রাজধানীর
গুলিস্তানে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের সময় অস্ত্রধারী ছাত্রলীগের সেই আলোচিত দুই
নেতার জামিন পাওয়ার বিষয়ে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দুর্বল আইনে
পুলিশের মামলা দায়ের, তদন্তে গাফিলতি, প্রসিকিউশনকে জামিন শুনানির বিষয়ে
অন্ধকারে রাখায় সহজেই দুই আসামির জামিন হয়ে যায়। জামিন শুনানির সময় একদিকে
যেমন আদালতে সরকার পক্ষের প্রসিকিউটরকে রাখা হয়নি, তেমনি পুলিশের পক্ষ
থেকেও জোরালো কোনো বিরোধিতা করা হয়নি। সবাই ছিলেন নমনীয়। প্রকাশ্যে ওই দুই
নেতা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করলেও মামলায় অস্ত্র আইনের কোনো ধারাই দেয়া
হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে মামলায় সর্বোচ্চ ৩০৭ ধারা দেয়া হলেও তার সঙ্গে একটি
দুর্বল ধারা (৩২৩) যুক্ত করে দু’জনের জামিনের পথ সুগম করে দেয় পুলিশ। ২৭
অক্টোবরের ওই ঘটনায় জড়িত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক
সাব্বির হোসেন ও ওয়ারী থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমানের
বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় যে মামলাটি দায়ের
করে, তাতে ওই দুই নেতার নাম থাকলেও পল্টন থানায় একজন হকারের দায়ের করা
মামলায় তাদের নাম দেয়া হয়নি। শাহবাগ থানার মামলায়ও অস্ত্র আইনের কোনো ধারা
নেই। প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটলেও কেন অস্ত্র আইনে
মামলা হল না এর কোনো সদুত্তর নেই পুলিশের কাছেও। ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায়
পুলিশ অস্ত্রধারী দুই নেতার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে মামলাটি দায়ের করে। এরই
মধ্যে পুলিশসহ একাধিক সংস্থার তদন্তে বেরিয়ে আসে, দুই নেতা প্রকাশ্যে যে
অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা অবৈধ।
তারপরও পুলিশের মামলার এজাহারে অস্ত্র
আইনের ১৯(এ) এবং (এফ) ধারা এড়িয়ে যাওয়া হয়। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়,
শাহবাগ থানার এসআই আবদুল মান্নান বাদী হয়ে ৩১ অক্টোবর যে মামলাটি দায়ের
করেন, তাতে শুধু দুই নেতার নাম এবং বয়স উল্লেখ করা হয়। তাদের পেশা, পরিচয়,
বাবার নাম বা ঠিকানাও দেয়া হয়নি। দণ্ডবিধির ১৪৭ (বেআইনি সমাবেশ), ১৪৮
(অস্ত্রসহ সমাবেশ), ১৪৯ (পরিকল্পিতভাবে ঘটনায় জড়ানো), ৩২৩ (লাঠি দিয়ে
সামান্য আঘাত করা) এবং ৩০৭ (হত্যা চেষ্টা) ধারায় মামলাটি রুজু করে পুলিশ।
কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই ওই মামলায় অস্ত্র আইনের ধারাটি সংযোজন করা হয়নি। একই
সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে ৩০৭ ধারার সঙ্গে ৩২৩ ধারাটি যুক্ত করে দেয়া হয়। যাতে
ভবিষ্যতে আসামির জামিনের পথ সুগম হয়। বাস্তবেও তাই হয়েছে। দুই আসামির জামিন
করিয়েছেন এমন একজন আইনজীবী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সহ-সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত
হোসেন ভুঁইয়াও স্বীকার করেছেন, ৩০৭ ধারা জামিন অযোগ্য হলেও তার সঙ্গে ৩২৩
ধারা জুড়ে দেয়ায় আসামিদের জামিন সহজে হয়েছে। কারণ লাঠি দিয়ে সামান্য আঘাত
আর কাউকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়া এক বিষয় নয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন,
আসামিরা যে অস্ত্র প্রদর্শন করেছে এটাও এজাহারে বলা হয়নি। গুলিবর্ষণের পর
আলামত হিসেবে গুলির খোসা জব্দ তালিকায় থাকার কথা। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটিও
নেই। মামলার এজাহার অত্যন্ত দুর্বল। সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শেখ বাহারুল
ইসলাম এ মামলায় জামিন প্রসঙ্গে বলেন,
পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্ত্র আইনের
১৯(এ) এবং (এফ) ধারাটি দেয়নি। যদি তা থাকত, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট হয়তো
আসামিদের জামিন দিতে একশবার চিন্তা করতেন। পুলিশ মামলা করার ক্ষেত্রে ভুল
করেছে। তারপরও পুলিশের কোর্ট জিআর সেকশন থেকে ৩০৭ ধারার এ মামলায় জামিনের
ঘোর বিরোধিতা করা হলে আসামিদের জামিন হওয়ার কথা না। ঢাকার আদালতে এ ধরনের
মামলায় আসামিদের জামিন শুনানির সময় মহানগর দায়রা আদালতের পাবলিক
প্রসিকিউটরকে জানানোর কথা থাকলেও তারা বিষয়টি জানতেন না। এ প্রসঙ্গে ঢাকা
মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু
যুগান্তরকে বলেন, ১৭ নভেম্বর দুই আসামির জামিন শুনানির বিষয়টি আগেভাগে
জানানো হয়নি। এ ধরনের মামলায় মূলত পুলিশের জিআর শাখা জামিনের বিরোধিতা করে
থাকে। বড় ধরনের বা চাঞ্চল্যকর মামলার আসামির জামিন শুনানির সময় আমাদের
