Saturday, October 8, 2016

রক্তপাত ঠেকিয়ে শান্তির নোবেল সান্তোসের

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে বক্তব্য
দেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোস।
পাশে স্ত্রী মারিয়া ক্লেমেনসিয়া। এএফপি
পাঁচ দশকের রক্তস্রোত বন্ধ করে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোস। টানা কয়েক বছরের চেষ্টার পর কট্টর বামপন্থী ফার্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে গেল মাসে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি সই করেছেন তিনি। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছেন। যে লড়াইয়ে নিহত হয়েছে আড়াই লাখের বেশি মানুষ। সান্তোসের এ পুরস্কারপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে জয় হলো তাঁর নেওয়া সাহসী রাজনৈতিক উদ্যোগের। প্রশংসিত হচ্ছে অস্ত্র ত্যাগ করা গেরিলা সংগঠন দ্য রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া বা ফার্কও। শান্তিতে নোবেলজয়ী হিসেবে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করা হয় গতকাল শুক্রবার। ফার্কের করা ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি গণভোটে জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কলম্বিয়ার জন্য এ পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘটনা ছিল অনেকটাই অপ্রত্যাশিত। আবার প্রেসিডেন্ট সান্তোসের সঙ্গে ফার্কের বিদ্রোহী নেতাকেও পুরস্কারটি না দেওয়ায় কিছু পর্যবেক্ষক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রায় চার বছর কলম্বিয়ার ভেতরে-বাইরে শান্তি আলোচনার পর প্রথমবারের মতো গত ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের মাটিতে প্রেসিডেন্ট সান্তোস ও ফার্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা তিমোশেঙ্কো শান্তিচুক্তি করেন।
শান্তির প্রতীক হিসেবে সাদা একটি কলম দিয়ে চুক্তিতে সই করেন তাঁরা। করেন উষ্ণ করমর্দন। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। চুক্তি সই হওয়ার পর আবেগাপ্লুত প্রেসিডেন্ট সান্তোস বলেছিলেন, ‘অর্ধশতক ধরে সহিংসতার কালরাত্রির যে ছায়া আমাদের ঢেকে রেখেছিল, তার অবসান হয়েছে।’ চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়িত হতে দেশের জনগণের সম্মতি দরকার ছিল। সে জন্য আয়োজন করা হয় গণভোট। সহজেই উতরে যাবে মনে করা হলেও গত রোববারের গণভোটে শান্তিচুক্তির বিপক্ষেই ভোট পড়ে বেশি। অর্ধেকের কিছু বেশি ভোটার এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এতে শান্তি প্রক্রিয়া কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। অবশ্য সান্তোস ও তিমোশেঙ্কো শান্তি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ শঙ্কা আর আশার মাঝেই মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কারের সম্মান জুটল কলম্বিয়াবাসীর। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান কাসি কুলমান ফাইভ বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে বলেন, ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ অবসানে সান্তোসের দৃঢ়চেতা প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। গণভোটে শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কলম্বিয়ার নোবেল পাওয়া যেমন পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে, তেমনি গণভোটের ফলও নোবেল পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন, শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যানের ঘটনা কলম্বিয়াকে আবার সর্বনাশের পথে ঠেলে দেবে। কিন্তু এ বিষয়ে নোবেল কমিটি বলেছে, কলম্বিয়ায় শান্তি প্রচেষ্টা ‘প্রকৃত বিপদে’ পড়ার মধ্যেও এই পুরস্কার দেওয়ার উদ্দেশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করা।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান কুলমান ফাইভ বলেন, ‘আমাদের আশা, এই পুরস্কার সব ভালো উদ্যোগকে উৎসাহ জোগাবে এবং বিবাদ ভুলে সব পক্ষের অংশগ্রহণে শেষ পর্যন্ত দেশটিতে শান্তিই প্রতিষ্ঠিত হবে।’ ফার্ক বিদ্রোহী নেতাকে যৌথভাবে নোবেল কেন দেওয়া হলো না, সে প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য প্রার্থী ও সম্ভাবনার ব্যাপারে আমরা মন্তব্য করব না।’ কলম্বিয়ার জনগণ ও গৃহযুদ্ধে নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে নোবেল কমিটি। তারা দেশটির সরকার ও বিবদমান পক্ষকে যুদ্ধবিরতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। এর মেয়াদ এ মাসেই শেষ হচ্ছে। পুরস্কার পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট সান্তোস বলেছেন, তিনি মনে করেন শান্তি প্রতিষ্ঠার ‘খুব খুব কাছাকাছি’ তাঁর দেশ। নোবেল ফাউন্ডেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তাঁর দেশ যখন শান্তির পথে ছুটছে ঠিক তখন এই পুরস্কার ‘বিরাট উদ্দীপকের’ কাজ করবে।  নোবেল বিজয়ী এই প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এ পুরস্কার এ বার্তাই দিল যে শান্তির পক্ষে আমাদের লড়াই একনিষ্ঠভাবে চালিয়ে যেতে হবে। পৌঁছাতে হবে লড়াইয়ের একেবারে শেষ সীমানায়। আমরা এই গন্তব্যে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি,
শুধু প্রয়োজন আরেকটু জোরে এগিয়ে চলা।’ সংঘাত অবসানে নিজের নিরলস প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দেওয়ায় নোবেল কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কলম্বিয়ার দুবারের প্রেসিডেন্ট। এদিকে কলম্বিয়ার জনগণের ঘরে শান্তির নোবেল ওঠায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ফার্ক বিদ্রোহী নেতা তিমোশেঙ্কোও। তিনি বলেন, এই পুরস্কার কলম্বিয়ার মানুষকে দারুণভাবে উৎসাহিত করবে। রক্তপাতের অবসান ঘটিয়ে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ উদ্দীপনা জোগাবে। কলম্বিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি লোক। পাঁচ দশকের এ যুদ্ধে নিখোঁজ হয়েছেন আরও ৪৫ হাজার মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়েছেন কয়েক লাখ।  কলম্বিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার দুর্গম যাত্রার দুই সেনাপতি সান্তোস ও তিমোশেঙ্কো দুই ভিন্ন জগতের মানুষ। একজন ধনী পরিবার থেকে আসা সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাঋদ্ধ ঝানু রাজনীতিবিদ ও অন্য জন গ্রামের সহজ-সরল যুবক থেকে পরিণত হন মার্ক্সপন্থী ভয়ংকর এক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতায়। সান্তোস (৬৫) ২০০৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে ফার্ক বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দমন অভিযান চালান। তবে ২০১০ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই তিনি অবস্থান বদলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতায় বসার উদ্যোগ নেন। ২০১৪ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তি সইয়ের আগে প্রেসিডেন্ট সান্তোস এএফপিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি বাজপাখি নই। নই শান্তির পায়রাও। আমি সব সময় শান্তির পথের পথিক।’ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সান্তোসের যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা না চালাতে বিভিন্ন পক্ষ থেকে তিনি তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। বরাবর অদম্য মনোবল আর প্রচণ্ড সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছেন। আর এখন, গণভোটে শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যাত হলেও একইভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সান্তোস। এ প্রত্যয়ে ভর করে বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শান্তি পুরস্কার হিসেবে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পাবেন একটি স্বর্ণপদক, সনদ ও ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনারের (প্রায় ৯ লাখ ৩২ হাজার ডলার) চেক। ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোয় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। শান্তিতে নোবেল নিয়ে এ সপ্তাহে চারটি ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা এল। গত সোমবার চিকিৎসা, মঙ্গলবার পদার্থ ও বুধবার রসায়নে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সোমবার ঘোষণা করা হবে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার। এ বছরের নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পালা শেষ হবে বৃহস্পতিবার সাহিত্যে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

No comments:

Post a Comment