চট্টগ্রাম
ও মংলা বন্দরে ভারতীয় পণ্য উঠানামায় অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তি করতে যাচ্ছে
বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য এ সংক্রান্ত চুক্তির
খসড়াও প্রস্তুত। দু’দেশের সরকার চাইলে যে কোনো দিন চুক্তি স্বাক্ষর হতে
পারে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম ও
মংলা বন্দরে ডেডিকেটেড (সুনির্দিষ্ট) জেটি ব্যবহারের সুযোগ চেয়েছিল ভারত।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জানিয়ে দিয়েছে, সুনির্দিষ্ট জেটি দেয়া সম্ভব নয়।
তবে বন্দর দুটিতে ভারতীয় পণ্য উঠানামায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে। কারণ
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের চাপ আছে। এ চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা
হয়েছে। এরপরই চুক্তির খসড়া তৈরি হয়। নৌমন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা
গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়
বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ভারতীয় পণ্য উঠানামায় ভারত ডেডিকেটেড জেটি
চেয়েছিল। আমরা বলেছি, প্রাইওরিটি (পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার) দিতে পারব,
কিন্তু ডেডিকেটেড জেটি দিতে পারব না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার নিয়ে সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এখন দুই
দেশের সরকার যেদিন চাইবে, সেদিনই চুক্তি স্বাক্ষর হবে। জানা গেছে, চুক্তির
আওতায় সড়কপথে ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে আসবে। সেখান
থেকে জাহাজে বিভিন্ন দেশে চলে যাবে। একইভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে
ভারতের পণ্য বাংলাদেশের দুই বন্দরে নামানো হবে। এরপর পণ্যগুলো দেশটির
বিভিন্ন রাজ্যে পৌঁছবে। এদিকে দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম
বন্দরের সক্ষমতা না বাড়িয়ে ডেডিকেটেড এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভারতীয় পণ্য
পরিবহনের সুযোগ দেয়া হলে দেশের স্বার্থ ক্ষুণœ হবে। দেশীয় ব্যবসায়ীরা
ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বর্তমানে কনটেইনার জটে দিনের পর দিন পণ্য বন্দরে আটকে
থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ভারতকে
সুযোগ দেয়া হলে ব্যবসায়ীদের জন্য ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়াবে। আমদানি
ও রফতানিকৃত পণ্য আরও বেশি সময় বন্দরে আটকে থাকার আশংকা আছে। সেক্ষেত্রে
দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবেন। তারা আরও
বলেন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দিলে এ খাতে বাংলাদেশ লাভবান
হবে, না লোকসানের মুখে পড়বে, তা জনসম্মুখে প্রকাশেরও দাবি জানান তারা। এ
প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম
বলেছেন, ভারতের আমদানি ও রফতানি পণ্য খালাস কিংবা লোড-আনলোডের জন্য
চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হলে দেশের আমদানি-রফতানি পণ্য
খালাস বা লোড-আনলোডের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়বে। বিদ্যমান জেটিগুলোয় শুধু
বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি পণ্য খালাস করতেই সমস্যা হচ্ছে। সময়মতো পণ্য
খালাস করতে না পরায় বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ জট তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন
টার্মিনালে দেখা যাচ্ছে কনটেইনার জট। তিনি বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে
এসব বিষয় আরও পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা উচিত। অন্যথায় চুক্তি কার্যকরের
পর মাঝপথে এ নিয়ে কোনো ধরনের ঝামেলা হলে দু’দেশের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে
পারে। নৌমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, লালদিয়া, পতেঙ্গা ও মিরসরাইয়ে আলাদা
কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, দ্রুত
টার্মিনালগুলো নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পরই
বাংলাদেশের দুটি বন্দরই ভারতকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া হোক। সংশ্লিষ্ট সূত্রে
জানা গেছে, খসড়া চুক্তিতে নির্দিষ্ট সড়কপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়া
হচ্ছে ভারতকে। সড়কপথে তিনটি স্থলবন্দরের মাধ্যমে ওই পণ্য বাংলাদেশে ঢুকতে
বা বের হতে পারবে। বাংলাদেশের স্থলবন্দরগুলো হচ্ছে আখাউড়া, তামাবিল ও
শ্যাওলা। বিপরীতে ভারতের বন্দরগুলো হচ্ছে আগরতলা, ডাউকি ও সুতারকান্দি।
এছাড়া দুই দেশ আন্তঃকমিটি অনুমোদন করলে স্থলবন্দর ও রুটের সংখ্যা বাড়াতে
পারবে। খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট রুটগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা
অন্য কারণে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে বিকল্প রুটে এসব
গাড়ি চলতে পারবে। সেক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অনুমতি নিতে
হবে। বাংলাদেশের ভেতরে পণ্য পরিবহনে শুধু এ দেশীয় যানবাহন ও জাহাজ
ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। সচিব পর্যায়ের ওই বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক
কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। পণ্য পরিবহনে চার্জ ও
ফি পরিশোধ করতে হবে ভারতকে। এ বিষয়টি খসড়া চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে চার্জ ও ফি’র পরিমাণ কত হবে,
তা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরে
(এসওপি) উল্লেখ করা হবে। তারা বলেন, বিদ্যমান নৌপ্রটোকল চুক্তির আওতায়
আশুগঞ্জ বন্দর থেকে আখাউড়া পর্যন্ত পণ্য পরিবহনে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করছে
দেশটি। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একইভাবে আরোপিত চার্জ ও
ফি ভারতকে পরিশোধ করতে হবে। জানা গেছে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারে
ভারতকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা
হয়েছে, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দরের স্থান প্রাপ্যতা সাপেক্ষে
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সব সুবিধা নিশ্চিত করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক
আরোপিত চার্জ ও ফি আদায় করতে পারবে। খসড়া চুক্তিতে বলা হয়েছে, ভারতীয়
পণ্যবাহী যানকে বাংলাদেশের প্রচলিত সব আইন ও বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে।
বাংলাদেশের বন্দরে প্রবেশের সময়ে এনবিআর কর্মকর্তারা পণ্যবাহী গাড়ির সব
ডকুমেন্ট চেক করবেন। তবে সন্দেহ হলে বা বিশেষ প্রয়োজনে গাড়িতে তল্লাশি
চালাতে পারবে। এছাড়া গাড়ির গতিবিধি লক্ষ রাখার জন্য লক ও সিল এবং গ্লোবাল
পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ব্যবহার করতে পারবে। এতে আরও বলা হয়েছে, কোনো
কারণে পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে, হারালে এবং কাস্টমস সিল ক্ষতিগ্রস্ত হলে
তাৎক্ষণিক এনবিআরকে জানাতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে দুই দেশের
যে কোনো দেশ যে কোনো সময় এ চুক্তি স্থগিত করতে পারবে বলে খসড়া চুক্তিতে
উল্লেখ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে অপর দেশকে তাৎক্ষণিক জানাতে হবে। এছাড়া
চুক্তির আওতায় বছরে দু’বার জয়েন্ট কমিটির বৈঠক হবে। চুক্তির আওতায় কোনো
সমস্যা দেখা দিলে ওই বৈঠকে তা সমাধান করা হবে।

No comments:
Post a Comment