Tuesday, November 1, 2016

ছয় বিমানবন্দরের ৩৮ মেগা প্রকল্পে দুর্নীতি

দুর্নীতির অভিযোগে দেশের ছয়টি বিমানবন্দরের ৩৮ মেগা প্রকল্পের ফাইল তলব করেছে দুনীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব প্রকল্পে কয়েক কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতি ও আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এসব অভিযোগ আমলে এনে গত জুনে দুদকের উপপরিচালক হেলাল উদ্দিন শরীফ ১২টি প্রকল্প এবং সেপ্টেম্বরে দুদকের সহকারী পরিচালক সালাম আলী মোল্লা ২৬টি প্রকল্পের নথি তলব করেন। ১২টি প্রকল্পের দুর্নীতির অনুসন্ধান ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আর ২৬টি প্রকল্পের অনুসন্ধান শিগগিরই শুরু হবে বলে জানায় দুদক সূত্র। যেসব বিমানবন্দরের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো হল- ঢাকার শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর, সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর, রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দর, যশোর ও সৈয়দপুর বিমানবন্দর। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণিকে দেয়া দুদকের চিঠিতে ২৬ প্রকল্পের নথি, দাখিলকৃত দরপত্র, তুলনামূলক বিবরণী, কারিগরি মূল্যায়ন রিপোর্ট, কার্যাদেশ, এমবি, বিল, বিল প্রদানের চেকসহ সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র হস্তান্তরের জন্য বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদকের সহকারী পরিচালক সালাম আলী মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, অনুসন্ধান চলছে। সিভিল এভিয়েশন সব কাগজপত্র ও ডকুমেন্ট সরবরাহ করেছে। অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করা যাবে না। বেবিচক চেয়ারম্যান ২০ অক্টোবর উল্লিখিত বিমানবন্দরগুলোর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের তথ্য-উপাত্ত দুদকের কাছে হস্তান্তর করেন। দুদক সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রকল্পগুলোর বেশ কয়েকটি কাজের সঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের আলোচিত নির্বাহী প্রকৌশলী আছির উদ্দিনের যোগসাজশ রয়েছে। এর আগেও চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরের জেনারেটর ক্রয় ও ঠিকাদারের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী আছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে দুদক। দুদকের উপপরিচালক হেলাল উদ্দিন শরীফ ওই অনুসন্ধান করেন। এতে আছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কিছু অভিযোগের সত্যতাও মেলে। এবার তার বিরুদ্ধে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে ২৫০ কেভিএ জেনারেটর সরবরাহে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে দুদক। ওই অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকৌশলী আছির উদ্দিন ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার যোগসাজশ করে ৩০ লাখ টাকার জেনারেটর ৭০ লাখ টাকায় ক্রয় করেছেন। এতে বেবিচকের ৪০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি এ কাজের প্রাক্কলন তৈরি ও বিল প্রদান করেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, সরবরাহকৃত জেনারেটরটি ছিল পুরনো ও অকেজো। ক্যাপাসিটি ২৫০ কেভিএর জায়গায় ১৫০ কেভিএ দেয়া হয়েছিল। দুদকের কাছে আসা অভিযোগে বলা হয়েছে, সরবরাহকৃত জেনারেটরের বিলের সঙ্গে আমদানির সপক্ষে কোনো ধরনের কাস্টম ইনভয়েস, বিল অব ল্যান্ডিং, শিপিং ডকুমেন্ট ছিল না। জেনারেটরটি দুই বছর আগে ক্রয় করা হলেও এই সময়ে ১০ বারের বেশি নষ্ট হয়েছে। এতে বেবিচকের ২৫ লাখ টাকা গচ্চা গেছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আছির উদ্দিন এই জেনারেটর ক্রয় থেকে আত্মসাৎকৃত টাকা দিয়ে উত্তরায় তার আলিসান বাড়ির কাজ করেছে। জানা গেছে,
