ষাট
বছর পেরিয়েছে ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের। ক্রিকেট
থেকে ফুটবল, ফুটবল থেকে ক্রিকেট। আবার ক্রিকেট থেকে ফুটবল। এভাবেই বছরের
পর বছর কতই না আয়োজন হয়েছে এই স্টেডিয়ামে। তবে দেশের অন্যতম পুরনো এ
স্টেডিয়াম আজ ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। খেলাধুলার পরিবেশ নেই। বারোয়ারি বাজারে
পরিণত হয়েছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। কি নেই এখানে। ফুচকা, ঝালমুড়ি,
স্যুপের দোকান, ফাস্টফুড, বিরিয়ানি কারির দোকান তো আছেই, খুরমা, খেজুর,
শসা, সফেদা, আনার, আম, আনারস থেকে শুরু করে যে কোনো ফল মিলবে বঙ্গবন্ধু
জাতীয় স্টেডিয়াম চত্বরে। এখানেই শেষ নয়, শার্ট কিনবেন? চলে যান পল্টনে।
থ্রি-পিস, কোট, শাল, লুঙ্গি, জুতা হেন কোনো জিনিস নেই যা পাবেন না এখানে।
ওয়াসার পাম্প থেকে পানি বিক্রি হচ্ছে দেদারে। বিকেল হতেই ডিম গরম, চিতই
পিঠা, ভাপা পিঠার পসরা নিয়ে হাজির হন হকাররা। তার মধ্যে ফেনসিডিল, গাঁজা,
মদ, চরস দেদারে বিক্রি হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। রাত নামলে আড়ালে-আবডালে
অনৈতিক কাজেরও ফিসফিসানি শোনা যায়। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নেই কোনো
পাবলিক টয়লেট। ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তারা যুগে যুগে টয়লেটগুলো দোকান
বানিয়ে বিক্রি করেছেন। বিনিময়ে টু-পাইস ভরেছেন পকেটে। খেলাধুলার প্রতি নজর
না থাকলেও কর্মকর্তাদের নজর সব সময়েই ছিল স্টেডিয়াম ও ভবন তৈরির দিকে। সেই
ধারা এখনও চলছে। সবচেয়ে বড় সংকট এখন, স্টেডিয়াম চত্বরে হাঁটাচলা করাই দায়
হয়ে পড়েছে। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং ও দোকানদারদের মালামাল দখল করে থাকে
ফুটপাত ও করিডোর। দেখার যেন কেউ নেই। অনেকটাই অভিভাবকহীন জাতির জনকের নামের
এই স্টেডিয়ামটি। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মাণ করা হয় ঢাকা
স্টেডিয়াম। তার আগে মাঠের নামকরণ ছিল ঢাকা ডিএসএ মাঠ। গভর্নর ফিরোজ খান নুন
স্টেডিয়াম নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন। পরের বছরেই উপমহাদেশের টেস্ট
খেলুড়ে দুই দেশ পাকিস্তান ও ভারত ঢাকা স্টেডিয়ামে অভিষেক টেস্ট খেলে। এছাড়া
২০০০ সালে বাংলাদেশ তাদের উদ্বোধনী টেস্ট ম্যাচ খেলে এই ভেন্যুতে ভারতের
বিপক্ষে, যা পৃথিবীর টেস্ট ইতিহাসে প্রথম। শুধু ক্রিকেটই নয়, এ স্টেডিয়ামে
অনুষ্ঠিত হয়েছে ফুটবল, হকি এবং বক্সিংও। ১৯৭৮ সালে এই স্টেডিয়ামেই ২৪টি
দলের অংশগ্রহণে সফল আয়োজন হয়েছিল এশীয় যুব ফুটবলের। ওই বছরেই প্রয়াত
কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলী ১২ বছর বয়সী আবদুল হালিমের সঙ্গে প্রদর্শনী
বক্সিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে।
ফুটবলের যৌবন এখানে
দেখেছে দেশবাসী। ফুটবলে জয়-পরাজয় নিয়ে ক্লাব সমর্থকদের মধ্যে তুলকালাম
কাণ্ডের সাক্ষী এ স্টেডিয়াম। বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর এ
স্টেডিয়ামেই ভারতের বিপক্ষে প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ম্যাচ খেলে।
২০০৪-০৫ সালেই সর্বশেষ ক্রিকেট ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সফরকারী
জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টেস্ট এবং ওয়ানডে ম্যাচ খেলে স্বাগতিক বাংলাদেশ। টেস্ট
ম্যাচ ড্র হয়। সেই বছরের ৩১ জানুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে
ক্রিকেটের শেষযাত্রা। পাকাপাকিভাবে হয়ে যায় ফুটবল ও অ্যাথলেটিকসের। মিরপুরে
চলে যায় ক্রিকেট। তবে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, ২০১৪ টি
২০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছে এখানে। ২০১০ ঢাকা এসএ গেমসের
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভেন্যু ছিল এ স্টেডিয়াম। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম
বিশ্ববাসীর কাছে আরও বেশি পরিচিতি পেয়েছে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর
আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়ার প্রীতি ম্যাচের জন্য। যে ম্যাচে আর্জেন্টিনার হয়ে
খেলেছিলেন চার বার ফিফা ব্যালন ডি’অর জেতা বার্সেলোনার লিওনেল মেসি। সেই
বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে খেলতে গিয়ে খেলোয়াড় ও দর্শকরা থাকেন আতংকগ্রস্ত। এই
বুঝি বেপরোয়া কোনো হিউম্যান হোলার গায়ের উপর ওঠে আসে। গাড়ির চাকায় পিষ্ট
হওয়ার আতংক থাকে সারাক্ষণই। বেশ ক’জন ক্রীড়ামোদী বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু
স্টেডিয়াম চত্বরে আহত হয়েছেন গাড়ির ধাক্কায়। খেলাধুলা নয়, বারোয়ারি বাজারে
পরিণত বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামটি। এ নিয়ে খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভের
অন্ত নেই। হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান কোহিনুরের
কথায়, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে স্টেডিয়াম এটি। এখানে সুস্থ পরিবেশে খেলাধুলা
সম্ভব নয়।’

No comments:
Post a Comment