সময়
পার হয়ে যায়। ঘড়ির কাঁটা রাতের দিকে। পড়তে বসা হয় না উর্বির। মা কিছু
বললেই মেজাজ খিটখিটে। পড়তে বসলেও নিজের ইচ্ছামতো। ইংরেজিটা নিয়ে বসলেও
উর্বির মন চায় তখন ড্রয়িংয়ের রং নিয়ে খেলা করতে। শত বাধা সত্ত্বেও তখন মা
তাকে ইংরেজি নিয়ে পড়তে বসাতে পারে না। কর্মজীবী মা-বাবা সন্তানের এই
খিটখিটে মেজাজের জন্য অপরাধবোধে ভোগেন। কিন্তু এখন সাধারণ মায়েদের
সন্তানদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে এ সমস্যা। খুব অল্পতেই খিটখিটে মেজাজ
দেখায় শিশু। কেন এমনটা হয়? ‘পারিবারিক নেতিবাচক ঘটনা, শৈশবের বিরূপ পরিবেশ,
সহিংস আচরণ প্রত্যক্ষ করা, সামাজিক প্রতিকূল পরিস্থিতি ইত্যাদি কারণ শিশুর
মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। ফলে সে ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, মেজাজের
হয়ে যায় খিটখিটে।’ বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী
অধ্যাপক ড. আফরোজা হোসনে। তার মতে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ শিশুর খিটখিটে
মেজাজের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া শিশু যখন পুষ্টিহীনতায় ভোগে তখন তার মেজাজ
খিটখিটে হয়ে যায়। একটি বাড়ন্ত শরীরে যতটা পুষ্টি দরকার অনেক শিশু ততটা পায়
না।
সঠিক ক্যালরি, প্রোটিন, নানারকম ভিটামিনের অভাবে শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত
হয়। পাশাপাশি ঘাটতি দেখা যায় মানসিক বিকাশে। পুষ্টিহীনতায় শারীরিক নানা
অসঙ্গতির সঙ্গে দেখা দেয় মেজাজ খিটখিটে হওয়ার বিষয়টি। স্কুলে বড্ড বেশি
পড়ার চাপ কিংবা প্রতিনিয়ত মায়ের রুটিনে দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে ওঠা শিশুটি
স্বাভাবিকভাবেই হয়ে যায় কিছুটা খিটখিটে মেজাজের। নজর রাখতে হবে আমাদের শিশু
যেন পুষ্টিকর খাবার পায় নিয়মিত। সচেতন হতে হবে কোনোভাবেই অকারণ চাপের
মধ্যে রেখে শিশুর সুন্দর শৈশব যেন নষ্ট না হয়। ড. আফরোজা হোসেন শিশুর মেজাজ
খিটখিটের হয়ে ওঠার বিষয়ে আরও বলেন, অনেক পরিবারে এমন ঘটনা দেখা যায় যে,
পরিবারের কর্তা অফিস থেকে ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কারণে-অকারণে
খিটমিটে আচরণ করছেন, কিংবা ছেলেমেয়েরা বাবা-মা বা পরিবারের অন্যান্য
সদস্যের সঙ্গে কোনো না কোনো কারণে মেজাজ খারাপ করছেন প্রতিনিয়ত। তার প্রভাব
সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশুদের ওপর। একটা শিশু ছোটবেলায় যা দেখবে সে তা-ই
শিখবে। ছেলে যদি বাবাকে সব সময় খিটখিটে মেজাজে দেখে, তার মধ্যেও বড় হলে এ
ধরনের আচরণ বাড়বে; যা অনেক ক্ষেত্রেই বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
পাশাপাশি আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকির কারণ
হতে পারে। অনেকের মধ্যে বিষণ্ণতা,
অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (অতিমাত্রায় উদ্বেগ
ও অনিশ্চয়তাজনিত মানসিক সমস্যা), পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (অস্বাস্থ্যকর
চিন্তন ও আচরণ-প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত মানসিক সমস্যা) ইত্যাদি মানসিক
রোগগুলো দেখা যায়। খিটখিটে মেজাজের কারণে অনেক সময় অভিমানে শিশু মেঝেতে
গড়াগড়ি দেয়, দেয়ালে মাথা ঠুকতে থাকে, লাথি দিয়ে সবকিছু ফেলে দেয়, যাকে
সামনে পায় আঘাত করে, সবকিছু ভাঙচুর করতে থাকে- এ রকম মানসিক সমস্যাও দেখা
যায়। এ সবকিছু নির্ভর করে পারিবারিক নেতিবাচক পরিবেশের ওপর। শিশুর প্রথম
স্কুল যেহেতু পুরিবার, তাই ইতিবাচক শিক্ষাটা হতে হবে পরিবার থেকে। শিশুর এই
সমস্যা সমাধানে অভিভাবকদের চরম ধৈর্য, সুব্যবহার এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
দিতে হবে। শিশুকে এর জন্য বকাবকি বা মারধর করা যাবে না। দেখানো যাবে না
কোনোরকম ভীতি। আর নিয়মিত কিছু জিনিসের উপর রাখতে হবে নজরদারী। যেমন শিশুর
প্রতিদিনের জন্য একটি রুটিন তৈরি করে ফেলুন। যতটা সম্ভব সেই রুটিনে রাখার
চেষ্টা করলে সুফল মিলবে। বিশেষ করে খাওয়া ও ঘুমানোর সময়টা। মাঝে মাঝে তো
একটু পরিবর্তন আসবেই। ক্লান্তি, সময় মতো না ঘুমানো ও খিদে বাচ্চাদের
খিটখিটে করে তোলে। রুটিন মাফিক ঘুম আর খাওয়া হলে অনেকাংশেই সেটা কমে আসবে।

No comments:
Post a Comment