Tuesday, December 13, 2016

শীতজুড়েই গ্যাস সংকট

চরম গ্যাস সংকটে পড়েছেন রাজধানীবাসী। সংকট উত্তরণেরও কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না বিতরণ কোম্পানি তিতাস। শীত বাড়ার সঙ্গে এ সংকট আরও তীব্র হবে। খোদ তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ বলছে, এবারের শীতে রেশনিং করেও সংকট সামাল দেয়া যাবে না। দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম যোগ হওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার শিল্পখাতেও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মীর মসিউর রহমান রাজধানীতে গ্যাস সংকটের কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি যুগান্তরকে বলেন এ সংকট আরও কমপক্ষে ২ মাস থাকবে। তিনি বলেন, এমনিতে শীতের সময় চাহিদা বেড়ে যায়। তার ওপর কূপের সংস্কারের কারণে শুধু তিতাস কর্তৃপক্ষ দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম পাচ্ছে। তিতাস গ্যাস ক্ষেত্র ১-এ সংস্কার কাজ চলছে। এ কূপের সংস্কার কাজ শেষ হতে আরও কমপক্ষে ৬৫ দিন লাগবে। এ অবস্থায় রাজধানীতে গ্যাস বিতরণে তিতাস কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে বলে তিনি জানান। সরবরাহ কমে যাওয়ায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ি, বাইপাইল, বিসিক, জরুন, কাশিমপুর, কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর, সিনাবহ, চন্দ্রাসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্প কলকারখানায় মারাত্মকভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে শতাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, তিতাস কূপ-১ ছাড়াও আরও কয়েকটি কূপ সংস্কারের কারণে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম উৎপাদন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানি শেভরনের হাতে থাকা বিবিয়ানা গ্যাস ক্ষেত্রে সংস্কার কাজ চলছে। ফলে গ্যাস ক্ষেত্রের একাধিক কূপ কয়েক দিন ধরে বন্ধ আছে। এতে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমে গেছে। তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৬শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে তিতাসের প্রতিদিনের চাহিদা ১ হাজার ৯শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। সংস্থাটি পাচ্ছে ১ হাজার ৪৮০ মিলিয়ন ঘটফুট। ফলে দৈনিক ঘাটতি ৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শীতকালীন বাড়তি চাহিদা ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সব মিলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, তিতাসের ইতিহাসে এরকম অবস্থা আর কখনও তৈরি হয়নি। সোমবার সরেজমিন রাজাধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোর ৬টার পর রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাস থাকে না। ফলে চুলার আগুন নিভে যায়। এরমধ্যে পুরান ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না। অভিজাত এলাকা ধানমণ্ডিতেও গ্যাস সংকটে গৃহিণীদের সারা দিনের রান্না করতে হয় ভোর রাতে। মোহাম্মদপুর, শেখেরটেক, শ্যামলী, আদাবর, মিরপুর, পল্লবী, কাজীপাড়া, সেনপাড়া, শিয়ালবাড়ি, রামপুরা, সিদ্ধেশ্বরী, বনশ্রী, বাড্ডা, তেজগাঁও, তেজকুনিপাড়া, মগবাজার, নাখালপাড়া, শেওড়াপাড়া, কল্যাণপুর, আজিমপুর, মালিবাগ, খিলগাঁও, কমলাপুর, গোলাপবাগ, গোপীবাগ, মানিকনগর, ওয়ারী, বসুন্ধরা ও উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ রাজধানীর বহু জায়গায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ১৯ নম্বর মধুবাজারের বাসিন্দা সিম্মি আক্তার যুগান্তরকে জানান, গত ১৫ দিন ধরে তার বাচ্চাদের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। কিন্তু গ্যাস না থাকায় তিনি সকালে নাস্তা তৈরি করতে পারছেন না। এ কারণে ভোর রাতে ওঠে রান্না বসাতে হয়। রাত ১০টার পর চুলা জ্বলে স্বাভাবিকভাবে। দিনে দুই বার্নার চুলার একটা জ্বললে আরেকটা জ্বলে না। ২-৩ দিনের রান্না একসঙ্গে করে ফ্রিজে রেখে খাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। বেশ কিছু দিন ধরে সময়মতো রান্না করতে পারছেন না রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার রান্নাঘরে চুলা