শাকসবজির
প্রধান মৌসুম হল শীতকাল। এ সময় শাকসবজি বেশি উৎপাদন হয়। তাই শাকসবজিকে বলা
হয় শীতকালীন শস্য। শাকসবজিতেই মানবদেহের প্রয়োজনীয় ভিটামিন আছে। শাকসবজির
আকার, প্রকার, জাত ও মানভেদে ভিটামিনের তারতম্য রয়েছে। এ বিষয়ে পুষ্টিবিদ
সেলিনা বদরুদ্দিন বলেন, শীতকালীন শাকসবজি পুষ্টির অন্যতম আধার। অপুষ্টির
প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত সবজি গ্রহণ। পরিমিত পরিমাণ সবজি গ্রহণ না করলে শরীরে
পুষ্টি উপাদান যেমন বিটা ক্যারোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমে যায়। এফএও (FAO)-এর
তথ্য অনুসারে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ২০০ গ্রাম সবজি প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক
পুরুষ ও মহিলার খাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মাথাপিছু সবজি খাওয়ার হার মাত্র
৫৫ গ্রাম। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সুস্থ থাকার জন্য একজন মানুষের
শরীরে পরিমিত মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান যার মধ্যে ভিটামিন-
ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে এবং খনিজ লবণ-
ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ফসফরাস থাকা প্রয়োজন। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের সবজি
গ্রহণের মাধ্যমে এর চাহিদা মেটানো সম্ভব। বাংলাদেশে যত প্রকার সবজি জন্মে
তার সিংহভাগ সবজি শীতকালে জন্মে। এবার জেনে নেয়া যাক শীতকালীন সবজির
গুণাগুণ।
শীতকালে যেসব সবজি বেশি পাওয়া যায় তার মধ্যে টমেটো অন্যতম। টমেটো
সবজি হিসেবে আমরা খাই। কাঁচা টমেটো সালাদ আর রান্না করে তরকারি। প্রতি ১০০
গ্রাম টমেটোতে আছে- ভিটামিন এ ১০০০ আইইউ, ভিটামিন-সি ২৩ মিলিগ্রাম,
ক্যালসিয়াম ১১ মিলিগ্রাম, লৌহ ০.৬ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ২৭ মিলিগ্রাম,
পটাশিয়াম ৩৬০ মিলিগ্রাম এবং প্রোটিন ১ গ্রাম। আছে নিকোটিনিক এসিড ও প্রচুর
গ্লুটামিক এসিড (৮৬-১৪০ গ্রাম)। এক’শ গ্রাম টমেটো থেকে শক্তি পাওয়া যায়
প্রায় ২০ ক্যালরি। টমেটোতে পানির পরিমাণ প্রায় ৯৪ শতাংশ। টমেটো শরীরের জন্য
খুবই উপকারী। এর ভিটামিন-এ ত্বককে সুন্দর রাখে। ভিটামিন সি স্কার্ভি
প্রতিরোধ করে। ভিটামিন কে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। নিকোটিনিক এসিড রক্তের
কোলেস্টেরল কমায়, তাই হৃদরোগ প্রতিরোধে টমেটো সহায়ক। গ্লুটামিক এসিড
মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে। টমেটোর পটাশিয়াম স্ট্রোক প্রতিরোধে কার্যকরী।
‘লাইকোপিন’ নামক এক ধরনের শক্তিশালী এন্টি অক্সিডেন্টের উপস্থিতির কারণে
টমেটোর রং লাল। টমেটোর মতো এত অধিক লাইকোপিন আর কোনো ফল বা সবজিতে নেই।
লাইকোপিন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। জরায়ুর মুখ, প্রস্টেট, বৃহদন্ত্র, মলাশয়,
পাকস্থলি, গ্রাসনালি ইত্যাদি অঙ্গের ক্যান্সার প্রতিরোধে টমেটো সহায়ক বলে
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ। লাইকোপিন শরীরে তৈরি হয় না, তাই বাইরে থেকে এর
সরবরাহ প্রয়োজন। রান্নায় লাইকোপিন নষ্ট হয় না, বরং বাড়ে। তাই টমেটো
তরকারিতে দিয়ে রান্না করে খাওয়াও বাড়তি উপকার। দৈনিক তিন থেকে চারটি টমেটো
খেলে এসব উপকার পাওয়া যাবে। শীতকালে আমাদের দেশে লাউ বেশ পাওয়া যায়। ব্যাপক
জনপ্রিয় ও সুস্বাদু সবজি লাউ। গ্রামে কিংবা শহরে সব মানুষের কাছে পরিচিত এ
