Saturday, October 8, 2016

জেতা ম্যাচ এভাবে হারল বাংলাদেশ

ইমরুলের সেঞ্চুরির পর জিততে
জিততে হারল বাংলাদেশ -যুগান্তর
জেতা ম্যাচ কিভাবে হারতে হয়, ভবিষ্যতে পরীক্ষায় এমন প্রশ্ন এলে একেবারে চোখ বন্ধ করে এই ঘটনাবহুল ম্যাচের বিবরণ দিলেই চলবে। এই ম্যাচ জেতাটাই সহজ ছিল বাংলাদেশের জন্য। হারাটাই কঠিন। অথচ, সেই ‘কঠিনের ভালোবাসিলাম...’ বলে হাসতে হাসতে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে গেলেন মাশরাফিরা! ৪২তম ওভারে বাংলাদেশ ৫/২৭১। ক্রিজে দুই সেট ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল কায়েস এবং হাফ সেঞ্চুরিয়ান সাকিব আল হাসান। ৪৮ বলে দরকার ৩৯ রান। হাতে পাঁচ উইকেট। ঠিক তখনই নাটকের শুরু। সাকিব ও মোসাদ্দেককে পরপর দুই বলে ফেরালেন অভিষিক্ত জ্যাক বল। ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’র মতো বাংলাদেশের নাটকীয় বিপর্যয়ের গল্পও এরপর অবশিষ্ট রইল যৎসামান্য। ৩৯ বলে ১৭ রানে ছয় উইকেট খুইয়ে জিততে জিততে হারল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের ২১ রানের জয় নিতান্তই ভাগ্যপ্রসূত। জ্যাক বল যতই অভিষেকে ইংল্যান্ডের হয়ে সেরা বোলিং করুন না কেন, এমন অভাবনীয় হারের জন্য মাশরাফিরা আর কাউকে নয়, শুধু নিজেদের দায়ী করতে পারেন।
শুক্রবার ছুটির দিনে দর্শকে ঠাসা মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম প্রায় ৬০০ ছুঁই ছুঁই যে রোমাঞ্চকর একদিবসী ম্যাচ দেখল, দিন শেষে সব রোমাঞ্চ-আনন্দ উধাও। ইমরুল কায়েসের দুরন্ত শতক, সাকিব আল হাসানের দুর্দান্ত ফিফটি, পঞ্চম উইকেটে দু’জনের মধ্যে ১১৮ রানের জুটি- সবকিছুর ‘ছুটি’ হয়ে যায় ‘মন মানে না’ হারের যন্ত্রণায়। এ দু’জন যতক্ষণ বাইশ গজে ছিলেন, ৩১০ ক্রমে বাংলাদেশের কাছে চলে এসেছিল। জয় যখন দৃষ্টিসীমানায়, বন্দরে যখন নোঙরের অপেক্ষা, তখনই হতাশা আঘাত হানল হারিকেন হয়ে। ৯৭.৫ ওভারের ম্যাচে ৯১ ওভারের বেশি সময় ধরে ম্যাচ ছিল বাংলাদেশের মুঠোয়। ছিল উৎসবের অপেক্ষা। যার উৎস রচনা করেছিলেন ইমরুল তার ঋদ্ধ ফর্মের বদৌলতে সেঞ্চুরি করে। ১০৫ বলে তিনি শতক স্পর্শ করেন ১১টি চারের সহায়তায়। তাতে আরও সাত যোগ করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। আর তার সহযোদ্ধা সাকিব ফিজিওর চিকিৎসা গ্রহণ করে ৭৯-তে বিদায় নেন। পরের বলে মোসাদ্দেক বোল্ড। ইমরুল তখনও ক্রিজে। কিন্তু পায়ের রগে টান ধরেছে। তাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য দরকার ছিল একজনের। মাশরাফি সেই নির্ভরতা দিতে পারেননি। বাংলাদেশ অধিনায়ককে ফেরানোর পর ইমরুলকেও পথ দেখান রশিদ। ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের দুই উইকেটের জয়ের নায়ক শফিউল ইসলাম রানআউট। এরপর তাসকিনকে বল নিজের পঞ্চম শিকারে পরিণত করলে বাংলাদেশ ২৮৮-তে থেমে যায়। ১৩ বল তখনও অব্যবহৃত। পাঁচ উইকেট শিকারি বল ম্যাচসেরা।