জ্বলে টিম টিম করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে অল্পস্বল্প রান্নাবান্না সেরে নিতে হচ্ছে। তা না হলে গভীর রাতে গ্যাসের চাপ বাড়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় তিতাসের স্থানীয় অফিসগুলোতে অভিযোগের পাহাড় জমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গ্যাস নিয়ে ক্ষোভ চলছে প্রতিনিয়ত। কয়েকদিন আগে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ডক্টর তুহিন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে ইদানীং কাউকে বাসায় নিমন্ত্রণ করেন না তার মা। কারণ রাত ১১টার আগে চুলা জ্বলে না তাদের পুরান ঢাকার চকবাজারের বাসায়। গ্যাস সংকটের কারণে আগের রাতের খাবারটা পর্যন্ত পরদিন দুপুরে গরম করে খেতে পারেন না। কয়লার তন্দুরে বানানো বাখরখানি দিয়ে তাদের সকালের নাস্তা সারতে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে সকালে ছেলেমেয়েদের রান্না করে খাওয়ানো যাচ্ছে না বলে জানান শেখেরটেক এলাকার বাসিন্দা কফিল উদ্দিন। তিনি বলেন, দোকানের শুকনো খাবার খাইয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে হচ্ছে। বাড়িতে মেহমান এলে আরও বিপদ! তখন প্রতিকারের কোনো উপায় থাকে না। গভীর রাতে এ এলাকায় গ্যাস আসে। শেখেরটেক ৬ নম্বর রোডের দোকানদার জসিম উদ্দিন জানান, ইদানীং দোকানে পাউরুটি, চিড়া, গুড়, বিস্কুট ও কলা বেশি করে রাখছেন। এসব দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। একই বক্তব্য আদাবরের দোকানী শফিকুল ইসলামের। তার মতে গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ বাসায় রান্না হয় না। অনেকেই রাতে পাউরুটি, বিস্কুট, কলা খেয়ে থাকছেন। সকালেও নাস্তার টেবিলেও একই খাবার থাকে। শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা মাহবুব জানান, লাইনে গ্যাসের চাপ নেই, টিম টিম করে চুলা জ্বলে, তা দিয়ে দিনে রান্না করা সম্ভব হয় না। গভীর রাতে গ্যাসের চাপ বাড়লে তখন রান্নার সুযোগ হয়। এক সপ্তাহ ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তার রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে টিম টিম করে। রান্না করতে অসুবিধা হচ্ছে বলে জানান রামপুরার বাসিন্দা মামুন। তিনি বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে তার বাসার লোকজন অল্প কিছু রান্না করছেন। অনেক সময় রাত জেগে গ্যাসের চাপ বাড়লে রান্না করতে হচ্ছে। হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। বাচ্চাদের খাবারও গরম করতে পারছেন না। সংকটের সমাধান কবে হবে জানেন না। এভাবে চলা যায় না। গ্যাস নিয়ে ক্ষোভের কথা এভাবেই জানালেন গেণ্ডারিয়ার বাসিন্দা আবেদ রহমান। রাজধানীর ইস্কাটন এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মাস গেলে টাকা ঠিকই দিতে হবে। কিন্তু এখন ছেলেমেয়ের জন্য রান্না পর্যন্ত করতে পারছেন না। এভাবে চলা যায় না।
রাজধানীর আশকোনা মেডিকেল রোডের বাসিন্দা মো. তমিজউদ্দিন সরকার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, রাজধানীর অন্য এলাকার নারীরা রাতে ঘুমান। আর আমাদের এলাকার নারীরা রাত জেগে রান্না করেন। তিনি বলেন, গত ৩ মাস ধরে দিনে এলাকায় কোনো গ্যাস থাকে না। শীতের সময় রাতেও একই অবস্থা হয়। তার মতে রাজধানীর উত্তরখান ও দক্ষিণখানসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষের বাড়িতে দিনে গ্যাস না থাকায় চুলা জ্বলে না। ভোর ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে এসব এলাকা থেকে গ্যাস চলে যায়। ফেরে রাত ১২টা কিংবা ১টার দিকে। দিনের পর দিন এ অবস্থা চললেও সমস্যা সমাধানে তিতাসের কর্মকর্তাদের কোনো উদ্যোগ নেই বলেও তিনি জানান। গ্যাস সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের অদৃশ্য সীমানা নামে একজন লিখেছেন, এক সময় আমিও গ্যাসের চুলা ব্যবহার করতাম। এখন সেটা অতীতকাল। এখন আমি চুলার পরিবর্তে ইলেকট্রিক কেটলি, রাইস কুকার, ইলেকট্রিক ওভেন এবং ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছি। দেশ আসলেই ডিজিটাল হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মনে হচ্ছে ভবিষ্যতে বাচ্চাদের কাছে গ্যাসের চুলা ব্যবহারের কথা গল্প বানিয়ে বলতে হবে।

No comments:

Post a Comment