সবজি।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন এ সবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর। এসব কারণে লাউ
আমাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। লাউয়ের জন্ম ইতিহাস থেকে জানা যায়, এর আদি
নিবাস আফ্রিকা। পরে তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। লাউ একটি
লতানোজাতীয় উদ্ভিদ। লাউয়ে ভিটামিন বি সি শর্করা ও খাদ্য শক্তি পাওয়া যায়।
পাতায় এ সি ক্যালসিয়াম প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। বীজে থাকে ৪৫ শতাংশ ফ্যাট
এসিড, প্রোটিন, অ্যামাইনো এসিড ইত্যাদি। বীজের তেল মাথাব্যথা দূর করে এবং
লাউ রান্নায় সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম
খাবার উপযোগী লাউগাছের পাতায় খাদ্য উপাদান হল- প্রোটিন ২.৩ গ্রাম, শর্করা
৬.১ গ্রাম, চর্বি ০.৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮০ গ্রাম, ক্যারোটিন ১৮৭
মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন সি ৯০ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৩৯ কিলোক্যালরি। ১০০
গ্রাম খাবার উপযোগী লাউয়ে খাদ্য উপাদান হল- জলীয় অংশ ৮৩.১ গ্রাম, প্রোটিন
১.১ গ্রাম, শর্করা ১৫.১ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৬ গ্রাম, লৌহ
০.৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৪ মিলিগ্রাম, খাদ্যশক্তি ৬৬ কিলোক্যালরি, খনিজ
পদার্থ .৫ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট ২.৫ গ্রাম, ফসফরাস ১০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন
বি ১০.০৩ মিলিগ্রাম, বি ২.০১ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.০২ মিলিগ্রাম তা ছাড়া
ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, ওমেগা ৬, ফ্যাটি এসিড আছে। লাউয়ের নানা ঔষধি গুণাগুণও
রয়েছে। যারা কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে ভোগেন তারা নিয়মিত লাউ খেলে উপকার পাবেন।
বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলারা প্রায়ই কোষ্ঠকাঠিন্য রোগে আক্রান্ত হন। তারা লাউ
খেয়ে উপকার পেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে লাউ শাক খুবই উপকারী। যাদের খাবার কম
হজম হয় বা অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে তাদের জন্য লাউ খুবই উপকারী সবজি। নিয়মিত
খেলে কর্ম শক্তি বাড়ে। যাদের শরীর গরম, বা মাথা গরম থাকে তারা লাউ খান
উপকার পাবেন। যারা হৃদরোগে আক্রান্ত তারা নিয়মিত লাউ খান উপকার পাবেন।
লাউ
খেলে শরীরের চামড়ার আর্দ্রতা বজায় থাকে। ফলে শীতকালে চামড়ার টান টানভাব কমে
যায়। যারা হাইপ্রেশারে ভোগেন তারা নিয়মিত লাউ খান উপকার পাবেন। কানের
ব্যথায় লাউগাছের নরম ডগার রস দিলে উপকার পাওয়া যায়। লাউগাছের পাতার রসের
সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খেলে জন্ডিস রোগে উপকার হয়। রাতে যাদের ঘুম কম হয় তারা
রাতের খাবারে লাউ রাখলে উপকার পেতে পারেন। যাদের সব সময় মাথা গরম থাকে তারা
লাউয়ের বীজ বেটে মাথার তালুতে দিলে উপকার পাবেন। শরীরে তাপমাত্রা অত্যন্ত
বেড়ে গেলে বা জ্বর হলে লাউয়ের শাঁস নরম করে কপালে কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখলে
খুবই উপকার পাওয়া যায়। তাপ শোষিত হয়ে যায়। খাওয়া অরুচি দেখা দিলে লাউয়ের
