আওয়ার
ইয়ার অব দ্য লর্ড। প্রভুর বছর। ANNO DOMINI (AD) | AD বা আফটার ডেথ :
যিশুর মৃত্যুর পরের বছর। BC বা Before Christ, বা যিশুখ্রিষ্টের জন্মের আগে
ইত্যাদি। প্রভু যিশুর জন্মকে কেন্দ্র করে বছরের হিসাব রাখা এবং খ্রিষ্টীয়
ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী বছর গণনার নিয়মে আরেকটি খ্রিষ্টীয় বছর শেষ হতে
চলেছে। নতুন খ্রিষ্টীয় বছরে নববর্ষ উদযাপনের ঐতিহ্য রোমানদের কাছ থেকে
পাওয়া। রোমান ঈশ্বর জানুসকে (Janus) নিবেদন করা খাওয়া-দাওয়ার উৎসব থেকে এই
চলের শুরু। জানুসকে রোমানরা কল্পনা করেছে দুই দিকে তাকিয়ে থাকা মুখ হিসেবে।
এক মুখ তাকিয়ে আছে অতীতে, আরেক মুখ ভবিষ্যতের দিকে। ধর্ম, ঐতিহ্য কিম্বা
সংস্কৃতি কোন দিক থেকেই ইংরেজি নববর্ষের সঙ্গে আমাদের কোন যোগ নাই। ত্রয়োদশ
পোপ গ্রেগরি পুরানা খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সংস্কার করেন, তাঁরই করা
খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয় ও চালু।
এর ফলে বছর গণনার
খ্রিষ্টীয় রীতিই আমরা গ্রহণ করেছি। ঐতিহাসিকভাবে বিচার করলে খ্রিষ্টীয়
ক্যালেন্ডার মানা ও ব্যবহার ঔপনিবেশিক গোলামির চিহ্ন ধারণ ও চর্চা বটে, তবে
নতুন খ্রিষ্টীয় বছরে বিতর্ক তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়। এতটুকুই আপাতত
উদ্দেশ্য যে গোলামির চিহ্ন ও মনমানসিকতা থেকে মুক্ত হবার লড়াই যেহেতু
বর্তমানকে অতিক্রম করে যাবার বাসনার সঙ্গে যুক্ত; অতএব অতীত মনে রাখা
জরুরি। অর্থাৎ ইতিহাস। এই যুক্তিতে ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়া আমার কর্তব্য
বটে। গোলামির চিহ্ন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে, ইতিহাস পর্যালোচনা
এবং নিরন্তর নতুন সম্ভাবনার অনুসন্ধান। হ্যাপি নিউ ইয়ার। সবাইকে নতুন
ঈসায়ী বছরের শুভেচ্ছা। খ্রিষ্টীয় পাশ্চাত্যের যিশুখ্রিষ্ট ইসলামেরও নবী :
হজরত ঈসা (আ:)। আরেকটি ঈসায়ী বছর শেষ হচ্ছে। লিখছি দুই হাজার ষোল সালের শেষ
দিন ভোরে। ছাপা হবে নতুন ঈসায়ী বছর ২০১৭ সালে। আমার ঘরের জানালার বাইরে
কুয়াশা। খুব ঘন নয়, খুব তরলও নয়।
এর একটি প্রতীকী তাৎপর্য থাকতে পারে, হয়তো
ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য খুব অস্পষ্ট নয়, হতাশার প্রাবল্যে আমরা সাধারণত
নেতিবাচকভাবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। নতুন ঈসায়ী বছরে আমি নেতিবাচক কিছু
ভাবতে চাই না, বরং মনে হচ্ছে একটি সন্ধিক্ষণের মুহূর্তই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
নিজেদের ইতিহাস নিয়ে নতুনভাবে ভাববার এবং বিশ্বে বাংলাদেশের যোগ্য স্থান
আদায় করে নেবার কর্তব্য আমাদের সামনে দ্রুত হাজির হচ্ছে। সুযোগ অনেক বাড়বে,
সুযোগ অনেক বাড়ছে। আমাদের জানতে হবে কিভাবে বর্তমান বাস্তবতার মধ্য থেকে
আমরা আমাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় আদায় করে নিতে পারি। প্রশ্ন হচ্ছে
সন্ধিক্ষণের মুহূর্তের সম্ভাবনা আদায় করে নিতে আমরা তৈরি কি না? এই
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার একার দায় না। যারা বর্তমান অবস্থানের পরিবর্তন
চান, তাদের সকলকে তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকেই এই উত্তর দিতে হবে। সে
