নারায়ণগঞ্জ
সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করছে বিএনপি। গত
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের পর দলের হাইকমান্ডে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা।
দলটির সংশ্লিষ্ট নেতারা এ নিয়ে নানাভাবে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করছেন।
তারা বলছেন, আলাদা প্রতীকে বিএনপির কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও ধানের শীষের
মেয়র ভোট কম পেলেন কেন? এক্ষেত্রে সরকার কোনো মেকানিজম করেছে কি না?
এ
অবস্থায় আইভীর সাথে দলের প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানের প্রাপ্ত ভোটের
ব্যবধানের নেপথ্য কারণ খতিয়ে দেখতে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন
বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছেন।
পরিবেশ ভালো থাকা ও সুষ্ঠুভাবে ভোট হওয়ার পরও কেন বিএনপির প্রার্থী জয়ী হতে
পারল না? স্থানীয় বিএনপিতে কোনো কোন্দল আছে কি না? সেসব কারণ অনুসন্ধান
করছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে দলের বাইরে প্রফেশনাল লোকদের দিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন
খালেদা জিয়া। সার্বিক কারণ অনুসন্ধান শেষে তিনি কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয়
(নারায়ণগঞ্জ) নেতাদের মধ্যে যারা নির্বাচনী কাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাদের
পুরস্কার অথবা তিরস্কার করবেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এ দিকে বিএনপির কিছু
নেতার মতে নাসিক নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে জয়ী হয়েছে। দলের
এক সিনিয়র নেতা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, হয়তো সাখাওয়াত মেয়র হলে বিএনপি
সেখানে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী হতো। কিন্তু পরাজিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে
কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারে বিএনপি যে দাবি জানিয়ে
আসছিল দীর্ঘ দিন ধরে তা এ নির্বাচনে সূচিত হলো, যা আগামী জাতীয় নির্বাচনে
কার্যকর প্রভাব ফেলবে। গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে
সাংবাদিকদের কাছে নাসিক নির্বাচন নিয়ে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন বিএনপির
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, দৃশ্যত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনটা ফেয়ার,
ফলাফলটা আনফেয়ার। এ ফলাফল অপ্রত্যাশিত ও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
নির্বাচনে
জয়-পরাজয় থাকবেই। আমার কথাটা হলো, ভোটের ফলাফলের যে ব্যবধান তা
অবিশ্বাস্যকর। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আজকের প্রধানমন্ত্রী
বলেছিলেন, এরশাদ মিডিয়া ক্যু করছেন। আমি তার সুর ধরেই বলতে চাই এই ফলাফলটাও
মিডিয়া ক্যু। একটা প্রবাদ আছে, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, না পড়িলে ধরাÑ
আমাকে এই আলামতই খুঁজতে হবেÑ এই ফলাফলটা কিভাবে তৈরি হলো এবং ফলাফলটা কোন
প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা প্রচার করল, প্রকাশ করল। এখন আমার একটা দায়িত্ব
যেহেতু আমার জবাবদিহিতার ব্যাপার আছে তা খুঁজে বের করার। নির্বাচন কমিশনের
ঘোষিত ফলাফল বিএনপি মানছে কিনাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই যে বলে নাÑ ফুল
ফুটক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত। আমরা মানি বা না মানি আইভী মেয়র। কিন্তু
আমাদের প্রশ্নগুলো থেকেই যাবে। উল্লেøখ্য গত বৃহস্পতিবার দলীয় প্রতীকে
নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী টানা দ্বিতীয়
মেয়াদে নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচিত হন। ঘোষিত ফল অনুযায়ী আইভী নৌকা
মার্কায় পেয়েছেন এক লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাখাওয়াতের
