প্রেসিডেন্ট
নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম পরীক্ষা ছিল প্রশাসনের শীর্ষ
দুই কর্মকর্তা নিয়োগ। ট্রাম্পের জয়ে যারা উত্তেজিত এবং আতংকিত, তাদের উভয়
পক্ষের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুস্পষ্ট বার্তা। কিন্তু এতে
বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়ার চেয়ে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট
হাউসের চিফ অব স্টাফ ও তার প্রধান কৌশলবিদ হিসেবে যথাক্রমে রেইন্স প্রিবাস ও
স্টিফেন ব্যাননকে বেছে নিয়ে জনগণের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। সমালোচকরা
বলছেন, প্রায় সমান মর্যাদার দুই পদে এ নিয়োগ ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদী
দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন ঘটেছে। প্রিবাস রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির
(আরএনসি) চেয়ারম্যান এবং ব্যানন রক্ষণশীল রাজনৈতিক গণমাধ্যম ব্রাইবার্ট
নিউজ নেটওয়ার্কের নির্বাহী চেয়ারম্যান। হয়তো ট্রাম্প এতে দুই কূল রক্ষা
করতে চেয়েছেন। প্রিবাসকে নিয়োগ দিয়ে ট্রাম্প মডারেট রিপাবলিকান এমনটি
ডেমোক্রেট সমর্থকদেরও বোঝাতে চেয়েছেন যে তার শাসন ব্যবস্থা অধিকতর
কনভেনশনাল হতে যাচ্ছে। এতে ট্রাম্পবিরোধী রিপাবলিকানদের কাছে টানতে
চেয়েছেন। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী ব্যাননকে দিয়ে তিনি তার উগ্র জাতীয়তাবাদী
শ্বেতাঙ্গ সমর্থকদের কাছে নিজের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখিয়েছেন।
দলের
জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান প্রিবাসকে একসময় ‘কলংক’ বলে অভিহিত করেছিলেন
ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ‘কারচুপিপূর্ণ উপায়ে দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া
পরিচালনার জন্য প্রিবাসের লজ্জিত হওয়া উচিত।’ পরবর্তীকালে অবশ্য তিনি দল ও
ট্রাম্পের প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য দেখিয়েছেন। এমনকি ট্রাম্পকে সমর্থন না
দেয়ায় জন ক্যাসিচ ও জেব বুশকে হুমকিও দিয়েছিলেন। এখন বড় বিতর্ক হচ্ছে
স্টিফেন ব্যাননকে নিয়ে। তার পরিচালিত ব্রাইবার্ট নিউজ নেটওয়ার্ক গোঁড়ামি,
ইহুদিবিদ্বেষ, সমকামভীতি ও নারীবিদ্বেষে ভরপুর। উদার গণতান্ত্রিক মূলধারার
বাইরে এ সংস্থা অত্যন্ত কট্টর ও উগ্র। প্রচলিত বামপন্থা, সংখ্যালঘু মুসলিম ও
কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য হুমকি স্টিফেন ব্যানন। ব্যাননের এ নিয়োগকে ‘আশ্চর্যকর
তবে অশনিসংকেত’ আখ্যায়িত করেছেন ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান অ্যাডাম
শিফ। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘তার (ব্যানন) বিকল্প ডানপন্থী, ইহুদিবিরোধী
এবং নারীবিদ্বেষী মনোভাব হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ সিনেটের
সংখ্যালঘুবিষয়ক নেতা হ্যারি রেইডে মুখপাত্র অ্যাডম জেন্টলসন বলেন,
‘নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্টিফেন ব্যাননকে বেছে নেয়ার
অর্থ হল তিনি হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পর্যায়ে শ্বেতাঙ্গদের উগ্র আধিপত্য দেখতে
চান।’ বিদ্বেষ ও বর্ণবাদ পর্যবেক্ষণকারী গ্রুপ দ্য সাউদার্ন পোভার্টি ল’
সেন্টার ব্রাইবার্ট নিউজের বিরুদ্ধে নৃ-জাতীয়বাদকে সাদরে গ্রহণ করার অভিযোগ
তুলেছে। ব্যাননের নিয়োগের কথা ঘোষণার পর থেকে এই গ্রুপ কয়েকটি টুইটবার্তা
প্রকাশ করেছে। সেখানে ব্রাইবার্ট নিউজের কয়েকটি বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ
করা হয়। তাদের প্রথম টুইটে বলা হয়, ‘স্টিফেন ব্যানন ছিলেন ব্রাইবার্টকে
শ্বেতাঙ্গ নৃ-জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডা মেশিনে রূপান্তরিত করার প্রধান
চালক।’ দ্বিতীয় একটি টুইটে বলা হয়, ‘এ নিয়োগ বাতিল করা উচিত ট্রাম্পের।
নিজের বিজয় ভাষণে তিনি বলেছেন, সব মার্কিনির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ইচ্ছা তার।
ব্যাননের উচিত পদত্যাগ করা। সাউদার্ন পোভার্টি ল’ সেন্টার তাদের বিবৃতিতে
বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প যে উগ্র নাৎসীবাদী ক্লু ক্লাক্স ক্যান
(কেকেকে) আধিপত্য ফিরিয়ে আনতে চান বলে অভিযোগ রয়েছে তার সত্যতা প্রমাণ
হয়েছে ব্যাননের নিয়োগে। ব্যাননের নিয়োগের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে
ইহুদিবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলন দি অ্যান্টি-ডিফেমেশন লীগ। এক বিবৃতিতে
প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে,
‘নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমাদের দেশের
জনগণের মঙ্গলের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ আমেরিকানদের নিয়োগ ও মনোনয়ন দিতে আহ্বান
জানাচ্ছি।’ দ্য কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্সও এ নিয়োগের নিন্দা ও
সমালোচনা করেছে। মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটি
ব্রাইবার্টের বিরুদ্ধে ‘নারী, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ ও অভিবাসীদের টার্গেট
করে নারীবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী লেখা’ প্রকাশের অভিযোগ এনেছে। প্রতিষ্ঠানটির
নির্বাহী পরিচালক নিহাদ আওয়াদ বলেন, ‘স্টিফেন ব্যাননকে ট্রাম্প প্রশাসনের
শীর্ষ কৌশলবিদ হিসেবে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি একটি হতাশাজনক বার্তা পাঠায়। সেটি
হল, মুসলিমবিরোধী ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়বাদী ভাবাদর্শ হোয়াইট হাউসে স্বাগত
জানানো হবে। আমরা নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি এই বাজে
সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানাই, যদি তিনি সত্যিই আমেরিকানদের
ঐক্যবদ্ধ করতে চান।’ রাজনৈতিক পরামর্শক জন ওয়েভার লিখেছেন, ‘বর্ণবাদী,
ফ্যাসিবাদী চরম ডানপন্থার প্রতিনিধিত্ব করছে ওভাল অফিসের পদচিহ্ন। খুবই
সতর্ক হও, আমেরিকা।’ সিএনএনের মন্তব্য প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যে
ঐক্যের কথা বলছেন, তা আসলে জাতীয় ঐক্য নয়, বরং দলীয় ঐক্য। শীর্ষ দুই
কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে এ বিষয়টাই তিনি স্পষ্ট করেছেন।

No comments:
Post a Comment