প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানে ইঞ্জিনের নাট ঢিলে হওয়ার নেপথ্যে মানুষের হাত
থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটি নাশকতা নাকি অদক্ষতা তা যৌক্তিকভাবে
পরিষ্কার করা হয়নি বিমানে গঠিত তদন্ত কমিটির দেয়া পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে।
সোমবার রাতে বিমানের পাইলট ফজল মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি
তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে ফ্লাইট বিলম্ব ও
পরবর্তীকালে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইট পরিচালনা করায় ইঞ্জিনিয়ারিং ও ফ্লাইট
অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বে চরম গাফিলতি, অদক্ষতা ও
স্বেচ্ছাচারিতার প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে বিমানের বোর্ড
সাবকমিটির জরুরি বৈঠক শেষে প্রকৌশল বিভাগের ৩ শাখার ৩ জন প্রধান প্রকৌশলীকে
সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা হলেন, প্রকৌশলী দেবেশ চৌধুরী (প্রডাকশন),
প্রকৌশলী এসকে সিদ্দিক (কোয়ালিটি) ও প্রকৌশলী বেলাল হোসেন (সিস্টেম
অ্যান্ড মেনটেন্যান্স)। এর আগে একই বিভাগের নিন্ম পদের ৬ জন
কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে এ ঘটনায় রহস্যজনক
কারণে ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে এখনও
ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির প্রধান একজন পাইলট হওয়ায় প্রতিবেদনের
স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিমান প্রকৌশল বিভাগ। একই সঙ্গে
তদন্ত কমিটিতে প্রকৌশল বিভাগের ডেপুটি চিফ ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ হানিফ সদস্য
থাকায় তার বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়নি। অভিযোগ আছে
প্রকৌশলী হানিফও সাময়িক বহিষ্কৃত ৩ প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে একই টিমের একজন
সদস্য। এদিকে আজ বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির
প্রতিবেদন জমা দেয়ার শেষ দিন। বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন যুগান্তরকে
বলেন, বিমানের তদন্ত রিপোর্ট প্রদান ও ৩ প্রকৌশলীকে বহিষ্কারের কথা তিনি
শুনেছেন।
কিন্তু তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।
তিনি বলেন, আজ বিমান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমারের নেতৃত্বে
গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা রয়েছে। যদি কোনো কারণে আজ রিপোর্ট
তৈরি করতে না পারেন তবে রোববার তাদের রিপোর্ট দাখিল করা হবে। তিনি বলেন,
মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট পাওয়ার পরই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের
সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের প্রকৌশল
বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ইঞ্জিনের বি নাট ঢিলে করার
সঙ্গে প্রকৌশল বিভাগ জড়িত থাকার বিষয়টি যেমন সত্য, তেমনি আকাশে ইঞ্জিনের
ওয়েল প্রেসার কমে যাওয়ার পর পাইলট ও ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট
শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বোয়িং কোম্পানির চেকলিস্ট অমান্য করার
অভিযোগটিও সত্য। কাজেই ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার
বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। তিনি বলেন, এই বিভাগের
দায়িত্বে বিমান চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল এনামুল বারী চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা
থাকায় মূলত এই বিভাগের কোনো কর্মকর্তা পাইলটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া
হয়নি। তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে বাম ইঞ্জিনের
অয়েল প্রেসার (লুব্রিকেন্ট) কমে যাওয়ার পরও ফ্লাইটে থাকা তিন পাইলট পরপর
তিন দফায় বোয়িং কোম্পানির চেকলিস্ট অমান্য করেছে, যা বড় ধরনের অনিয়ম ও
শাস্তি যোগ্য অপরাধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় যে কোনো মুহূর্তে ওই ইঞ্জিনে
আগুন ধরে বিমানটি ক্র্যাশ করতে পারত। বোয়িং কোম্পানির বরাত দিয়ে বিমানের
প্রকৌশল বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ফ্লাইটটি ৩৩ হাজার ফুট
উচ্চতায় থাকাকালীন ইঞ্জিনের অয়েল প্রেসার কমে যাওয়ার ঘটনাটি সিগন্যাল আকারে
জানিয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় পাইলটরা কি কাজ করবে তাও পরবর্তী
মেসেজে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। মেসেজে এ ধরনের মুহূর্তে যে ইঞ্জিনের অয়েল
প্রেসার কমে যাচ্ছিল তা শাটডাউন (বন্ধ) করে দেয়ার কথা লেখা ছিল। এজন্য
প্রথমে ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের এটি-এআরএম সুইচ অফ করে, থ্রাস্ট লিভার নিচে
নামাতে হবে।
এরপর অয়েল লাইন পুরোপুরি কাট করে দিতে হয়। তিনটি প্রক্রিয়া শেষ
হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন শাটডাউন হয়ে যাবে। এরপর ভালো
ইঞ্জিনের ব্যাকআপ হিসাবে অক্সিলারি পাওয়ার ইউনিট (এপিইউ) চালু করতে হবে।
এরপর পরের ধাপ হচ্ছে পাইলটকে ট্রান্সপন্ডার মুড সিলেকটর চালু করতে হবে। এই
ট্রান্সপন্ডার সিলেকটর চালু করার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে কিংবা ওই রুটে থাকা সব
এয়ারক্রাফট তাকে সাইড দিয়ে দেবে। তারা বুঝতে পারবে এই এয়ারক্রাফটি বড়
ধরনের বিপদে পড়েছে। একই সঙ্গে আশপাশের এয়ারপোর্টগুলোও ফ্লাইটটিকে জরুরি ও
নিরাপদ অবতরণে সহায়তা দেবে। প্রস্তুত রাখবে ফায়ার সার্ভিসসহ যাবতীয়
যন্ত্রপাতি। কিন্তু রহস্যজনকভাবে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে থাকা তিন পাইলট ও
দুই ফাস্ট অফিসারের কোনো প্রসেসই পালন করেনি। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
যে নাট লুজ করার জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি এ
ধরনের ঘটনায় পাইলটরা বোয়িং চেক লিস্ট অমান্য করায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে
আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ হিসাবে তারা বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের
বি নাট ঢিলে থাকায় লুব্রিকেন্ট ঘামিয়ে পুরো ইঞ্জিনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে
উঠেছিল। চালু থাকার কারণে যে কোনো মুহূর্তে ওই ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাওয়ার
আশংকা ছিল। এছাড়া ফ্লাইটটি যখন ঝাঁকুনি দিয়ে ল্যান্ড করছিল তখনও ইঞ্জিনের
মধ্যে লোহার ঘর্ষণে আগুন ধরে যাওয়ার আশংকা ছিল। তাদের বক্তব্য বোয়িং চেক
লিস্ট অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য সংশ্লিষ্ট পাইলটদের চাকরিচ্যুত
করা ছাড়াও তাদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বিমান কর্তৃপক্ষ
প্রকৌশল বিভাগের ৯ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও ফ্লাইট অপারেশন শাখার কারও
বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের সঙ্গে
বিমান পর্ষদ চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল এনামুল বারীর সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গে
বিমানের জেনারেল ম্যানেজার (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ যুগান্তরকে বলেন, ফ্লাইট
অপারেশন বিভাগ দেখাশোনা করছে বিমান ম্যানেজমেন্ট। এই বিভাগের সঙ্গে বিমান
পর্ষদ চেয়ারম্যানের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই।

No comments:
Post a Comment