Wednesday, November 16, 2016

শৈলকুপায় সাবদার মোল্লা ও শামীমের রামরাজত্ব

সাবদার মোল্লা ওমেদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। যখন যে সরকার ক্ষমতায়, তখন সেই দলে নাম লেখান তিনি। তবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তার ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার পরিবার এখন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। ছেলে শামীম হোসেন মোল্লা উপজেলা যুবলীগের সভাপতি (বহিষ্কৃত), শৈলকুপা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। ঝিনাইদহ জেলার অধিকাংশ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। এ জন্য গড়ে তুলেছেন ক্যাডার বাহিনী। বাবা-ছেলে দু’জনই শৈলকুপার সংসদ সদস্য আবদুল হাইয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। শামীম এমপির ডানহাত হিসেবে পরিচিত। যে কারণে প্রশাসনিক সব ক্ষমতা ভোগ করেন তারা। সেভাবেই বাবা-ছেলে দু’জনই পেয়েছেন আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স। তাই দুর্বলদের ওপর স্টিমরোলার চালাতে অন্যকিছুর প্রয়োজন পড়ে না। বৈধ অস্ত্রের বাঁট দেখিয়েই একটি হিন্দু পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে ২৪ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছেন। বিচারের আশায় তিন বছর ধরে বিভিন্ন দুয়ারে ঘুরছে ওই পরিবার।
স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভা তাদের পাশে এগিয়ে এলেও ক্ষমতার প্রভাব ও সন্ত্রাসীদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। তাদের নিষেধ উপেক্ষা করেই সেখানে নির্মাণ করা হয় চার তলা ভবন। নাম দেয়া হয়, ‘মোল্লা টাওয়ার’। এ সময় সেখানে থাকা বহু পুরনো একটি কালী মন্দিরও গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। শৈলকুপা উপজেলা সদরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এ জমির মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। অসহায় এ পরিবারটি এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। এলাকার এমন কোনো লোক নেই যিনি এ ঘটনা জানেন না। কিন্তু সবার সামনেই সেখানে সুরম্য ভবনটি গড়ে ওঠে। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা মোক্তার আহম্মেদ মৃধাকে প্রকাশ্যে শৈলকুপা উপজেলা সদরে হাতুড়ি ও রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। সেখানে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারা দেশে ভাইরাল হয়। এরপরই আলোচনায় আসেন শামীম মোল্লা। এ ঘটনায় শৈলকুপা থানায় ১০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। ২নং আসামি তিনি। এতে অভিযোগ করা হয়, এলজিইডির ২ কোটি ৮৮ লাখ টাকার একটি দরপত্রকে কেন্দ্র করে শামীম মোল্লা তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সন্ত্রাসীদের দিয়ে মোক্তার মৃধাকে পিটিয়ে আহত করে। আসামিরা সবাই জামিনে রয়েছে। ওই ঘটনার অনুসন্ধান করতে এসে প্রতিবেদনের শুরুতে বর্ণিত তথ্যগুলো মেলে। এই বাবা-ছেলে একের পর এক অপকর্ম করে গেলেও কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস করেন না। স্থানীয় থানা পুলিশও তাদের এড়িয়ে চলে। হিন্দু পরিবারের বাড়ি দখল যেভাবে : শৈলকুপা সদরে ঢুকতেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে চোখে পড়বে আধুনিক ডিজাইনে তৈরি চার তলা ‘মোল্লা টাওয়ার’। নিচতলায় সামনের অংশে মার্কেট, পেছনে আবাসিক ফ্ল্যাট। উপরের তিন তলা আবাসিক ফ্ল্যাট।
সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনটি নির্মাণ করা হয় প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ সাহা পরিবারের ২৪ শতক জমি দখল করে। মূল্যবান এ জমি দখল করতে শামীম ও সাবদার সত্যেন্দ র চাচাতো ভাই প্রশান্ত কুমার সাহাকে আয়ত্তে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া বায়নাপত্রের মাধ্যমে প্রশান্তকে পুরো জমির মালিক বানিয়ে দেয়া হয়। এরপর ২০১৩ সালে প্রশান্তর কাছ থেকে এ জমি কিনে নেন বাবা-ছেলে। অতি গোপনে করা দলিলও করে ফেলা হয়। এরপর যখন দলবলসহ শামীম মোল্লা বাড়িটি দখল করতে যান তখনই তা সত্যেন্দ্র পরিবারের দৃষ্টিতে আসে। অভিযোগ নিয়ে ছেলে সরোজ কুমার সাহা শৈলকুপা থানায় যান। কিন্তু থানার তৎকালীন ওসি আনোয়ার হোসেন তাদের অভিযোগ না নিয়ে মারধর করে বের করে দেন। পরে তৎকালীন পুলিশ সুপারের নির্দেশে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর সাধারণ ডায়েরি করা হয়। নং ৬৬৭। এর আগে ২০১২ এবং ২০১৩ সালে এ জমি নিয়ে ঝিনাইদহ সহকারী জজ আদালত এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দুটি মামলা হয়। ওই সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উভয় পক্ষকে ওই জমিতে যেতে নিষেধ করেন। আদালতের নিষেধ উপেক্ষা করেই স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় সেখানে নির্মাণ করা হয় মোল্লা ভবন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শৈলকুপার কবিরপুর গ্রামে একসময় অনেক প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল প্রয়াত প্রমথ সাহা ও কান্তিভূষণ সাহা পরিবারের।
প্রমথ সাহার একমাত্র ছেলে প্রশান্ত কুমার সাহা। কান্তিভূষণের ৪ ছেলে- বিন্দাবন সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ সাহা, কমলেন্দু সাহা ও গৌরচান্দ সাহা। দেশ স্বাধীনের পর তাদের সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়। সত্যেন্দ্রনাথ সাহার ৫ ছেলে। তারা গরিব ও সরল প্রকৃতির। তবে এদের অধিকাংশ জমি শৈলকুপা পৌরসদরের মধ্যে হওয়ায় অনেক দামি সম্পদে পরিণত হয়। এ মূল্যবান জমির ওপর কুনজর পড়ে প্রশান্তর। এ নিয়ে দেখা দেয় বিরোধ। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘প্রশান্ত কুমার সাহা দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধের একমাত্র কারণ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ সাহার ছেলে জ্যোতি প্রশাদ সাহা যুগান্তরকে বলেন, ‘কবিরপুর মৌজার এসএ ৭০নং খতিয়ানে ২৫৪ ও ২৫৫ দাগে আমাদের পৈতৃক সম্পতির রেকর্ড রয়েছে। ওই দাগে আমরা ৫ ভাই এসএ রেকর্ড অনুযায়ী ২৪ শতক জমির মালিক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এই বাড়িতেই থাকতাম। আমাদের অংশ ছাড়া কাকা প্রশান্ত কুমার সাহাসহ অন্য কাকাতো ভাইয়েরা তাদের অংশ বিক্রি করে দেন। আমাদের অংশেই ছিল বহু পুরনো কালী মন্দির। এ কারণে আমরা এ বাড়ি বিক্রি করতে চাইনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর শামীম মোল্লা ও তার বাবা সাবদার মোল্লা আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আমাদের পরিবারের মেয়েছেলেদের বাড়ি থেকে বের করে দেন। এ সময় আমার ছেলেসহ পরিবারের কয়েকজনকে পিটিয়ে আহতও করা হয়। এভাবেই প্রকাশ্য দিবালোকে জোর করে দখল করে নেয়া হয় বাড়িটি।’ একপর্যায়ে এ পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, প্রশান্ত কুমার সাহা ভুয়া বায়নাপত্র তৈরি করে প্রভাবশালী সাবদার মোল্লা ও শামীম মোল্লা এবং শৈলকুপার পৌর মহিলা কলেজের প্রভাষক রফিকুল ইসলামের কাছে জমিটি বিক্রি করে দেন। বিচার পেতে প্রভাবশালীসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েও পায়নি পরিবারটি। একপর্যায়ে টাকার অভাবে মামলা চালাতে না পেরে স্থানীয় এক মুসলিম পরিবারের সহায়তা নেয়। বিনিময়ে ন্যায্যমূল্য থেকে অনেক কম দামে তাদের রেজিস্ট্রি করে দেয় ৬ শতাংশ জমি। এখন এই ৬ শতাংশ জমির মালিক হিসেবে দিয়ানথ নামে এক ব্যক্তি তাদের পক্ষে আদালতে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। জ্যোতি প্রশাদের স্ত্রী মল্লিকা সাহা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে আমরা দেবতা মনে করি। ওই ঘটনার পর উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম।