এর আগেও দুদকের উপপরিচালক হেলাল উদ্দিন শরীফ বেবিচকের এই নির্বাহী প্রকৌশলী আছির উদ্দিনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে রোববার বিকালে আছির উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সোমবার দুপুরে সিভিল এভিয়েশন সদর দফতর সংলগ্ন ম্যানেজারিয়াল ভবনে তার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, ৩৮টি মেগা প্রকল্প নিয়ে দুদক সিভিল এভিয়েশনকে কোনো ধরনের চিঠি দিয়েছে কিংবা ফাইল তলব করেছে কিনা এ ব্যাপারে তার কিছুই জানা নেই। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। শাহ মখদুম বিমানবন্দরে জেনারেটর সরবরাহ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি সংক্রান্ত দুদকের অভিযোগ ও এ নিয়ে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তিনি বলেন, এর আগেও তাকে অনেকে জেলে ঢুকাতে চেয়েছিলেন। তার সম্পদ-বাড়ি, আয় নিয়ে অনেক তদন্ত হয়েছে। কিন্তু কেউ এসব অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। দুর্নীতির টাকায় উত্তরায় বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ প্রসঙ্গে আছির উদ্দিন বলেন, এই বাড়ি তার নয়। এটি তার মেয়ের বাড়ি। এর আগে দুদকের উপপরিচালক হেলাল উদ্দিন শরীফের স্বাক্ষরে ৯ জুন এক চিঠিতে ১২টি প্রকল্পের নথি তলব করে। চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চাকরি শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত যেসব স্টেশনে ছিলেন তার সময়কালসহ বিস্তারিত তথ্য দেয়ার জন্য বলা হয়। বিভিন্ন সময়ে তাদের পদোন্নতি সংক্রান্ত যেসব প্রজ্ঞাপন ও নথি জারি হয়েছে তার সত্যায়িত ফটোকপি চাওয়া হয়।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বেবিচক থেকে দাখিলকৃত সম্পদের বিবরণীর সত্যায়িত ফটোকপিও দিতে বলা হয় চিঠিতে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গণি চৌধুরীর কাছে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও ১২টি প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়েছে কিনা এবং এর সঙ্গে বেবিচক ও সিভিল এভিয়েশন মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। ওই মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজ, ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন, সাবস্টেশনে বিভিন্ন ইকুইপমেন্ট ও প্যানেল বোর্ড স্থাপন, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয়, সেন্ট্রাল এয়ারকন্ডিশনের বিভিন্ন কাজ, চিলার প্লান্টের বিভিন্ন কাজ, মেইন পাওয়ার প্লান্টের কাজ, গার্ডেন লাইট স্থাপন, সৌর প্যানেল স্থাপন, চায়নার তৈরি ২০টি মাস্টলাইট ক্রয়, বিমানবন্দরে আন্ডারগ্রাউন্ড পাওয়ার ক্যাবল স্থাপন, ফ্লোর মাউন্টের প্যানেল বোর্ড স্থাপন, ওয়াল মাউন্টের প্যানেল বোর্ড স্থাপন, জেনারেটর স্থাপন অন্যতম। দুদকের চিঠিতে এসব প্রকল্পের যাবতীয় নথি, স্টক রেজিস্ট্রার, বণ্টন রেজিস্ট্রার, ঠিকাদারদের নাম, টেন্ডার ডকুমেন্ট, কাজের মূল্যায়নপত্র, ব্যয় মঞ্জুরি, বিল প্রদানসহ যাবতীয় কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি প্রদানের জন্য বলা হয়। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহসানুল গনি যুগান্তরকে বলেন, প্রকল্পগুলো তার যোগদানেরও অনেক আগের। ১০/১২টি প্রকল্প আছে যেগুলোর এখনও কাজই শুরু হয়নি। সেগুলোর অর্থ ব্যয় হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আগে দুদক তদন্ত করে দেখুক, তারপর দেখা যাবে।

No comments:

Post a Comment