মার্কিন
নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন ও ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে
বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও গবেষক ড. মীজানুর রহমান
শেলী। তার মতে, চূড়ান্ত লড়াইয়ে কম ভোটের ব্যবধানে হলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির
প্রার্থী হিলারিই জয় পাবেন। বহুল আলোচিত ওই নির্বাচন নিয়ে মানবজমিনের
সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এ মত দেন। আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ
স্টাডিজের সঙ্গে দীর্ঘ ১৮ বছর কাজ করা ড. শেলী দেশের সিভিল প্রশাসন ও
রাজনীতিতেও পরিচিত মুখ। ডাকসাইটে আমলা থেকে মন্ত্রিত্ব পাওয়া ওই ব্যক্তিত্ব
বর্তমানে অসুস্থ, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন। এ অবস্থায়ও মার্কিন
নির্বাচনের ওপর নজর রাখছেন তিনি। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন
অবস্থায় মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। সেখানে তিনি মার্কিন রাজনীতি, ৮ই
নভেম্বরের নির্বাচনের খুঁটিনাটি, এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের
সম্পর্ক এবং ঢাকা-ওয়াশিংটন বন্ধুত্ব নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা মতামত দেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরা বহু জাতির মিশ্রণে
একটি জাতি। ইতালি, জার্মানি মেক্সিকো, আফ্রিকা, এশিয়াসহ দুনিয়ার বিভিন্ন
অঞ্চলের মানুষ মিলে এক জাতি তা হলো আমেরিকান। মানবাধিকার, সাম্য, মানুষের
স্বাধীনতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি-এটিই মোটা দাগে এ জাতির মূলমন্ত্র। ইংরেজিতে
আমেরিকানদের বিষয়ে একটি কথা হয় তা হলো- লাইফ, লিবার্টি অ্যান্ড হেপিনেস। এত
দিন এ নিয়েই আমেরিকানরা এগিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটি সংকটে
পড়েছে মন্তব্য করে জ্যেষ্ঠ ওই গবেষক বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় রিপাবলিকান
দলের প্রার্থী ডনাল্ড ট্রাম্প এমন শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন যারা অভিবাসন
বিরোধী, যারা বৈষম্যে বিশ্বাসী, যারা নারী বিদ্বেষী। ওই শক্তি এতদিন
প্রকাশ্যে ছিল না। ট্রাম্পের মতো একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী পেয়ে যাওয়ায়
তারা জোর পেয়েছেন। তারা এখন বর্ণবাদকে উসকে দিচ্ছেন। ট্রাম্প রাজনীতির
মানুষ না হওয়ায় তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দৃষ্টি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড.
শেলী বলেন, হিলারি বৈষম্যবিরোধী এবং নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন ধর্মের সমান
সুযোগে বিশ্বাসীদের নিয়ে লড়ছেন। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সেখানে তারও
ব্যর্থতা ছিল। কিন্তু সেটি এখন আর বিবেচ্য নয়। এখানে ব্যক্তি হিলারি বা
ট্রাম্পের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঐহিত্য এবং মৌলিক মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টি
মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যাক চূড়ান্ত লড়াইয়ে কি হয়? যুক্তরাষ্ট্রবাসী কার
পক্ষে রায় দেন। তারা ঐতিহ্যের পক্ষে থাকবেন নাকি বৈষম্যবাদীদের আরো উসকে
দিবেন? যুক্তরাষ্ট্র চাক বা না চাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তারাই
বিশ্বের এক নম্বর এবং অনেক ক্ষেত্রে একক পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে
ড. শেলী বলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়- ‘বন্ধু শূন্য, শত্রু শূন্য,
সব শূন্য মাঝে’ আমেরিকার অবস্থা এখন এমনই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একক অবস্থানে। সুতরাং দেশটির রাজনীতি এবং প্রেসিডেন্ট
নির্বাচনের ওপর বিশ্ব পরিস্থিতির বিরাট প্রভাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে
দেশে যে যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থা চলছে তাকে ধর্ম বা জাতিগত সংঘাত না বলে
সভ্যতার সংঘাত হিসাবেই দেখেন ওই বিশ্লেষক। তার মতে, এগুলোকে ধর্ম বা বিশেষ
কোনো রূপের আলখেল্লা পরানোর চেষ্টা করা হলেও এটি আসলে ক্ষমতার লড়াই।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়- সভ্যতার সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন
নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক প্রসঙ্গে ড. শেলী বলেন, আমেরিকার সঙ্গে
এ অঞ্চলের (পূর্ব-পাকিস্তান) মানুষের ঘনিষ্ঠতা পাকিস্তান আমল থেকে। সেই
আমলেও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন নিয়মিত পাওয়া যেত। একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধে দেশটির তৎকালীন প্রশাসন আমাদের পক্ষে ছিল না এটা সত্য। কিন্তু
এটাও সত্য যে দেশটির জনগণ, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে
বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ও
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের পর্যায়ের সেই বন্ধুত্ব ৪৫ বছরে আরো পরিণত, বিস্তৃত ও
গভীর হয়েছে। দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তনে দুই দেশের এ বন্ধুত্বে মৌলিক কোনো
পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখি না। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের
জিএসপি ফেরত পাওয়া এবং দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত
প্রবেশাধিকারের বিষয়ে একাধিক প্রশ্নে তিনি বলেন, জিএসপি পুনর্বহাল না করাকে
‘রাজনীতির কূটচাল’ হিসাবে দেখছে বাংলাদেশ সরকার। আমি এভাবে বলবো না। তবে
এখানে আমাদের করণীয় হচ্ছে তারা যে শর্তগুলো দিয়েছে তা পুরোপরিভাবে আমরা
পালন করতে পারছি কি-না? তা আমাদের পর্যালোচনায় নেয়া। জিএসপির বিষয়টি
প্রতীকী। এর আওতায় খুব বেশি সুবিধা আমরা পাই না। এর মধ্যে আমাদের প্রধান
রপ্তানি পণ্য তৈরি পেশাক নেই। সুতরাং এটি না পেলে বাণিজ্যিকভাবে আমরা খুব
বেকায়দায় পড়বো না। তবে ফেরত পাওয়া গেলে নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবমূর্তি বাড়বে।
শুল্প ও কোটামুক্ত সুবিধার সঙ্গে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা জড়িত
উল্লেখ করে তিনি বলেন, আফ্রিকার অনেক দেশকে এ সুবিধা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
আমরা এলডিসিতে রয়েছি এখনও। কিন্তু আফ্রিকার তুলনায় আমাদের অবস্থা অনেক
ভালো। তাছাড়া আমরা ক্রমেই মধ্যম আয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। বিষয় দুটি কারিগরি
ইস্যু উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি নেগোসিয়েশনের (দরকষাকষি) বিষয়।
>>>মানবজমিন

No comments:
Post a Comment