Monday, October 31, 2016

মন্ত্রী হয়েও দলীয় পদে ৯ জন

দল ও সরকারকে আলাদা করার কথা বলা হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদে জায়গা পেয়েছেন ৯ মন্ত্রী। অথচ সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বে আসতে পারেননি বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। আবার দলে অবদান, ত্যাগ ও সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিয়েও বঞ্চিত হয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ। প্রকাশ্যে কেউ কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও বেশ কয়েকজন যুগান্তরের কাছে তাদের হতাশা ব্যক্ত করেন। সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকার থেকে দল পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটিগুলোকে পৃথক করা হবে। এবারের সম্মেলন থেকে নীতিগত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দলটির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন। তিনি বলেন, দল ও সরকারকে আলাদা করার জোর প্রয়াস চলছে। এর আগেও দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়। নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলনও দেখা যায়। কিন্তু পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কেউ কেউ বাদ পড়লেও কোনো কোনো মন্ত্রীকে দলীয় কমিটিতে পদও দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগের নবগঠিত কমিটি নিয়ে মূল্যায়ন জানতে চাইলে বিশিষ্ট কলাম লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ রোববার যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় দলে কাকে কোন পদে বসানো হবে, তা নির্ধারণ করেন দলের শীর্ষনেতা। কে ত্যাগী আর কে নন, তা বিচারের ভারও তার ওপর। অন্য কারও মতামতের মূল্য নেই। বিভিন্ন পদে নেতা নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকলে প্রতিনিধিদের মতামতের প্রতিফলন হতো। কিন্তু যেহেতু বড় দুই দলের কোনোটিতেই এ ব্যবস্থা নেই তাই দলীয় প্রধানই বিবেচনা করবেন কে ত্যাগী, কে যোগ্য, কার অবদান বেশি। এসবের ভিত্তিতেই দলের নেতা নির্বাচিত হন। তিনি কাকে কোথায় রাখবেন, সেটাও তার সিদ্ধান্তেই প্রতিফলিত হবে। জানা গেছে, মন্ত্রী হওয়ায় দলের কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন গত কমিটির অর্থ সম্পাদক পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সাংস্কৃতিক সম্পাদক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর। আরও বাদ পড়েছেন গেল কমিটির কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। আবার সম্ভাবনা জাগিয়েও মন্ত্রী হওয়ার কারণে কমিটিতে আসতে পারেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এবং বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। বিপরীতে মন্ত্রী হয়েও প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে আছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রমোশন পেয়ে প্রেসিডিয়ামে স্থান পেলেও ওই কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানের জায়গা হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদে। এছাড়া কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে স্থান পেয়েছেন ৩ জন। তারা হলেন দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। তাদের মধ্যে মায়া ও আজম গত কমিটিতেও সদস্য ছিলেন,
আর কামরুল ইসলাম এবার নতুন করে স্থান পেয়েছেন। এদিকে দলের বর্ষীয়ান নেতাদের মধ্যে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এবার প্রেসিডিয়ামে স্থান পাবেন বলে অনেকে প্রত্যাশা করেছিলেন। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও দলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ নিয়ে জোরালো দাবিও ছিল। কিন্তু তৃতীয়বারের মতো তাদের জায়গা হয়েছে শুধু উপদেষ্টা পরিষদে। অথচ আমির হোসেন আমু ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একাত্মভাবে সম্পৃক্ত হন। পরে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবেও ভূমিকা রাখেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সভাপতি হয়ে দেশে ফেরার পর তার পাশে থেকে দলকে সংগঠিত করার কাজে সহযোগিতা করেন। এমনকি একটা সময় ‘মিস্টার ডিসিশন’ হিসেবে পরিচিতি পান প্রবীণ এই নেতা। দলের দুঃসময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করেন। মন্ত্রিত্ব পান দলের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালীন সরকারের। ২০০৯-১৩ মেয়াদে না পেলেও পুনরায় মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন বর্তমান আমলে। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনে সংস্কারপন্থীর তকমা গায়ে লাগায় ২০০৯ সালের সম্মেলনে ছিটকে পড়েন দলের প্রেসিডিয়াম থেকে। একই অভিযোগে আওয়ামী লীগের আরেক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নেতা তোফায়েল আহমেদও উপদেষ্টা পরিষদে। তরুণ বয়সেই যিনি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘদিন জেলে কাটান। দলকে সংগঠিত করেছেন নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ’৯৬ এবং ২০১৪ সালে দল ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রী হন। কিন্তু তিনিও ওয়ান ইলেভেনের পর প্রেসিডিয়াম থেকে বাদ পড়েন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজের দল গণতন্ত্রী (একাংশ) পার্টি বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন ’৯০ এর দশকের শুরুর দিকে। আইনজ্ঞ ও বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে রাজনীতির ময়দানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন স্বমহিমায়। কিন্তু তার পরিণতিও আমু-তোফায়েলের মতোই। প্রেসিডিয়াম থেকে উপদেষ্টা পরিষদে আসেন ২০০৯ সালের সম্মেলনে। এদিকে এবারের কমিটিতে গেলবারের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিনের ঠাঁই হয়নি কোথাও। দলের গবেষণা ও দলীয় মুখপত্র উত্তরণ প্রকাশ করে দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে লিখেছেন কয়েকটি গবেষণালব্ধ বই। রাজনীতিতে জ্ঞানী ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। কবি, লেখক ও গবেষক হিসেবেও রয়েছে খ্যাতি। ওয়ান ইলেভেনে সংস্কারপন্থী হওয়ার অভিযোগে অন্যদের সঙ্গে ২০০৯ সালের সম্মেলনে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে বাদ পড়েন সাবের হোসেন চৌধুরী ও আবদুল মান্নান। অথচ স্বচ্ছ, সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সাবের হোসেন চৌধুরীর রাজনীতিতে যথেষ্ট ইমেজ রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত এবং কূটনৈতিক যোগাযোগও ভালো তার। অন্যদিকে আবদুল মান্নান সুবক্তা। ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। দক্ষ সংগঠক হিসেবেও খ্যাতি আছে। কিন্তু এ দু’জনের ভাগ্য এবারের কমিটিতেও ফেরেনি। এদিকে কমিটিতে আসার ব্যাপক আলোচনা থাকলেও ভাগ্যের শিকে ছেড়েনি ছাত্রলীগের সাবেক অনেক নেতার। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাবেক সভাপতি মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরী, বাহাদুর বেপারি, শাহে আলম,
লিয়াকত শিকদার, সাধারণ সম্পাদক ইকবালুর রহিম, ইসহাক আলী খান পান্না, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক শাকিল, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাইফুজ্জামান শিখর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আবদুল মজিদ, বলরাম পোদ্দার, শাহজাদা মহিউদ্দিন, মনিরুজ্জামান মনির, পনিরুজ্জামান তরুন, তরুণ আইনজীবী ফজলে নূর তাপস উল্লেখযোগ্য। মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরী-ইকবালুর রহিম ছাত্রলীগের ১৯৯২-৯৪ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মাহবুবুল হক শাকিল। এটি গঠিত হয় ছাত্রলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ (বাকশালের সহযোগী সংগঠন) একীভূত হওয়ার পরপরই। মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরীকে ছাত্রলীগের অন্যতম মেধাবী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কমিটিতে তিনি ছাত্রলীগ থেকে এবং ইকবালুর রহিম জাতীয় ছাত্রলীগ থেকে পদ পান। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের পারিবারিকভাবেই আওয়ামী লীগে ত্যাগ ও অবদান রয়েছে। তার বাবা প্রয়াত আবদুর রহিম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করতেন। ইকবাল নিজেও কঠিন সময়ে ছাত্রলীগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা সিআরআইতেও সিইও হিসেবে কাজ করছেন। মাইনু-ইকবাল কমিটির সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এমপি পংকজ দেবনাথ।
তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ’৯২-এর আগের কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান নির্বাচন করলে তার স্থলে সভাপতির দায়িত্ব পান প্রথম সহ-সভাপতি শাহে আলম। ’৯৪-এ গঠিত কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এনামুল হক শামীম-ইসহাক আলী খান পান্না। শামীম আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন। ’৯৮-এ গঠিত কমিটিতে সভাপতি হন বাহাদুর বেপারি। তিনিও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে মেধাবী মুখ হিসেবে পরিচিত। তার সময়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সভাপতি ছিলেন সাজ্জাদ হোসেন। মেধাবী ও ভালো সংগঠক হিসেবে সুনাম আছে তার। আর পরিশ্রমী ছাত্রনেতা হিসেবে নজর কেড়েছেন ছাত্রলীগের মহানগরের সাবেক নেতা আবদুল মজিদ। দলে পদপ্রত্যাশী হলেও তাকে সামনের কমিটির দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে। লিয়াকত শিকদার বাহাদুর বেপারির অব্যবহিত পরে ছাত্রলীগের সভাপতি হন। ভালো সংগঠক বলে খ্যাতি পান। তার কমিটির প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ও পরে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাইফুজ্জামান শিখর। শিখরেরও পারিবারিকভাবে দলে অবদান ও ত্যাগ রয়েছে। ২০০১-পরবর্তী দুঃসময়ে সংগঠনকে সংগঠিত করেছেন, সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার বাবা বঙ্গবন্ধু সময়ের আওয়ামী লীগার। বড় ভাই এবং বোন আওয়ামী রাজনীতিতে সরাসরি জড়িত।

No comments:

Post a Comment