Saturday, November 26, 2016

কর্মজীবী নারী ও ব্রেস্ট ক্যান্সার

বাংলাদেশে ইদানীংকালে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার অধিক হারে শনাক্ত হচ্ছে। আমাদের দেশে নারীদের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যান্সারের স্থান নিয়েছে। অন্য সব ক্যান্সারের মতো, ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা গত এক দশকে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসকরাও ব্রেস্ট ক্যান্সারের সঠিক কারণ সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। বিশ্বব্যাপী অনেক জরিপ যাচাইয়ে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু ঝুঁকির কারণ জানা গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেমন- নারী হওয়ার কারণে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়া, ক্রমবর্ধমান বয়স, পরিবারের অন্য কারো ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ইতিহাস, তুলনামূলক অল্প বয়সে মাসিক শুরু হওয়া, তুলনামূলকভাবে দেরিতে রজঃনিবৃত্তি বা মেনোপজ হওয়া ইত্যাদি। অন্যান্য যেসব কারণ ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত সেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবন প্রক্রিয়া বা লাইফ স্টাইলের সঙ্গে জড়িত।
সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশ নারী বিধায়, দেশের কর্মস্থলে অধিক হারে নারীরা এগিয়ে আসছে। উচ্চশিক্ষা, সামাজিক পরিবেশে সহায়ক পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন এবং সর্বোপরি দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কারণে বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতে ইদানীং অধিক হারে নারীদের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে কাজের চাপ, দৈনন্দিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ায় বাড়তি দুশ্চিন্তা ও সাফল্যে পৌঁছার ক্রমবর্ধমান উচ্চাভিলাষ, এ যুগের কর্মজীবী নারীদের চিন্তাচেতনা ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকির পরিপূরক। যদিও এই আর্থ-সামাজিক অবস্থানগুলো সরাসরি ব্রেস্ট ক্যান্সারের কারণ নয়। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সমীক্ষায় বারবার এ পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। নিঃসন্তান বা বেশি বয়সে প্রথম সন্তান জন্মদান, সন্তানকে ব্রেস্ট ফিড না করানোর বা কোনো কারণে মায়ের বুকের দুধ পান করাতে না পারা, কায়িক পরিশ্রম কম হয় এমন জীবনযাপন, স্থূলতা, চর্বিযুক্ত খাবার ও ফাস্টফুড বেশি খাওয়া, ধূমপান বা মদ্যপান এবং হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ইত্যাদি ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নারীরা ইদানীং দেরিতে বিয়ে করছে ও দেরিতে সন্তান জন্ম দেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বা একইভাবে কর্মস্থলের কঠিন সময়ের বেড়াজালে পড়ে অনেক কর্মজীবী মায়েরা সন্তানকে ব্রেস্ট ফিড করাতে পারছে না। কর্পোরেট ক্ষেত্রে নারীরা ডেস্কে বসে প্রচুর কাজ করছেন এবং সময় বাঁচাতে ফাস্টফুড দিয়েই দুপুরের খাবার সেরে নিচ্ছেন যা শরীরে প্রচুর চর্বি জমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের মতোই, বাংলাদেশেরও নারীরা কর্পোরেট জগতে সমান তালে কাজ করাতে, স্বাভাবিকভাবেই যে কোনো মিটিং বা অনুষ্ঠানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপান বা মদ্যপানের ঝুঁকিও তাদের থেকেই যায়। এ বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তবে কী করা যায়? সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে সচেতন হওয়া। আমাদের মেনে নিতে হবে নারী হওয়ার কারণেই ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকে এবং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এ ঝুঁকি বাড়ে। নারীদের অধিক হারে কর্মক্ষেত্রে আসার কারণে এবং কাজেই সচেতনতা ও ঝুঁকি নিরূপণে স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষাই এর একমাত্র প্রতিকার।  ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের নারীদের নিয়মিত প্রতি মাসে অন্তত একবার ব্রেস্ট সেল্ফ এক্সামিনেশন বা নিজে নিজে ব্রেস্ট পরীক্ষা করা উচিত। একজন জেনারেল সার্জনের কাছে গেলে তিনি এ ব্যাপারে শিখিয়ে দেবেন।
নারী তার নিজের পরীক্ষায় ব্রেস্টে কোনো অস্বাভাবিকতা যেমন ত্বকের রং পরিবর্তন বা চাকা বা কুঁচকানো ইত্যাদি পাওয়া গেলে, দেরি না করে একজন জেনারেল সার্জনের শরণাপন্ন হবেন। যদি নারীর বয়স ৪০ বা তার ওপরে হয়, তবে প্রতি মাসে সেল্ফ এক্সামিনেশনের পাশাপাশি বাৎসরিক একবার ম্যামোগ্রাম করা উচিত। ম্যামোগ্রাম এক ধরনের বিশেষ এক্স-রে পদ্ধতি যার মাধ্যমে খুব আগেই ব্রেস্ট ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এগুলোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতন জীবনযাপন করা বাঞ্ছনীয় যেমন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, চর্বিজাতীয় খাবার এবং গরু বা খাসির মাংস পরিহার ও সবুজ শাকসবজি খাওয়া। প্রতিদিন সময় করে নিয়মিত ব্যায়াম, সপ্তাহের ৫ দিন অন্তত ৪৫ মিনিট ছোট ছোট পায়ে দ্রুত হাঁটার অভ্যাস করা উপকারী, ধূমপান বা মদ্যপান অবশ্যই পরিহারযোগ্য। কোনো নারী তার যে কোনো ব্রেস্টে চাকা অনুভব করে, তবে মনে রাখবেন নারীদের ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে শতকরা ১০ ভাগ স্তনের চাকাই শুধু ক্যান্সারের রূপ নেয়। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। স্তনে চাকা অনুভব করলে চেপে রাখবেন না, লজ্জা পেয়ে দেরি করবেন না, অনতিবিলম্বে একজন জেনারেল সার্জনের শরণাপন্ন হোন; কারণ শুধু জেনারেল সার্জনেরাই স্তনের চিকিৎসা প্রদানে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। কোনো প্রকারের কবিরাজী বা ঝাড়-ফুঁকের সাহায্য নিয়ে সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না। অনেক ক্যান্সারের মতো, ব্রেস্ট ক্যান্সারও যদি শুরুতেই ধরা পড়ে তবে এর থেকে নিরাময় পাওয়া সহজতর হয়।
লেখক : কনসালট্যান্ট, জেনারেল অ্যান্ড ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি, ইউনাইটেড হসপিটাল লিমিটেড, ঢাকা

No comments:

Post a Comment