সবজি বা লাউয়ের বাকলের ভাজি খান সমস্যা কমে যাবে। লাউগাছ বাড়ির আশপাশে
লাগান যত্ন নিন। পরিবারের তরকারি সমস্যা সমাধান হবে। সবার পুষ্টি চাহিদাও
পূরণ হবে। বাঁধাকপি একটি সুস্বাদু শীতকালীন সবজি। আমাদের দেশের ঘরে ঘরে
একটি জনপ্রিয় খাবার এ সবজি। এটি কাঁচা এবং রান্না দু’ভাবেই খাওয়া যায়।
স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় এ সবজিটি বিশেষ পদ্ধতিতে চাষ করার কারণে মোটামুটি
সারা বছরই পাওয়া যায়। তবে শীতকালীন বাঁধাকপির স্বাদ তুলনামূলকভাবে অন্য
সময়ের চেয়ে বেশি। শুধু স্বাদই নয় বাঁধাকপির রয়েছে রোগ প্রতিরোধ, ওজন কমানোর
মতো গুরুত্বপূর্ণ সব উপাদান। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতি ১০০ গ্রাম
বাঁধাকপিতে রয়েছে ১.৩ গ্রাম প্রোটিন, ৪.৭ গ্রাম শর্করা, ০.০৬ মিলিগ্রাম
ভিটামিন বি ১, ০.০৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি২ ও ৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। তা
ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বাঁধাকপিতে ৩১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮ মিলিগ্রাম
লৌহ, ৬০০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন ও ২৬ কিলো ক্যালোরি খাদ্যশক্তি থাকে। আসুন
জেনে নেয়া যাক কোন ৬টি কারণে বাঁধাকপি খাওয়া উচিত। নিয়মিত বাঁধাকপি খেলে
আপনার আর মাল্টিভিটামিন খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। কারণ বাঁধাকপিতে শরীরের জন্য
প্রয়োজনীয় সব ভিটামিনই আছে।
বাঁধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ও কে
আছে। ভিটামিন সি হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। এ ছাড়া বাঁধাকপিতে উপস্থিত
ভিটামিন কে হারকে মজবুত রাখে। যারা নিয়মিত বাঁধাকপি খায় তারা বয়সজনিত হাড়ের
সমস্যা থেকে রক্ষা পায়। বাঁধাকপিতে খুবই সামান্য কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত
চর্বি আছে। এ ছাড়া বাঁধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার আছে। ওজন কমাতে নিয়মিত
সালাদে বাঁধাকপি খাওয়ার বিকল্প নেই। ওজন কমাতে চাইলে নিয়মিত খাবার তালিকায়
প্রচুর পরিমাণে বাঁধাকপি রাখা ভালো। পাকস্থলীর আলসারও পেপটিক আলসার
প্রতিরোধে বাঁধাকপির জুড়ি নেই। বাঁধাকপি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা
করে। ত্বক ভালো রাখতে বাঁধাকপি ভালো কাজ করে। এর কাঁচাপাতা রোজ ৫০ গ্রাম
করে খেলে পাইওরিয়া এবং দাঁতের অন্য কোনো সমস্যা থাকবে না? প্রতিদিন
বাঁধাকপির পাতা ৫০ গ্রাম খেলে আপনার মাথায় চুল গজাবে? বাঁধাকপির রস খেলে ঘা
সেরে যায়। শীতকালীন শাকসবজির মধ্যে অন্যতম পুষ্টিকর সবজি গাজর। গাজরের
প্রায় ১০০টি ভিন্ন ধরনের প্রজাতি রয়েছে। গাজরে রয়েছে ভিটামিন ও মিনারেল।
যেমন- থায়ামিন, নিয়াসিন, ভিটামিন বি৬, ফলেইট এবং ম্যাংগানিজ যা স্বাস্থ্যের
জন্য অনেক জরুরি। এ ছাড়া গাজরে আরও আছে ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি,
ভিটামিন কে ও পটাশিয়াম। অর্থাৎ আমাদের দেহকে সুস্থ সবল রাখতে যেসব ভিটামিন ও
খনিজ উপাদান প্রয়োজন তার সবই আছে গাজরে। গাজরকে বলা হয় সর্বগুণে গুণান্বিত
সবজি। সব বয়সী নারী-পুরুষের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ এ সবজি। তাই শীতকালীন
সতেজ সজিব শাকসবজি নিয়মিত খান। সুস্থ সুন্দর জীবন উপভোগ করুন।

No comments:
Post a Comment