ধানের শীষ পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৪ ভোট। মিডিয়া ক্যুর অভিযোগ সম্পর্কে নিজের
যৌক্তিকতা তুলে ধরে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দেখুন আমাদের দলের কাউন্সিলর
প্রার্থী পাস করছেন বেশি। সে েেত্র দেখা যায়, আমাদের কাউন্সিলর বেশি,
মেয়রের ফলাফলটা গেল কোথায়? এই কাউন্সিলরদের নানা মার্কায় ভোট পড়েছে, তাদের
ভোট তো বিএনপির ভোট। তাহলে তাদের তো ধানের শীষের মার্কায় ভোট দিতে কখনোই
কৃপণতা হওয়ার কারণ নেই।
তিনি বলেন, ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনা শুরু হয়েছে
মাত্র। তখন বিভিন্ন মিডিয়া রেজাল্টগুলো দিচ্ছে অসমর্থিতভাবে। মিডিয়ায় সব
সময় রেজাল্ট দেয় অফিসিয়ালি ঘোষণার পর অর্থাৎ যা পায়, তাই দেয়। বৃহস্পতিবার
অসমর্থিত সূত্রে ফল ঘোষণা শুরু করে। এ অসমর্থিত ফলাফলগুলো শেষ পর্যন্ত দেখা
গেল সমর্থিত। এখানে কম-বেশি হয়নি। যে অসমর্থিত ফলাফল দিয়েছে, তা থেকে ১০
হাজার কম হয়েছে অথবা বেশি হয়েছে, তা কিন্তু হয়নি। এ কৌশলটা যারা ভোট গণনার
ভেতরে ছিলেন, তারা কোনো-না-কোনোভাবে আপনাকে অবহিত করেছেন। আপনারা
কোনো-না-কোনো অসমর্থিত সূত্র থেকে ফলাফলগুলো পেয়েছেন। আপনারা জানেন না, ওই
কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। আমি মিডিয়াকে দুষছি না, তারা একটি ভিত্তির
ওপর ওই অসমর্থিত ফলাফলগুলো প্রচার করেছে। ভোটার উপস্থিতি সম্পর্কে গয়েশ্বর
চন্দ্র রায় বলেন, ভোটের দিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ভোটারের উপস্থিতি নগণ্য ছিল।
এরপর থেকে ভোটারদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। ফলাফলে যে সংখ্যাটা দেখানো হয়েছে,
সেই পরিমাণ যদি ভোটার ভোট দেনÑ তাহলে সকাল থেকে কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়
থাকার কথা। আপনারা গণমাধ্যমের যারা সেখানে ছিলেন, তারা ল্য করেছেন নির্বাচন
চলাকালে উপচে পড়া ভিড় ছিল না। স্থানীয় সংগঠনের নেতৃত্বের দুবর্লতা
নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় নেতৃত্বের
সাংগঠনিক দুর্লবতা সব দলেই থাকে। সেটা আমাদের নির্বাচনে এফেক্ট করেনি। আমরা
কেন্দ্রীয় নেতারা তা কাটিয়ে উঠতে সম হয়েছি। প্রচারণার েেত্র আমাদের
প্রার্থী এগিয়ে ছিল। সর্বত্র তার প্রচার হয়েছে। ভোটারদের নিরাপত্তা ও
শঙ্কামুক্ত করার জন্য নির্বাচনের ভোটগ্রহণের সময়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন
‘অপরিহার্য’ বলে মন্তব্য করে গয়েশ্বর বলেন, অতীতে দেখা গেছে, সেনাবাহিনী
যেখানে ছিল, সেখানে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার জন্য একটা উৎসাহ ছিল।
জামায়াতে ইসলামী প্রচারণা ও জোটের গঠিত সমন্বয় কমিটিতে ছিল না, তাদের
ভূমিকা কেমন ছিল? প্রশ্ন করা হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন,
দৃশ্যত জামায়াতকে আমাদের সাথে প্রচারণায় দেখেননি। কিন্তু ইট ওয়াজ
আন্ডারস্ট্যান্ডিং। টাইম টু টাইম তারা জানিয়েছে, কোথায় কোথায় কাজ করছে, কী
করছে। তাদের যেসব দায়িত্ব আমরা দিয়েছি, সেই দায়িত্বগুলো পালনে তাদের ত্রুটি
পাইনি। কোনো কোনো েেত্র আমাদের দলের ত্রুটি পেয়েছি, ওদের ত্রুটি পাইনি।
নাসিক নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান
লেফট্যানেন্ট জেনারেল (অব:) মাহবুবুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সার্বিক
প্রেক্ষাপটে নাসিক নির্বাচন ছিল সুষ্ঠু, যা দেখেছি এবং জেনেছি নাসিক
নির্বাচন আগের নির্বাচনগুলোর মতো খুব বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। তিনি বলেন,
নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন ভালো জনপ্রিয়।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীরও জনপ্রিয়তা আছে। কারণ তিনি
বর্তমান মেয়র। দুইজনই জনপ্রিয়। যদিও নাসিক নির্বাচনে স্থূল বা সূক্ষ্ম
কারচুপির অভিযোগ উঠেছে, এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার। এর বেশি তিনি কথা বলতে
চাননি।

No comments:
Post a Comment