কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর
মৃত্যুতে শোকবার্তা দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। রাষ্ট্রীয়
টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে জিনপিং কাস্ত্রোকে ‘আমাদের যুগের মহান
ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার ভাষায়, বৈশ্বিক সমাজতন্ত্রের অগ্রগতিতে
অবিনশ্বর ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন কাস্ত্রো। কিন্তু কয়েক দশক আগেই ফিদেল
কাস্ত্রো সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং থেকে মুখ ফিরিয়ে
নিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালের মে মাসে মার্কিন সাংবাদিক বারবারা ওয়াল্টার্সকে তিনি
বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি অনেক বছর ধরে মাও তার মাথা দিয়ে যা অর্জন করেছেন,
পা দিয়ে তা ধ্বংস করেছেন।’ কাস্ত্রোর মতে, মাও তার ব্যক্তি পূজা ও ক্ষমতার
অপব্যবহারের মাধ্যমে বিরাট ভুল করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমিও এমন ক্ষমতার
অধিকারী ছিলাম, কিন্তু কখনও আমি তার অপব্যবহার করিনি, কিংবা নিজের হাতে
কুক্ষিগত করিনি।’
কিউবা ও চীন কার্যত দুটো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলেও
বেইজিংকে পুঁজিবাদী আমেরিকার ‘ভালো মিত্র’ মনে করতেন কাস্ত্রো। আর ওয়াশিংটন
ছিল হাভানার চরম শত্রু। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে চীন-কিউবার দূরত্ব সর্বোচ্চ
মাত্রায় পৌঁছে যায়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল কিউবা।
অন্যদিকে চীন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিন্ন ব্যাখ্যা করে মস্কোকে এড়িয়ে চলে
ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটায়। এসময় অর্থনীতিতে বড়
সংস্কার নিয়ে আসে চীন। চীনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেং জিয়াও পিংয়ের সঙ্গে
দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন ভিক্টর গাও। বর্তমানে তিনি দেশটির এনার্জি
সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান। সিএনএনকে তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন
ভাঙনের প্রধান কারিগর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মেনে নিতে
পারেননি ফিদেল কাস্ত্রো। তিনি মনে করতেন চীন তার আদর্শের সঙ্গে বেইমানি
করছে। চীন-কিউবার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। কিন্তু
স্নায়ুযুদ্ধ ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান ছিল দুই মেরুতে। সে কারণে দুই দশকের
বেশি সময় ধরে তাদের তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি। ১৯৮৯ সালে বেইজিং-হাভানা সম্পর্কে
পূর্ণ মাত্রা পায়। ফিদেল কাস্ত্রো তার প্রথম ও একমাত্র চীন সফর করেছিলেন
১৯৯৫ সালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক
অবরোধের আওতায় ছিল। এ কারণে দেশটির অন্য কমিউনিস্ট মিত্রের সাহায্য দরকার
ছিল। ফিদেলের বেইজিং সফরের পর চীন কিউবার শীর্ষ বাণিজ্য সহযোগিতে পরিণত হয়।
কাস্ত্রোর সফরের এটাই উদ্দেশ্য ছিল। চীনে তিনি দু’দিন অবস্থান করেছিলেন
এবং রাজধানীর বাইরেও ঘুরে ঘুরে দেখেছিলেন পরিবর্তনের ছোঁয়া কতটুকু। চীনের
অর্থনৈতিক সংস্কারের সফলতা ও দুর্বলতা খতিয়ে দেখেছিলেন। ভিক্টর গাও মনে
করেন, সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে ভিত্তি ধরে ফিদেল কাস্ত্রো যে অর্থনৈতিক মডেল
বেছে নিয়েছিলেন, তা তার দেশকে ভুল পথে পরিচালনা করেছে। চীন ১৯৭৮ সালে
অর্থনীতিকে সংস্কার এনে আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত
হয়েছে। সেই তুলনায় কিউবায় পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। কিন্তু মতপার্থক্য
সত্ত্বেও চীন তার কমিউনিস্ট সহযোগীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে। ২০১৪ সালে চীন
ফিদেল কাস্ত্রোকে কনফুসিয়াস শান্তি পুরস্কার দিয়েছে,
যা দেশটির নোবেল
শান্তি পুরস্কার বলে পরিচিত। কাস্ত্রো কখনোই তার দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার
আনার চেষ্টা করেননি। ভিক্টর গাও বলেন, ফিদেল কাস্ত্রো মহান রাজনৈতিক নেতা
ঠিকই, কিন্তু অর্থনৈতিক নেতা নন। তার মৃত্যু হয়তো পরবর্তী প্রজন্মকে আর্থিক
সংস্কারে নজর দিতে সহায়তা করবে। কাস্ত্রো ছিলেন ‘নির্মম শাসক’ : শনিবার এক
বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ‘ফিদেল কাস্ত্রোর চেয়ে
রাজনৈতিক বিতর্কিত ব্যক্তি খুব কমই ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল তবে
মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ নেতা।’ অ্যামনেস্টির আমেরিকা অঞ্চলের পরিচালক এরিকা
গুয়েভারা-রোসাস বলেন, কিউবা বিপ্লবের পর দেশটির সরকারি সেবা যেমন স্বাস্থ্য
ও শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। কাস্ত্রোর নেতৃত্ব এজন্য প্রশংসার
দাবিদার। তবে সামাজিক এ উন্নতি সত্ত্বেও কাস্ত্রোর ৪৯ বছরের শাসনকালে মত
প্রকাশের স্বাধীনতাকে নির্মমভাবে দমন করা হয়। ফিদেল কাস্ত্রোর কৃষ্ণতম
উত্তরাধিকার হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে মানবাধিকার কর্মীদের
গ্রেফতার ও দমন। অ্যামনেস্টি বলেছে, তাদের কাছে শত শত প্রমাণ আছে যে
শান্তিপূর্ণভাবে ভিন্নমত প্রকাশ, সংগঠন করা কিংবা সভা-সমাবেশের কারণে বহু
লোককে বন্দি করা হয়েছে। কিছু লোককে রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘমেয়াদি সাজা দেয়া
হয়েছে। এখানে ইন্টারনেট সুবিধা সীমিত বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি এবং বলেছে,
আজকের কিউবায় নিপীড়ন নতুন মাত্রা পেয়েছে।

No comments:
Post a Comment