৯০
বছর বেঁচে থাকাটা বিস্ময়কর ছিল ফিদেল কাস্ত্রোর কাছে। ১০ বছর আগে ২০০৬
সালেই কিউবার এ বিপ্লবী নেতা বলেছিলেন, ‘আমি সত্যিই খুশি যে, ৮০ বছরে
পৌঁছে গেছি। আমি এটা আশা করিনি। বিশ্বের শক্তিধর প্রতিবেশী থাকার পরও এটা
আশা করিনি। যারা প্রতিদিন আমাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে।’ সমাজতান্ত্রিক
বিপ্লব ঘটানোয় ফিদেল কাস্ত্রোকে বহুবার হত্যার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৫৯ সালে কিউবার ক্ষমতা নেয়ার পর পরবর্তী পাঁচ দশক এমনকি মৃত্যুর আগ
পর্যন্তও তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। কিউবার সরকারি কর্মকর্তাদের মতে,
যুক্তরাষ্ট্র ফিদেল কাস্ত্রোকে ৬০০ বারের বেশি হত্যার চেষ্টা করেছে।
শনিবার সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ২০০৬ সালে একটি ব্রিটিশ
ডকুমেন্টারিতে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত সমাজতান্ত্রিক নেতা ফিদেল
কাস্ত্রোর মতো আর কোনো জীবিত ব্যক্তিকে হত্যার এত চেষ্টা করা হয়নি। ওই
ডকুমেন্টারির নাম ছিল ‘৬৩৮ উপায়ে কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা’। কাস্ত্রো
নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অলিম্পিক ইভেন্টে যদি হত্যাচেষ্টায় জীবিতকে
পুরস্কার দেয়া হতো, তবে আমি গোল্ড মেডেল জিততে পারতাম।’ কিউবার সংবাদপত্রেও
দু’বার মৃত্যুর খবর এসেছে কাস্ত্রোর। প্রথমবার কিউবার সামরিক ঘাঁটিতে একটি
ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টাসময় এবং গেরিলা ফোর্স নিয়ে নির্বাসন থেকে দেশে
ফেরার কালে। কাস্ত্রোকে হত্যার ষড়যন্ত্র বেশির ভাগই করা হয় তার শাসনামলের
শুরুতে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র চরেরা এ চেষ্টা
চালায়। হত্যার চেষ্টা বেশির ভাগই হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে। এ সময়ে
পাঁচটি ভাগে সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের
স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাকে হত্যার বিভিন্ন চেষ্টা চালায়। তাকে কিউবার সিংহাসন
থেকে নামাতে নেয়া হয় ‘অপারেশন মঙ্গুজ’ পরিকল্পনা। ফিদেলের নিরাপত্তা রক্ষী
ছিলেন ফেবিয়ান এসকালান্তে।
ফিদেলের ৪৯ বছরের শাসনামলে পুরো সময় তার
নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার তথ্যমতে, ৬৩৮ বার কাস্ত্রোকে হত্যার
চেষ্টা করে সিআইএ। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ছিল অভিনব। এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে জটিল
ছিল কাস্ত্রোর চুরুটের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা। নিউইয়র্কের এক পুলিশ
কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ফন্দি নেয় সিআইএ। ওই চুরুটের মধ্যে যে পরিমাণ
বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা হয়, তা তার মাথা উড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। এ
ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রোকে দুর্বল করতে একবার তার জুতো ও চুরুটের
মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হয়। এর প্রভাবে তার শরীরের সব চুল পড়ে যাওয়ার
আশংকা ছিল। বিভিন্ন সময়ে তার খাবারে বিষ রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তার
ব্যবহৃত কলমে বিষযুক্ত সুচ রেখে ও পোশাকে জীবাণু ছড়িয়েও তাকে হত্যার চেষ্টা
চালায় সিআইএ। সিআইএ’র সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা ছিল ফিদেলের প্রেমিকার মাধ্যমে
হত্যার ষড়যন্ত্র। কিউবার বিপ্লবের পর কাস্ত্রোর প্রেমে পড়েন মারিতা লরেঞ্জ।
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তার স্মৃতিকথা ‘মারিতা : একজন নারীর প্রেম ও
গুপ্তচরবৃত্তির অনন্য কাহিনী’তে মারিতা জানিয়েছেন, নিউইয়র্ক ভ্রমণের পর
সিআইএ’র খপ্পরে পড়েছিলেন তিনি। সিআইএ’র পরামর্শে বিষযুক্ত ক্যাপসুল দিয়ে
ফিদেলকে হত্যা করার ফন্দি আঁটা হয়। ফেসক্রিমের কৌটায় রাখা হয় এ ক্যাপসুল।
কিন্তু মারিতা যখন হাভানার একটি হোটেলে কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা করতে যান,
কাস্ত্রো এ ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলেন। মারিতা লিখেছেন, ‘কাস্ত্রো আমাকে
দেখেই বলেন, তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ?’ এরপর নিজের পিস্তল এগিয়ে মারিতার
হাতে তুলে দিয়ে কাস্ত্রো বলেন, বিষ দিয়ে নয়, সরাসরি গুলি করে হত্যা কর।
মারিতা তা করতে পারেননি। গুলি করার পরিবর্তে ফিদেলকে জড়িয়ে ধরেন তিনি।’
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনামলের শেষের দিকে ২০০০ সালে পানামা সফরে যান
কাস্ত্রো। সেখানেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একটি মঞ্চে বক্তৃতা দেয়ার
কথা ছিল কাস্ত্রোর। সেই মঞ্চে ভাষণ ডেস্কে ৯০ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা
হয়। কাস্ত্রোর নিরাপত্তা কর্মীরা এ চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। সেদিন কাস্ত্রো
তার শত্রু কিউবার সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত লুইস
পোজাডার ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘এরা আমাকে হত্যার জন্য পানামায় চলে এসেছে।’ এর
কিছুক্ষণ পর পানামার পুলিশ পোজাডাসহ চার জনকে আটক করে। পোজাডা স্বীকার করেন
বিমানে ও হোটেলে বোম্বিং করে কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

No comments:
Post a Comment