ব্যাপারে তাই কিছু বলতে চাইছি না। আমি বর্তমান সময়কে সন্ধিক্ষণের মুহূর্ত
বলছি সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের জায়গা থেকে। নতুন ঈসায়ী বছরে সেই বিষয়েই
দুই-একটি কথা বলব।
দুই. বছর গণনার ক্যালেন্ডার দিয়েই শুরু করি। যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন কেন্দ্র করে বছর গণনার পদ্ধতিকে একটি বিশেষ ধর্মের ধর্মীয় পদ্ধতি বলে সাধারণত গণ্য করা হয় না। বছরের উল্লেখ করতে গিয়ে খ্রিষ্টাব্দ বলি বা লিখি বটে, কিন্তু একে সেকুলার বর্ষগণনাপদ্ধতি হিসেবেই আমরা গণ্য করি। এই অতি সাধারণ উদাহরণ থেকেই আমরা বুঝি যাকে আমরা নির্বিচারে ‘সেকুলার’ অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ গণ্য করি তা মোটেও ধর্মনিরপেক্ষ নয়। এই দিকটা বোঝার জন্য আমাদের অবশ্যই ইতিহাস সচেতন হতে হবে। খ্রিষ্টীয় কিম্বা ভিন্ন কোন ধর্মের ঐতিহ্য হলেই আমরা তা অস্বীকার করব, তা নয়। কিন্তু যা একটি বিশেষ ধর্ম, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অন্তর্গত তাকে সার্বজনীন বা ‘সেকুলার’ দাবি করে ধর্মনিরপেক্ষ বানাবার চেষ্টা আমরা প্রতিহত করব। যা বিশেষ তাকে বিশেষ গণ্য করেই বিচার করতে হবে। নিজেদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও বিবেচনার জায়গা থেকে গ্রহণ বা বর্জনে কোন দোষ নাই। কিন্তু যা বিশেষ (ঢ়ধৎঃরপঁষধৎ) তাকে সামান্য (ঁহরাবৎংধষ) বা সার্বজনীন দাবি করা শুধু জ্ঞানগত ভুল নয়, সেই দাবি আমাদের পরাধীন করে। যারা এই দাবি করে তারা অন্য জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর আধিপত্য কায়েম করতে চায়। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই তখন কর্তব্য হয়ে ওঠে। এর বিস্তর নজির আমরা আমাদের আশপাশ থেকেই দিতে পারব।
দুই. বছর গণনার ক্যালেন্ডার দিয়েই শুরু করি। যিশুখ্রিষ্টের জন্মদিন কেন্দ্র করে বছর গণনার পদ্ধতিকে একটি বিশেষ ধর্মের ধর্মীয় পদ্ধতি বলে সাধারণত গণ্য করা হয় না। বছরের উল্লেখ করতে গিয়ে খ্রিষ্টাব্দ বলি বা লিখি বটে, কিন্তু একে সেকুলার বর্ষগণনাপদ্ধতি হিসেবেই আমরা গণ্য করি। এই অতি সাধারণ উদাহরণ থেকেই আমরা বুঝি যাকে আমরা নির্বিচারে ‘সেকুলার’ অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ গণ্য করি তা মোটেও ধর্মনিরপেক্ষ নয়। এই দিকটা বোঝার জন্য আমাদের অবশ্যই ইতিহাস সচেতন হতে হবে। খ্রিষ্টীয় কিম্বা ভিন্ন কোন ধর্মের ঐতিহ্য হলেই আমরা তা অস্বীকার করব, তা নয়। কিন্তু যা একটি বিশেষ ধর্ম, সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অন্তর্গত তাকে সার্বজনীন বা ‘সেকুলার’ দাবি করে ধর্মনিরপেক্ষ বানাবার চেষ্টা আমরা প্রতিহত করব। যা বিশেষ তাকে বিশেষ গণ্য করেই বিচার করতে হবে। নিজেদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও বিবেচনার জায়গা থেকে গ্রহণ বা বর্জনে কোন দোষ নাই। কিন্তু যা বিশেষ (ঢ়ধৎঃরপঁষধৎ) তাকে সামান্য (ঁহরাবৎংধষ) বা সার্বজনীন দাবি করা শুধু জ্ঞানগত ভুল নয়, সেই দাবি আমাদের পরাধীন করে। যারা এই দাবি করে তারা অন্য জনগোষ্ঠীর ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর আধিপত্য কায়েম করতে চায়। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই তখন কর্তব্য হয়ে ওঠে। এর বিস্তর নজির আমরা আমাদের আশপাশ থেকেই দিতে পারব।
