একের
পর এক আস্তানায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানের কারণে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায়
‘সেফজোন’ তৈরির পরিকল্পনা করে নিউ জেএমবি। একই সঙ্গে ঢাকার আশপাশে
ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় আস্তানা গড়ে তোলারও লক্ষ্য ছিল। এসব বিষয়ে একটি
সম্ভাব্য ছক করে নিউ জেএমবির আমীর আবদুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহান ওরফে
শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অর্থের অভাব না
থাকলেও একাধিক সদস্য আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ায় নিউ জেএমবির জনবল
কমছিল।
ফলে অন্য তিন জঙ্গি সংগঠন থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা চালায়
নিউ জেএমবির আমীর। আবদুর রহমান ওরফে সারোয়ার জাহানের ল্যাপটপে এসব তথ্য ও
পরিকল্পনার ছক পাওয়া গেছে বলে র্যাবের তদন্ত ও অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রে
জানা গেছে। যে পাঁচ জেলায় ‘সেফজোন’ করার পরিকল্পনা করা হয় সেগুলো হল :
রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও আবদুর রহমানের নিজ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
এসব জেলায় গোপনে বসবাস করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে জঙ্গিরা নতুন করে
হামলার শক্তি সঞ্চার করবে। পরে তাদের নেয়া হবে ঢাকার আশপাশের আস্তানায় এবং
হামলা করা হবে বিদেশী ও ভিন্ন ধর্মের নাগরিকদের ওপর। জনবল বিশেষ করে ‘হার্ড
কোর’ সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক
হরকাতুল জিহাদ নেতা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে আবদুর রহমান- এমন প্রমাণ
পেয়েছেন র্যাবের গোয়েন্দারা। এ ছাড়া জনবল সংগ্রহে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও
হিজবুত তাহরিরের দুই কারাবন্দি নেতার কাছে বার্তা পাঠানো হয়। মিলন ও সোহেল
নামে তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী গোপন এসব বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্বে ছিল। তারা
সীমান্তবর্তী জেলায় অবস্থান করে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছে বলে জানায়
র্যাব সূত্র। আর আর্থিক খাত আরও চাঙ্গা করতে মধ্যপ্রাচ্যে আইএসে যোগ দেয়া
ডাক্তার রোকনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবদুর রহমান। রোকন তাকে জানায়, তার
ভাগিনা প্রকৌশলী নাফিসের কাছে শূরা বোর্ডকে দেয়ার জন্য ২৭ লাখ ৭০ হাজার
টাকা আছে। র্যাব গোয়েন্দারা আবদুর রহমানের ল্যাপটপ থেকে এ সংক্রান্ত নোট
পেয়ে নাফিস আহম্মেদ নয়নকে ওই টাকাসহ আটক করা হয়।
নাফিসের সঙ্গে আবদুর
রহমানের ঘনিষ্ঠতা হয় রোকনের মাধ্যমেই। পরে বিভিন্ন আস্তানায় সে আবদুর
রহমানের সঙ্গে বৈঠকও করে। র্যাবের গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, আশুলিয়ায়
অভিযানের আগে আবদুর রহমানের কাছে একটি চিঠি আসে যাতে প্রকৌশলী নাফিস ও তার
কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার তথ্য উল্লেখ আছে। এ ছাড়া আরেকটি চিঠিতে
দু’জন জঙ্গি জানায়, তারা শেরপুরের নকলায় একটি বাড়িতে অবস্থানের পর সে বাড়িও
ছেড়ে দিয়েছে। নতুন বাড়ি ঠিক করে পরে জানাবে। এ চিঠিতে শিশির নামে এক
ব্যক্তির নাম ছিল। সাংগঠনিক নামধারী এ জঙ্গিকে খুঁজছে র্যবা। এ ধরনের
প্রায় ১৯টি চিঠি আদান-প্রদান করে নিউ জেএমবির প্রধান। এসব চিঠিতে আবদুর
রহমানের নাম ছিল শায়খ আবু ইব্রাহিম আল হানিফ। আর পাশে আবু দুজানা নামে
আরেকজনের নাম ছিল যাকে নারায়ণগঞ্জে নিহত তামিম আহমেদ চৌধুরী বলে চিহ্নিত
করেছে র্যাব। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধান এবং আবদুর রহমান ও তামিমের এসএমএস
আদান-প্রদান থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন র্যাবের গোয়েন্দারা। এদিকে
র্যাবসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর চতুর্মুখী অভিযানের কারণে আবদুর রহমান খুব
সতর্ক ছিল বলে তথ্য দেন নিহত জঙ্গি নেতার স্ত্রী শাহানাজ আক্তার রুমি।
গোয়েন্দাদের কাছে রুমি স্বীকার করেন, প্রায় রাতেই আবদুর রহমান ডাক্তার
রোকনের সঙ্গে কথা বলত এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করত। একপর্যায়ে আবদুর
রহমান রোকনকে জানায়, ‘মাঠপর্যায়ে শক্তি প্রদর্শন করার মতো এখন জনবল আছে ৩৩
জন’। কিন্তু ৮ অক্টোবর আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযানে ১২ জন নিহত হওয়ায় তা কমে
হয় ২১ জন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক
মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, আশুলিয়ার অভিযানে র্যাব গুরুত্বপূর্ণ
অনেক তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এসব তথ্য পর্র্যালোচনা করে অধরা ২১ জঙ্গি
সদস্যকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছেন র্যাবের গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের কাছে
রুমি আরও স্বীকার করেন, আশুলিয়ায় অভিযানের দিন আবদুর রহমান তাকে (স্ত্রী)
বলে, ‘তোমরা বেঁচে থাক, আমি লাফ দিয়ে শহীদ হয়ে যাব।’ তখন রুমি তাকে বলেন,
‘আত্মহত্যা করা তো পাপ, তাহলে লাফিয়ে পড়বে কেন?’ এর উত্তরে আবদুর রহমান
বলেছিল, ‘তাগুত (র্যাব) এসেছে, এখন আর সময় নেই। ল্যাপটপ ও মোবাইলগুলো
আগুনে পুড়িয়ে দাও যাতে কোনো তথ্য জানা না যায়।’ এই বলে সে লাফিয়ে পড়ে। রুমি
র্যাবের কাছে আদ্যোপান্ত স্বীকার করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ইচ্ছা ব্যক্ত
করেছেন।

No comments:
Post a Comment