স্বাধীনতার
কথা এলেই সর্বপ্রথম আসে আত্মশনাক্তির প্রসঙ্গ। কেননা যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী
বা জাতি নিজের পরিচয় জানে না, সে নিজের মুক্তির কথা ভাবতে পারে না।
বাঙালির ক্ষেত্রে এই কাজটি প্রথম কে সচেতনভাবে শুরু করেছিল, কেন করেছিল বা
কীভাবে করেছিল তার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য সুলভ না হলেও বাংলা কবিতার ইতিহাস
পর্যালোচনা করলে তার একটি বিশ্বস্ত সূত্র পাওয়া যায়। এই সূত্রটি অবশ্যই
বাংলা ভাষার প্রথম স্বীকৃত নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ ও তার পদকর্তাবৃন্দ। এই
‘চর্যা’গুলো কেবল সমকালীন লোকমানুষের জীবনাচার, সমাজাচার, সংসারধর্ম,
মনোধর্ম বা নান্দনিক চিত্তবৃত্তির বিষয়সমূহ উদঘাটন করে না, বরং ইতিহাসের
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসম্ভারও উন্মোচন করে।
কবির একটি প্রধান কাজ হচ্ছে সমাজের
জন্য নতুন শব্দকল্প বা বাণীপ্রতীক তৈরি করা। ‘চর্যাপদ’-এর কবি ভুসুকু নিজের
ব্যক্তি-গোত্র-জাতি পরিচয় শনাক্ত করতে গিয়ে তেমন একটি শব্দপ্রতীক তৈরি
করলেন, যা বাঙালির ভাবী ইতিহাস ও মনোজাগতিক মুক্তির বিবর্তনে একটি নির্ণায়ক
শব্দাস্ত্র হয়ে দাঁড়াল। ‘আজি ভুসুকু বঙালি ভইলী’। ‘বঙালি’ থেকেই ইতিহাসের
ধারাবাহিক বিবর্তনে ‘বাঙালি’। এটি তার শারীরিক পরিচয়, মানসিক শনাক্তি ও
অগ্রযাত্রার জাতিসম্মত হাতিয়ার। সেই থেকে আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা,
আমাদের অভিব্যক্তি বাঙালিয়ানা, আর জাতি পরিচয়েও আমরা বাঙালি। বাঙালি
ইতিহাসবিদ, ভাবুক, লোকতাত্ত্বিক বা রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি কবিরা
অভ্রান্তভাবে এই সত্যকে ধারণ করেছেন তাদের কাব্যবয়ানে। ভুসুক, চণ্ডীদাশ,
বিদ্যাপতি, লালন, হাকিম, ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল
রায়, নজরুল, জীবনানন্দ, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান হয়ে তাবৎ জাতিগর্বী কবি
এই কাজটি করেছেন। বাঙালির মনোজাগতিক বিবর্তন, সামাজিক দলবদ্ধতা ও
জাতি-পর্যায়ে মুক্তিসংগ্রামকে সার্বিক স্বাধীনতার জন্য এক অপরিহার্য
সশস্ত্র যুদ্ধে পরিণত করার ক্ষেত্রে তারা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।
তাইতো দেখি নজরুল সর্বপ্রথম স্বাধীনতার দাবি তুলেছেন বিশ শতকের দ্বিতীয়
দশকের শুরুতে, সেই সময়ে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিও তারই কবিতায় প্রথম উচ্চারিত, আর
সেই পথ ধরেই তিনি ১৯৪২ সালে তার ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের
অপরিহার্যতা ও রূপরেখা ঘোষণা করলেন। তারই বাস্তবায়ন ঘটল সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ
বাঙালি রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠে, ‘এবারের সংগ্রাম
আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ নবম শতক
থেকে বিংশ শতক : আমাদের স্বাধীনতার সমরযাত্রায় এই বারোটি শতাব্দী বাঙালির
আত্মিক-শারীরিক-মনোজাগতিক মুক্তির এক সুদীর্ঘ বিবর্তন-পর্ব। ফলে হঠাৎ করে
মাত্র নয় মাসের যুদ্ধেই বাঙালির মুক্তি আসেনি। বরং তার সূচনা ও পরিণতি
পর্বের সত্যকথন গ্রাহ্যতায় নিলে স্বীকার করতেই হবে যে, বাঙালি জাতিসত্তার
সূচনা, সংগঠন, বিবর্তন, মেরুকরণ ও তার যৌক্তিক ফসল হিসেবে বাঙালির মুক্তি
ইতিহাসের এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। এই পরিণতিকে অর্জন করার জন্য তথাকথিত
‘ভীরু’ বাঙালিকে একটি সামরিক জাতিতে এবং প্রত্যেক শুদ্ধ বাঙালিকে চেতনায় ও
বাস্তবে একেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হতে হয়েছে। বিসর্জিত হয়েছে ত্রিশ লক্ষ
বাঙালি প্রাণ। ফলে বাঙালির জয় ও বাংলার স্বাধীনতা হঠাৎ করে কারও দানে পাওয়া
নয়, বরং ইতিহাসের যৌক্তিক পরিণতিতে বহু শতাব্দীর জনযুদ্ধে অর্জিত একটি
মহাকালিক সত্য। ‘রক্ত দিয়ে কেনা এদেশ, নয় করুণার দান/বাংলাদেশের স্বাধীনতা
বীরের অবদান।’ আত্মপরিচয়ের নিঃশঙ্কচিত্ততা, বোধিসত্তা, সচেতনতা,
শক্তিমত্তা, সামরিক শ্রেষ্ঠতা ও মনোজাগতিক মুক্তচিত্ততার কারণেই বাঙালি আজ
এক বিজয়ী জাতি। তাই আমাদের অকুতোভয় উচ্চারণ : বাংলার জয় হোক বাঙালির জয়; এই
জয় চির অক্ষয়।

No comments:
Post a Comment