রোহিঙ্গা
ইস্যুতে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থান
নেয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন,
সীমান্ত খুলে দিলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। বরং বাংলাদেশকে ইস্যুটি নিষ্পত্তির
জন্য মিয়ানমারকে জোরালোভাবে বলতে হবে। তবে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমস্যার সমাধান
না হলে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে
বাংলাদেশকে ব্যাপক তৎপরতা চালাতে হবে। প্রয়োজনে রাখাইন রাজ্যে নো-ফ্লাই জোন
ঘোষণাসহ অপরাপর শক্ত বিকল্পের কথাও চিন্তা করতে হবে। তবে বিশ্লেষকদের কেউ
কেউ মনে করেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও
চালাতে হবে। দেশী-বিদেশী বিশেষ মহল রোহিঙ্গা ইস্যুকে নিজেদের স্বার্থে
ব্যবহারের লক্ষ্যে তৎপর হয়ে উঠেছে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের চেয়ে তা আরও
বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বৈতনীতি লক্ষণীয়।
তারা মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জোরালো চাপ না দিয়ে বাংলাদেশকে
সীমান্ত খুলে দিতে বলছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থ
হাসিলের লক্ষ্যে সীমান্ত খুলে দেয়ার দাবি তুলছেন। আবার সীমান্ত এলাকায়
একশ্রেণীর দালাল রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অর্থের লোভে অনুপ্রবেশে
সহায়তা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে সীমিত পরিসরে আলোচনা
করছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি সামান্থা পাওয়ার জাতিসংঘ
নিরাপত্তা পরিষদে অনানুষ্ঠানিক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। তবে নিরাপত্তা
পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীনের সম্মতি না থাকায় উদ্বেগ জানিয়ে কোনো বিবৃতি
পর্যন্ত দিতে পারেনি এ বিশ্বসংস্থা। ওআইসি একটি বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের
ওপর নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেমায়েত উদ্দিন
রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, ‘মিয়ানমারকে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে
সমস্যা সমাধানের কথা বলতে হবে। রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে বলা উচিত।
তবে এটা জোরালোভাবে বলতে হবে। এটা সম্ভব না হলে মিয়ানমারের ওপর আঞ্চলিক ও
আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এতেও মিয়ানমার অনঢ় থাকলে জাতীয় নিরাপত্তা
রক্ষায় সব বিকল্পই বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। কেননা চাপ সৃষ্টি না করলে
মিয়ানমার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করবে না। এমন ক্ষেত্রে কোনো বিকল্পই
বিবেচনা থেকে বাদ রাখা যাবে না।’
হেমায়েত উদ্দিন ওআইসিতে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। রোহিঙ্গা
ইস্যুতে ওআইসির কন্ট্রাক্ট গ্রুপ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ
ওআইসি মহাসচিবকে কন্ট্রাক্ট গ্রুপের বিশেষ বৈঠক ডাকতে বলতে পারে।
জাতিসংঘ
মানবাধিকার কাউন্সিলে ইস্যুটি উত্থাপন করতে পারে।’ এদিকে শনিবার সাবেক
রাষ্ট্রদূতদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফর্মার অ্যাম্বাসেডর্স’ (আওফা)
সাধারণ সভায় রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে
অনুষ্ঠিত বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূতরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের শক্ত ভূমিকা পালনের আহ্বান
জানান। জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান রোববার যুগান্তরকে
বলেন, ‘আমি মনে করি, রাখাইন রাজ্যে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণার জন্য জাতিসংঘে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব করা উচিত। কেননা বসনিয়ায় সার্বিয়ার
নির্যাতন প্রতিরোধে নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ নিরাপত্তা
পরিষদের সদস্য নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনের মাধ্যমে এ প্রস্তাব
নিতে হবে।’ আশফাকুর রহমান বলেছেন, তিনি এ প্রস্তাব আওফার অনুষ্ঠানে
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলেছেন। তবে এ প্রস্তাবের ব্যাপারে মন্ত্রী কিছু
বলেননি। জানতে চাইলে আওফা সভাপতি সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং ওআইসির সাবেক
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোহাম্মদ মহসিন রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, অনুষ্ঠানটি
ছিল সাবেক রাষ্ট্রদূতদের গেট টুগেদার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী আমাদের
অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। তাই তিনি এ অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে
কিছুটা ক্যাজুয়াল আলোচনা হয়েছে। সিরিয়াস কোনো আলোচনা হয়নি। জানতে চাইলে
আওফা সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড
স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস (বিস) চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমদ যুগান্তরকে বলেন,
রোহিঙ্গা ইস্যুটি দু’একজন তোলেছেন। তখন মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে
এবং রোহিঙ্গা ইস্যুর নিষ্পত্তিতে সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে সম্পর্কে
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের জানিয়েছেন। রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে যারা কথা বলেছেন,
তারা সবাই বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থান নিতে বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেখানে
জানান, শিগগিরই তিনি এ ইস্যুতে সাবেক রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে পরামর্শ বৈঠক
করবেন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআর,
আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থাসহ (আইওএম) বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং
দেশী এনজিও শরণার্থী ও অভিবাসী নিয়ে কাজ করে থাকে। এসব সংস্থা মানবিক কারণে
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের লক্ষ্যে সীমান্ত খুলে দেয়ার দাবি
তোলছে। রোহিঙ্গারা ব্যাপক হারে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে এদেশে এসব সংস্থার
কার্যক্রম বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাই সমস্যাটি সমাধানের দিকে না গিয়ে
একে জিইয়ে রাখার পক্ষেই তারা বেশি মনোযোগী। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ
লাখ সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান রয়েছেন। তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের কোনো
আগ্রহ নেই। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক স্বার্থ
হাসিলের লক্ষ্যে কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার দাবি তোলছেন।
রোহিঙ্গারা মুসলমান হওয়ার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি স্পর্শকাতর
ইস্যু। তাই রাজনৈতিক কোনো কোনো মহল ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে উসকে দিয়ে
বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা সীমান্ত খুলে দিতে
বলছেন। তারা এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুকে
মিলিয়ে দেখছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় দুই কোটি বাংলাদেশী প্রতিবেশী
ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই তারা বাংলাদেশে
ফিরে আসেন। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব নয়। মিয়ানমার সরকার তাদের
বিতাড়িত করে সমস্যার সমাধান চাইছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ গ্রহণ করলে তাদের
সবাইকে তাড়িয়ে দেবে। তাদের ওপর নির্যাতন আরও বাড়িয়ে দেবে। ফলে রোহিঙ্গাদের
সংখ্যা রাখাইন রাজ্যে কমে যাবে। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনও থেমে
যাবে। মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ
কুমার চাকমা প্রশ্ন রাখেন, বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করলে
তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো গ্যারান্টি কি ইউএনএইচসিআর দিতে পারবে?
তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মূলে রয়েছে তাদের নাগরিকত্ব না পাওয়া। তারা
মিয়ানমারের নাগরিকত্ব লাভ করলে এ সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যাবে।
মিয়ানমারের বর্তমান সরকার যার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশের প্রভাব রয়েছে, তাদের এ ইস্যুতে কাজ
করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সমস্যা শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানযোগ্য বলে আমি মনে
করি। আইওএমের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করে অভিবাসন ইস্যুতে অভিজ্ঞ আসিফ মুনীর
মনে করেন, ‘যেসব রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন তাদের নিরাপত্তা
দেয়া প্রয়োজন। কেননা তারা নিরাপত্তা না পেলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের
ভাবমূর্তি ক্ষুণ হবে। পাশাপাশি অভিবাসনবিষয়ক আসন্ন জিএফএমডি (গ্লোবাল ফোরাম
ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) সম্মেলনের সাইডলাইনে বাংলাদেশ
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এ ইস্যুতে আলাদাভাবে বৈঠক করতে পারে। কারণ
রোহিঙ্গা ইস্যুর নিষ্পত্তি না হলে অপর প্রতিবেশী দেশগুলোতেও রোহিঙ্গারা
ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তখন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। আসিফ মুনীর মনে
করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্রাম্প সরকারের রোহিঙ্গা ইস্যু নিষ্পত্তিতে
ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। এ ইস্যু ঝুলে থাকলে রোহিঙ্গাদের মাঝে জঙ্গিবাদীরা
ঢুকে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিতে পারে। জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টি করতে পারে।

No comments:
Post a Comment