চার উইকেট নেন রশিদ। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ আগামীকাল মিরপুরেই। তৃতীয় ও শেষ ম্যাচ ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে। টস জিতলে এই উইকেটে বাংলাদেশও প্রথমে ব্যাট নিত। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করা নিয়ে অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজার একটু ভয়ই ছিল। কাল শুরুতেই ইংলিশ ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশকে চাপে ফেলে দেন। পরে বোলাররা ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের বাজে ফিল্ডিংই ইংল্যান্ডকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে দেয়। বাংলাদেশের ফিল্ডারদের ক্যাচ মিসের মহড়া এবং দুই বেনের (স্টোকস ও ডাকেট) পর বাটলার-ঝড়ে ইংল্যান্ডের স্কোর তিনশ’ ছাড়িয়ে যায়। প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশ তাদের বিপক্ষে করেছিল ৩০৯ রান। প্রথম ওয়ানডেতে সফরকারীরাও আট উইকেটে ৩০৯ রান করে। জেসন রয় আক্রমণাত্মক মেজাজে শুরু করলেও আরেক ওপেনার জেমস ভিন্স দেখেশুনেই এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাত ওভারে বিনা উইকেটে ৪১ তুলে ফেলে ইংল্যান্ড। বাংলাদেশকে প্রথম উইকেট এনে দেন শফিউল ইসলাম। ভিন্সকে ১৬ রানে মাশরাফির ক্যাচ বানান তিনি। নিজের প্রথম তিন ওভারে সাকিব সুবিধা করতে পারেননি। দেন ১৭ রান। কিন্তু চতুর্থ ওভারে রয়কে (৪১) ফেরান তিনি। দুই রানের ব্যবধানে সাব্বিরের সরাসরি থ্রোতে জনি বেয়ারস্টো রানআউট হলে ৬৩ রানেই তিন উইকেট চলে যায় সফরকারীদের। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। তবে দুই বেন ইংল্যান্ডকে আবার চালকের আসনে বসিয়ে দেন। চতুর্থ উইকেটে ১৫৩ রানের জুটি গড়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন স্টোকস ও ডাকেট। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ফিল্ডারদেরই অবদান ছিল বেশি। ২৮ ওভারের পর থেকেই স্বাগতিকদের ক্যাচ মিসের মহড়া শুরু হয়।
মোশাররফ, মাহমুদউল্লাহ ও মোসাদ্দেক ছেড়েছেন চারটি ক্যাচ। সেঞ্চুরি করে আউট হওয়া স্টোকস জীবন পেয়েছেন দু’বার। বাংলাদেশের বাজে ফিল্ডিংই তাকে নিয়ে গেছে তিন অংকের ঘরে। ৬৯ রানের মাথায় তাসকিনের বলে মিড-অনে তার প্রথম ক্যাচটা ছাড়েন মাহমুদউল্লাহ। পরের ওভারে ৭১ রানের সময় মাশরাফির বলে ক্যাচ ছাড়েন মোশাররফ হোসেন। এখানেই শেষ নয়। এরপর অভিষিক্ত ডাকেটেরও ক্যাচ ফেলেছেন তিনি। ৩৬.৪ ওভারে মোসাদ্দেকের বলে স্কয়ার লেগে বল তুলে দেন ডাকেট। যথারীতি বল হাতে জমাতে পারেননি মোশাররফ। তার ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন ছিল আগে থেকেই, কাল সেটা আরও জোরালো হল। ক্যাচ তালুবন্দি করতে পারেননি মোসাদ্দেকও। এমন আরও কয়েকটি হাফ চান্স মিস হয়েছে। ইংল্যান্ড সাড়ে তিনশ’ করার ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এত ক্যাচ মিসের পরও দারুণভাবে ফিরে আসে স্বাগতিকরা। ৪১ ওভার থেকে ৪৬ ওভার পর্যন্ত ছয় ওভারে মাত্র ৩৭ রান দেয় স্বাগতিকরা। এ সময়ে দুটি উইকেটও তুলে নেয়। কিন্তু শেষ চার ওভারে ঝড় তোলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক জস বাটলার। পুরো ম্যাচে ভালো বোলিং করা শফিউল ৪৮তম ওভারে দেন ১৯ রান। বাটলার ৩৮ বলে তিন চার ও চার ছয়ে করেন ৬৩ রান। তার আগে স্টোকসের ব্যাট থেকে আসে ১০১ ও অভিষিক্ত ডাকেট করেন ৬০ রান। স্বাগতিকদের পক্ষে মাশরাফি, সাকিব ও শফিউল দুটি করে উইকেট নেন।

No comments:

Post a Comment