মূল্যবোধের অবক্ষয় ছাড়া আর কিছু নয়।’ প্রথম আলো ট্রাস্টের সদস্য মোহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘ঘরে কাজের লোক থাকছে, কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। একসঙ্গে বসে খেতে পারে না। এ ধরনের চিত্র সমাজে খুব স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিক চিত্রই গ্রহণযোগ্য না। সেখানে তাদের খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়াসহ অন্যান্য নির্যাতন করা হচ্ছে। এটি হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। জান্নাতুলের ঘটনাকে সামনে রেখে বলি, আমার বাসা, আমার সন্তানের বাসা বা নাতির বাসায় এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা কখনো ঘটবে না।’ প্রথম আলো ট্রাস্ট এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় সব সময় সচেষ্ট থাকবেন উল্লেখ করে আজিজ খান বলেন, দেশে আসলেই গৃহকর্মীদের সংখ্যা কত, সেই পরিসংখ্যান সংগ্রহ করতে হবে। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, প্রথম আলো ট্রাস্ট অন্যান্য কাজের পাশাপাশি জান্নাতুলের পাশে দাঁড়িয়েছে। গৃহকর্মীদের নিয়ে সমাজে সচেতনতা তৈরি, গৃহকর্মী সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন ও নীতির আলোকে আইন তৈরির জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি, নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে আলোচনাসহ অন্যান্য কাজ করবে প্রথম আলো। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন,
সমিতির পক্ষ থেকে গৃহকর্মী নির্যাতনের বিভিন্ন মামলায় আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে মামলা হয়। ভিকটিমকে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রেখে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে গৃহকর্মীর পরিবার আসামিপক্ষের সঙ্গে আপস করে ফেলে। এখন পর্যন্ত একটি মামলাও বিচারের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত যেতে পারেনি। সালমা আলী এ ধরনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা, হাইকোর্টের দেওয়া গাইডলাইনের বাস্তবায়ন, ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষার ব্যবস্থা করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, যে পরিবারগুলো আপস করে ফেলছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমদ বলেন, শিশু গৃহশ্রমিকদের প্রতি মানবিক না হয়ে শিশুদের যাতে এ কাজে নিয়োগ দেওয়া না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু গৃহকর্মীকে যত ভালোভাবেই রাখা হোক না কেন, তাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ওদের কাজ করতে হয় ২৪ ঘণ্টা। শিশুকে কেউ কাজে দিতে চাইলে ইউনিয়ন পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে হবে। শহর এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পুলিশের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, রাজধানীর তেজগাঁও থানা ক্যাম্পাসে অবস্থিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে যারা আসছে, তাদের ৩০-৩৫ শতাংশই নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী। গৃহকর্মীরা দালালের মাধ্যমে বিভিন্ন বাসায় ঢোকে। এই দালালদের সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনকে সচেতন হতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা মুনিরা সুলতানা বলেন, গৃহকর্মীদের সুরক্ষা বিষয়ে আইএলওর ১৮৯ নম্বর সনদটি সরকার এখন পর্যন্ত অনুসমর্থন করেনি। তবে সরকারের নীতিমালায় সুরক্ষার বিষয়গুলো আছে। তিনি গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় প্রথম আলোর উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ঢাকার স্কুলগুলোতে প্রথম আলো সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালালে এই শিশুরা যখন বড় হবে, তখন তারা অন্তত তাদের বাসায় শিশু গৃহকর্মীদের নিয়োগ দেবে না এবং নির্যাতন করবে না। শিশু গৃহকর্মী জান্নাতুলের মা ফিরোজা বেগম গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। শিশুটির ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান। নিজের উপলব্ধি থেকে অন্য কোনো বাবা-মা যাতে শিশুসন্তানকে মানুষের বাসায় কাজে না দেন, সেই আহ্বানও জানান তিনি।
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের হটলাইন
৯১১০৮৮৫, ০১৭৪৫৭৭৪৪৮৭, ০১৭৫৫৫৫৬৬৪৪
ঢাকার ভেতরে সহায়তা পেতে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির হটলাইন
০১৭১১৮০০৪০০, ০১৭১১৮০০৪০১, ০১৭১১৮০০৪০৬, ০১৭১১৮০০৪০৭

No comments:

Post a Comment