কিন্তু দেখা করতে পারিনি। তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল হাইয়ের কাছেও গিয়েছিলাম। কিন্তু এমপি আমাদের বললেন, ‘কাগজপাতি আছে তা আমি কী করব। কাগজপাতি ধুয়ে পানি খা গিয়ে। এরপর থেকে আর কারও কাছে যাই না। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আছি। রেকর্ড তো আমাদের নামে আছে। জমি যাবে কোন জাগা।’ এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে বহু চেষ্টায় পাওয়া যায় সংসদ সদস্য আবদুল হাইকে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার এবং শামীম মোল্লার নির্বাচনের সময় যারা বিরোধিতা করেছিল তারাই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। যারা (শামীম মোল্লা-সাবদার মোল্লা পরিবার) ওই জমি কিনেছে, তারা খুবই বিত্তশালী। এলাকায় ইটভাটাসহ অনেক সম্পদ রয়েছে তাদের। কারও জমি দখল করতে যাবে কেন!’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শৈলকুপা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শামীম হোসেন মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রশান্ত কুমার সাহার কাছ থেকে আমরা তিন ভাই ১০ শতাংশ জমি কিনেছি। কারও জমি দখল করিনি। যখন ওই জমি কেনা হয়, তখন আমি যুবলীগের সভাপতি বা উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলাম না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেখানে কোনো মন্দির ছিল না। মন্দির ভেঙে ভবন নির্মাণের প্রশ্নই উঠে না।’ তিনি বলেন, ‘উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার একটি প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি আমি’। একপর্যায়ে শামীম হোসেন তার কেনা জমির দলিল দস্তাবেজের ৩৪ পৃষ্ঠা ফটোকপি যুগান্তরের কাছে তুলে দেন। এতে দেখা যায়, শামীম হোসেন মোল্লা, তার বড় ভাই শাহীন হোসেন ও ছোট ভাই মেহেদী হাসান তুহিনকে কবিরপুর মৌজার সাবেক ২৫৪ ও ২৫৫ (হাল ৬০৫) নং দাগে ১০ শতক জমি প্রশান্ত কুমার সাহা রেজিস্ট্রি করে দেন। ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শৈলকুপা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত দলিলে জমির শ্রেণী ডাঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অথচ অন্তত শত বছর ধরে এখানে বাড়িঘর নির্মাণ করে এই হিন্দু পরিবার বসবাস করছিল।
কর ফাঁকি দিতে জমির প্রকৃত শ্রেণীও আড়াল করা হয়। শামীমের সরবরাহ করা পর্চায় দেখা যায়, ২৫৫নং দাগে একটি মন্দির থাকার রেকর্ড রয়েছে। তবে হাল রেকর্ডের সময় জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে ডাঙ্গা করা হয়। ২০০২ সালে প্রশান্ত কুমার সাহা পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওই সময়ে দায়িত্বরত সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়ে জমির প্রকৃত শ্রেণী পরিবর্তন করেন বলে হিন্দু পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শৈলকুপা পৌর মেয়র কাজী আশরাফুল আজম যুগান্তরকে বলেন, ‘বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে ভবন নির্মাণের সময় শামীম মোল্লাকে নোটিশ করে নিষেধ করা হয়। কিন্তু তা অগ্রাহ্য করেই পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়। ওই সময় দায়িত্বরত স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা চেয়েও পাওয়া যায়নি।’ যখন যেমন তখন তেমন : শৈলকুপার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নায়েব আলী জোয়ার্দার যুগান্তরকে বলেন, একসময় সাবদার মোল্লা মুসলিম লীগ করতেন। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে কোনো কাজ করেননি। শূন্যহাতে তিনি আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। তার আয়ের উৎস নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন সেই সরকারের লেজুড়বৃত্তি করেছেন। জাতীয় পার্টি, জাসদ, বিএনপি আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দলই তিনি বাদ দেননি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবদার মোল্লা যুগান্তরকে বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আমার নামে করা হয়েছে এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। একটি মহল আমার এবং পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে। আমি যদি এসব অভিযোগের সঙ্গে জড়িত থাকতাম তাহলে এই ইউনিয়ন থেকে বারবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে পারতাম না।’

No comments:

Post a Comment