Tuesday, November 22, 2016

কাঁকড়ায় সোনালি সম্ভাবনা

অপ্রচলিত পণ্য কাঁকড়া রফতানিতে উঁকি দিচ্ছে সোনালি সম্ভাবনা। বাড়ছে চাষ। বাড়ছে উদ্যোক্তা। বিশ্ববাজারে এর চাহিদা এবং বাজার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে কাঁকড়ার চাহিদার ১০ শতাংশই জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ, যা দেশে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানেরও পথ খুলে দিচ্ছে। এখন দরকার সরকারের নীতিগত সহায়তা বৃদ্ধি।
এর সঙ্গে নীতিমালার যুগোপযোগী সংশোধন এবং দেশ থেকে এই সোনালি সম্ভাবনার কাঁকড়া পাচার বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া। কারণ নজরদারির অভাবে সীমান্তের ফাঁক গলে প্রতি বছর দেশে পাওয়া ১০-১৫ ভাগ কাঁকড়া পাচার হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি খাতটির এমন ফিরিস্তি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার একটি আবেদন বন ও পরিবেশ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কাস্টমস বিভাগে দেয়া হয়েছে। এতে কাঁকড়া রফতানির সোনালি ভবিষ্যতের বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে এসব জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কথাও সামনে আনা হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, ১৯৯৮ সালে রফতানি নীতমালা অনুযায়ী কাঁকড়া রফতানি হচ্ছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী রফতানি উপযোগী পুরুষ কাঁড়ার ওজন ২০০ গ্রাম এবং স্ত্রী কাঁকড়ার ১৩০ গ্রাম হতে হবে। এর নিচের ওজনের কাঁকড়া রফতানি করা যাবে না। অথচ অনেক রফতানিকারকই এ নীতিমালা মানছে না। তারা মাত্র ৭০-৮০ গ্রাম ওজনের পোনা কাঁকড়া সফট শেল আকারে হিমায়িত করে রফতানি করছে, যা কাঁকড়ার উৎপাদন প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারে কাঁকড়া রফতানির কোনো নীতিমালা নেই। এ কারণে সেসব দেশে প্রচুর পরিমাণে কাঁকড়া পাচার হচ্ছে। বিদ্যমান রফতানি নীতিমালাও খাতটির সোনালি ভবিষ্যতে একটি বড় অন্তরায় বলে মনে করেন তিনি। দেশে ভার্জিন প্রজাতির (না পুরুষ, না স্ত্রী) কাঁকড়া ১০০-১২০ গ্রামের ওপরে হয় না। কিন্তু এ ব্যাপারেও রফতানি নীতিমালায় সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। কাঁকড়ার প্রজননকাল ও সংগ্রহ মৌসুম নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। কাঁকড়া রফতানি নীতিমালায় সরকারিভাবে এর প্রজননকাল ধরা হয়েছে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস। কিন্তু এফএওর সিনিয়র রিসার্চার কলিন শেলী তার লেখা ‘স্কপিং স্ট্যাডি ফর মুজ ক্রাব ফার্মিং ইন বাংলাদেশ পার্ট-২’ এ উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে কাঁকড়ার প্রজনন সময় হচ্ছে জুন ও জুলাই মাস। দেশীয় কাঁকড়া বিশেষজ্ঞ ফয়সাল মাহমুদ জোয়ার্দারও তার ‘ক্রাব ন্যাচারাল ব্রিডিং টেকনোলজি ওয়েস্ট কোস্ট অব বাংলাদেশ’ নামক প্রতিবেদনে বলেছেন, কাঁকড়ার চূড়ান্ত প্রজননকাল হচ্ছে মে ও জুন মাস। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব গাজী আবুল কাশেম যুগান্তরকে বলছেন, দেশে কাঁকড়া সংগ্রহে নিষিদ্ধ সময় এবং প্রজনন সময় উল্লেখ করে নীতিমালায় যা বলা হয়েছে তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। তিনি দেশ থেকে কাঁকড়া পাচার রোধ, জীবিত কাঁকড়া রফতানি নীতিমালা যুগোপযোগী এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সর্বনিন্ম পুরুষ কাঁকড়া ১০০ গ্রাম এবং স্ত্রী কাঁকড়া ৮০ গ্রাম নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে পিক প্রজনন মৌসুমকাল পুনর্নির্ধারণ করে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকৃতি থেকে কাঁকড়া সংগ্রহের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ারও অনুরোধ করেন। জানা গেছে, সাতক্ষীরা, পাইকগাছা, 
খুলনা ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় বেশ কিছু সফট শেল ক্রাব ফার্ম গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সফট শেল ক্রাব ফার্মের চাহিদা সর্বনিন্ম ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১২০ গ্রাম পর্যন্ত। দেশীয় ক্রাব ফার্মগুলো সে অনুযায়ী ৫০-২০০ গ্রাম ওজনের নিচের কাঁকড়া হিমায়িত করে মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে বিদেশে রফতানি করছে। নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের কাঁকড়া রফতানি অবৈধ। অথচ নীতিমালা মেনে যারা জীবিত কাঁকড়া রফতানি করছেন, তারা প্রায়ই বিমানবন্দরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার হাতে অপদস্থ হচ্ছেন। কারণ এসব কাঁকড়া রফতানি করতে গিয়ে পরিবহন দীর্ঘসূত্রতার কারণে পানি নির্গত হওয়ার মাধ্যমে কাঁকড়ার ওজন ৭-১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। ফলে এক্ষেত্রেও নীতিমালা মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না উদ্যোক্তাদের। অথচ প্রচলিত কাঁকড়া নীতিমালায় পানি নির্গত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এ অজুহাতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন এসব কাঁকড়া রফতানির জন্য লোড-আনলোডে বাধাগ্রস্ত করছেন। বর্তমানে গড়ে তিন কোটি মার্কিন ডলার রফতানি আয়ে অবদান রাখছে খাতটি। ২০১১-১২ অর্থবছরে কাঁকড়া রফতানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১১৫ টন। সেটি এখন প্রায় ১০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। বিমানযোগে প্রতিদিন ১৮-২০ টনের ২৫-৩০টি চালান বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কাঁকড়া উৎপাদনের ৭০ ভাগের আবাসস্থল হচ্ছে প্রাকৃতিক। যদিও প্রকৃতি থেকে পাওয়া এ কাঁকড়ার ১০-১২ ভাগ এখনও আহরণের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বাণিজ্যিকভাবেও চাষ হচ্ছে কাঁকড়ার।

No comments:

Post a Comment