জানানো হলে রাষ্ট্রপক্ষে আমরা উপস্থিত থাকি। এদিকে, দু’জনের বিরুদ্ধে
অস্ত্র আইনে মামলা না করার বিষয়ে পুলিশ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলছে, কোনো
ধরনের উদ্ধার ছাড়া শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দিয়ে ওই আইনে মামলা হবে না।
পল্টন থানার ওসি রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ধারাটি সংযোজন করতে হলে
অস্ত্র উদ্ধার এবং যাদের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে তাদের গ্রেফতার করতে হবে।
এক্ষেত্রে যারা তাদের হাতে অস্ত্র দেখেছেন কিংবা গুলি ছুড়তে দেখেছেন তাদের
কেউ যদি পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দেন, সেক্ষেত্রেও ধারাটি সংযোজন হতে পারে।
প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনে জড়িতদের বিষয়ে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের
উপ-কমিশনার তারেক বিন রশিদ ঘটনার পর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, দু’জনের অস্ত্র
অবৈধ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আর বৈধ হলেও অবৈধ ব্যবহারের
কারণে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেয়া হবে। তার সে কথার পর ধরেই নেয়া
হয়েছিল, দু’জনের বিষয়ে শক্ত মামলা হবে এবং সেভাবেই তাদের বিচারের মুখোমুখি
করা হবে। কিন্তু মামলাটিই ঠিকমতো করেনি পুলিশ। বিশেষ করে শাহবাগ থানায়
দায়ের করা মামলা। এখন পর্যন্ত এ মামলার কোনো প্রতিবেদনও দেয়া হয়নি। উল্টো
তাদের ভুলের কারণে আসামিদের জামিনসহ মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
পুলিশ কেন এমনটি করল- এ প্রশ্ন ছিল এ মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই
আবদুল মান্নানের কাছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি দেখে
আসামিদের নাম জানা গেলেও আজ পর্যন্ত তাদের বিস্তারিত পরিচয় বের করা সম্ভব
হয়নি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে মামলার
অগ্রগতি প্রতিবেদনও আদালতে দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলার ত্রুটি ও
তদন্তে গাফিলতির কারণে আসামিরা জামিন পেয়েছে- এ অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরই আমরা তা আদালতে দাখিল করব। এজাহারে
অস্ত্র আইনের ধারা সংযোজন না করা প্রসঙ্গে এসআই আবদুল মান্নান বলেন,
ব্যবহৃত অস্ত্র ও গুলির খোসা আলামত হিসেবে জব্দ করা না গেলে ওই আইনে মামলা
করা কঠিন। এদিকে, দুই অস্ত্রধারী নেতা জামিন পেয়েছেন অথচ তাদের সেই
অস্ত্রেরই কোনো খোঁজ নেই। পুলিশের ২৮ দিনের তদন্তে এ বিষয়টি প্রাধান্য
পায়নি। পল্টন থানা পুলিশ এর আগে তদন্ত করে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল
করে। তাতে ওই দু’জনের নামে বৈধ কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নেই বলে
জানানো হয়। তারপরও অবৈধ অস্ত্রের সন্ধান পাচ্ছে না পুলিশ।নির্ভরযোগ্য
সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা আশিক দেশেই আত্মগোপনে
ছিলেন।
তবে সাব্বির হোসেন প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে যান। এরপর দু’জনে ১৭
নভেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন।জামিনের পর তারা এখনও এলাকায়
প্রকাশ্যে আসেননি। আশিকের বন্ধু ছাত্রলীগ কর্মী কামাল হোসেন বুধবার
যুগান্তরকে জানান, জামিনের পর আশিক বাসায় বা এলাকায় আসেননি। কথা বলার জন্য
আশিকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তার ব্যবহৃত দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়।
একইভাবে সাব্বির হোসেনের মুঠোফোনটিও বন্ধ রয়েছে। এদিকে, পল্টন থানার
মামলায় তাদের দু’জনকে সুনির্দিষ্টভাবে আসামিই করা হয়নি। এজাহারে দু’জনের
নাম পরিচয় বলা না থাকলেও তাদের ঘিরেই তদন্ত চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামলার একটি ধারায় (৪২৭ দণ্ডবিধি) বলা আছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে
দেশী-বিদেশী অস্ত্র নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। পল্টন থানার কোর্ট
জিআরও (সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা) এসআই জাহিদ জানান, তার মামলায় যেহেতু সব
আসামি অজ্ঞাতনামা। তাই কারও জন্য সুনির্দিষ্টভাবে জামিনের আবেদন করা হয়নি।
পুলিশের কোনো প্রতিবেদনও আদালতে আসেনি। এদিকে মঙ্গলবার যুগান্তরে প্রকাশিত
‘অস্ত্রধারী সেই দুই ছাত্রলীগ নেতার গোপনে জামিন’বিষয়ক রিপোর্টের বিষয়ে
কিছুটা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। রিপোর্টে আদালতের গোপন জামিন বোঝানো
হয়নি। আসামিরা গোপনে আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছেন এমনটি বোঝানো হয়েছে।

No comments:
Post a Comment