মিয়ানমারে
পুলিশ ও রাখাইন যুবকরা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ
পৈশাচিক নির্যাতন শুরু করেছে ৯্ই অক্টোবর থেকে যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো এলপি মারসুদি ইয়াঙ্গুন সফর করলেও
থামেনি বর্মী সেনাদের তাণ্ডবলীলা। ইতিমধ্যে মংডুর সর্বাপেক্ষা রোহিঙ্গা
পরিবার অধ্যুষিত বুড়াসিকদার পাড়া ত্যাগ করার জন্য বর্মী সেনারা ৩ দিনের সময়
সীমা বেঁধে দেয়ায় সেখানে আতঙ্ক আরো বেড়েছে। বিজিবি’র সতর্ক নজরদারিতেও
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ থামছে না। গত বুধবার রাতে আরো ২০ পরিবারের প্রায় শতাধিক
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে কুতুপালং বস্তির পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয়
নিয়েছে। সম্ভ্রম, স্বজনহারা বিধবা রোহিঙ্গা নারী ও পিতৃহীন শিশুদের কান্নায়
পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। অপ্রতুল ত্রাণ সামগ্রীর কারণে অনেকেই প্রচন্ড
কুয়াশায় চাদরে রাত কাটাচ্ছে। আইওএমও ডব্লিউএফপি’র সদ্যাশ্রিতা রোহিঙ্গা
পরিবার পিছু ২৫ কেজি করে চাল ও কম্বল বিতরণ করলেও ভুক্তভোগী রোহিঙ্গারা তা
পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা
জানান, বস্তি এলাকায় স্ব-ঘোষিত চেয়ারম্যান ও নেতা নামধারী ৬ জনের একটি
সিন্ডিকেট যথাক্রমে আবু ছিদ্দিক (৫৫), মোহাম্মদ নুর (২৬), মো. আয়ুব (২৭),
আবদুুস শুক্কুর (৪০), রুহুল আমিন মাঝি (৫০) ও মোহাম্মদ ছালাম মাঝি (৪৫)
ত্রাণ ও ঝুপড়ি ঘর বরাদ্দের নাম ভাঙিয়ে পরিবার পিছু চাঁদা আদায় করছে। মড়ার
উপর খাঁড়ার ঘা’ সর্বশান্ত রোহিঙ্গারা তাদের কথা মত টাকা দিতে না পারলে
বঞ্চিত হচ্ছে প্রদত্ত ত্রাণ সামগ্রী থেকে। ফলে সম্ভ্রম ও স্বজনহারা পিতৃহীন
শিশুরা বরাবরই ত্রাণসামগ্রী থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার
ভোররাতে মংডুর রুড়াসিকদার পাড়া থেকে আসা শাহ্ আলম (৪৫), মোহাম্মদ আয়ুব
(৪০), ফরিদুল আলম (৩০) ও লিয়াকত আলী (২৮) জানান, বুড়াসিকদার পাড়া গ্রামে
প্রায় ৬৮০টি পরিবার রয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকেই সচ্ছল পরিবার। গত মঙ্গলবার
সশস্ত্র বর্মী সেনারা গ্রামে প্রবেশ করে সবাইকে ৩ দিনের মধ্যে গ্রাম ত্যাগ
করার নির্দেশ দেয়ার ঘটনায় সেখানে নতুন করে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে তাদের
অভিযোগ। এ সময় বস্তি এলাকায় দেখা হয় ১৯ বছর বয়সী সাদিয়া নামের এক নারীর
সঙ্গে। সে জানায়, তার ছোট বোন পারভীন ব্যতিত ১১ জনের সংসারে আর কেউ বেঁেচ
নেই। সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাদিয়া জানায়, প্রায় ৯ দিন আগে
গভীর রাতে বর্মী সেনারা তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় ঘুমন্ত বাবা আবুল
কালাম (৫৫), মা রাজিয়া বেগম (৪৫) কে ধারালো কিরিচ দিয়ে হত্যা করে বাড়িতে
আগুন ধরিয়ে দেয়। ফলে তাদের জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় বোন আলখিক (২৫),
খাদিজা (২৮), তাহেরা (২৩), রাশেদা (২২), আছিয়া (২০), ভাই আবুল হাছান (৩৫)সহ
৯ জন। সাদিয়া আরো জানায়, মগসেনাদের জুলুম থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য ৭ দিন
বন-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার
ভোররাতে ঢেঁকিবনিয়া হয়ে তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে বস্তিতে এসেছে। এ পর্যন্ত
তারা কোন ত্রাণসামগ্রী পায়নি। কোথায় রাত কাটাবে তাও জানে না। নিবন্ধিত
রোহিঙ্গা নেতা ফয়সাল আনোয়ার জানান, ৩৩ শ’ পরিবারের প্রায় ১৭ হাজার রোহিঙ্গা
কুতুপালং বস্তিসহ বনভূমির পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। এদের
অধিকাংশ এখনো ত্রাণসামগ্রী পায়নি। ডব্লিউএফপি’র প্রোগ্রাম অফিসার এসকে
হাসান জানান, এ পর্যন্ত সাড়ে ২৩ শ’ পরিবারকে ২৫ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে।
আইওএম এর ম্যানেজার সৈকত বিশ্বাস জানান, তারা ২৫শত পরিবারকে কম্বল বিতরণ
করেছেন। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ আরমান শাকিলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি
বলেন, বস্তি এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে না থাকায় এ বিষয়ে তিনি কোনো কিছু
মন্তব্য করতে পারছেন না। তবে কিছু কিছু নতুন রোহিঙ্গা আত্মীয়তার সুবাধে
ক্যাম্পে আসা যাওয়া করছে বলে জানা গেছে।
>>>মানবজমিন। রাসেল চৌধুরী, কক্সবাজার

No comments:
Post a Comment