কিউবার
বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনাবসান তাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে
এসেছে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অনুসারীদের কাছে তিনি নায়ক হলেও তার দেশেরই
একটা অংশের কাছে তিনি স্বৈরশাসক। সাম্য ও সুশাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিপ্লব
ঘটালেও নাগরিক সুবিধা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি এখনও কাঠগড়ায়।
১৯৫২
সালে ফুলজেন্সিও বাতিস্তা একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার
প্রেসিডেন্ট কার্লোস প্রিয়র সরকারকে উৎখাত করেন। বাতিস্তার সরকারের নীতি
ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মতোই, যা ছিল কাস্ত্রোর বিশ্বাসের পরিপন্থী। ফলে
বাতিস্তা সরকারকে উৎখাতের জন্য তিনি একটি গোপন সংগঠন গড়ে তোলেন যার নাম
‘দ্য মুভমেন্ট’। ১৯৫৯ সালে সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল বাতিস্তাকে হটানোর
বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন ফিদেল। সেই কমিউনিস্ট বিপ্লব ফিদেলকে ক্ষমতার মসনদে
বসিয়ে দেয়। কথা ছিল তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা দেবেন। অথচ ১৯৫৯ সাল থেকে তিনি
স্বৈরশাসকে পরিণত হয়েছিলেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে গদি আঁকড়ে ছিলেন তিনি। অথচ
একবারের জন্যও জনগণের মাধ্যমে সরাসরি নির্বাচিত হননি। শারীরিক অসুস্থতার
জেরে ২০০৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর
করেন তিনি। কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে রয়েছে মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগ। বিরুদ্ধ মত
তিনি একেবারেই সহ্য করেননি। ভিন্নমতের কারণেই কিউবার বহু মানুষ নির্বাসিত
হয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বাস করছেন। নিজের দেশে আনতে পারেননি যথাযথ
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নাগরিক স্বাধীনতা। তার বিরুদ্ধ মতের লোকদের বছরের পর
বছর কারাগারে বন্দি রেখেছেন তিনি। রাজনৈতিক নিপীড়নের পাশাপাশি দরিদ্র,
সামাজিক বৈষম্য, চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে দুর্দশার জীবন অনেকেরই। আধুনিক যুগের
ইন্টারনেট সুবিধা কিউবায় নেই বললেই চলে।
ই-মেইল
ব্যবহারের জন্যও সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ২০১৩ সাল থেকে এ অবস্থার
কিছুটা উন্নতি ঘটলেও উচ্চমূল্যের কারণে সাইবার দুনিয়ার নাগাল পান না সাধারণ
কিউবানরা। তবে ফিদেল কাস্ত্রো আমৃত্যু অগ্রাহ্য করেছেন পরাক্রমশালী
যুক্তরাষ্ট্রকে। ১৯৬০ সালে কিউবাতে থাকা সব মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে নিয়ে নেয়া হয়। তার শাসনামলে কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও
বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। ফিদেলের হাত ধরেই বহু
বৈপ্লবিক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে। বিপ্লবীদের সাহায্যের জন্য অ্যাঙ্গোলা ও
ইথিওপিয়ায় সামরিক বাহিনীর সদস্য প্রেরণ করেন তিনি। কিন্তু তিনি দেশের
দরিদ্র জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া নীতির কারণে সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছেন।
এমনকি অর্থনৈতিক উদারনীতির সুবিধাকে অস্বীকার করেছেন তিনি। অথচ কমিউনিস্ট
চীন উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন করেছে।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে ল্যাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই তিনি
ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কিউবার স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছিলেন জোশ
মার্তি, যাকে ফিদেল তার হিরো হিসেবে মনে করতেন। সামাজিক উন্নতি, দরিদ্র
কমানো, বর্ণবাদী সাম্যতা ও রাজনৈতিক বিচার, স্বাস্থ্যগত উন্নয়নে ফিদেলের
উত্তরসূরিদের মধ্যে মিশ্র রেকর্ড রয়েছে। এত সমালোচনার পরেও শিক্ষা ও
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গর্ব করতে পারে দেশটি। অন্যান্য দেশে স্বাস্থ্যসেবা
দিতে কিউবা বিদেশে ডাক্তার প্রেরণ করে।

No comments:
Post a Comment