চ্যালেঞ্জটা
এখানেই। কোন বিশেষ ধর্মের কিম্বা বিশেষ কোন দেশ, জাতি বা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য
নানান ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। গ্রহণযোগ্যতা কিম্বা
জনপ্রিয়তা সার্বজনীনতার মানদ নয়। যেমন মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো হিন্দুধর্মের
ধর্মীয় ঐতিহ্য। কারো ভাল লাগলে তারা ঘরে কিম্বা বাইরের অনুষ্ঠানে প্রদীপের
আলো জ্বালাতেই পারেন। আমি নিজে আলো জ্বালাতে ভালবাসি। গ্রামের বিভিন্ন
অনুষ্ঠানে মাটির কুপি জ্বালানো হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গ্রামের মানুষের
সংস্কৃতি। কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ও তথাকথিত সংস্কৃতিবান শ্রেণি
যখন কোন অনুষ্ঠানে আলো জ্বালানোকে ‘মঙ্গলপ্রদীপ’ বলে অভিহিত করে, তখন সেটা
অবাঞ্ছিত তর্ক তৈরি করে। সেই তর্ক বিশেষ আর সামান্যের বা বিশেষ আর
সার্বজনীনতার তর্ক। সেটা হয়ে দাঁড়ায় সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির
নামে একটি বিশেষ ধর্মের ধর্মীয় চর্চাকে সার্বজনীন বাঙালির সংস্কৃতি বলে
দাবি করা। বলা বাহুল্য, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হবেই। এই দাবির
অনুমান হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে বাঙালির সার্বজনীন সংস্কৃতি
হিসেবেই সকলকে অন্য ধর্মাবলম্বী বাঙালিদেরকেও মেনে নিতে হবে। হিন্দু
বাঙালির সংস্কৃতি অবশ্যই বাঙালি সংস্কৃতি, কিন্তু সকলের সংস্কৃতি নয়।
চ্যালেঞ্জটা এখানেই। সারা বিশ্বের বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা শতে ৬৭
জন। মঙ্গলপ্রদীপের রাজনীতি এ কারণে অসাম্প্রদায়িক নয়, সাম্প্রদায়িক
আধিপত্য বিস্তারের উপায় মাত্র। বাংলাদেশে মঙ্গলপ্রদীপ নিয়ে তীব্র তর্ক আছে
বলে এই উদাহরণ দিলাম। বলা বাহুল্য, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধই গড়ে উঠবে। যারা
প্রতিবাদ করেন সেকুলাররা তাদের সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করেন। অথচ
ব্যাপারটা উল্টা। যারা বিশেষকে সার্বজনীন বলে চাপিয়ে দিতে চাইছে, তারাই
মূলত সাম্প্রদায়িক। সেটা তখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। পূজায়
মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানো সাম্প্রদায়িক নয়, বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃতি বলে সেটা
বাঙালিরও সংস্কৃতি। কিন্তু সেকুলার বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠানে আলো
জ্বালানোকে ‘মঙ্গলপ্রদীপ’ বলা আর তার বিরোধিতাকারীদের সাম্প্রদায়িক বলা চরম
সাম্প্রদায়িক চিন্তা। এই পার্থক্য বা ভেদ বিচারের ক্ষমতা অর্জন করাটা একটা
বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি। এর উল্টা দিকও আছে। যেমনÑ একমাত্র আরবদের
সংস্কৃতিকে ইসলামি বা মুসলমানদের সংস্কৃতি বলে দাবি করা। যেন মুসলমান হতে
হলে আমাদের ট্রাইবাল আরব, সামন্ততান্ত্রিক পাকিস্তান, কিম্বা উত্তর ভারতের
সংস্কৃতি অনুকরণ করতে হবে। আমরা আরব, পাকিস্তানি কিম্বা উত্তর ভারতের
পোশাককেই অনেক সময় ইসলামি পোশাক বলে গণ্য করি। আমরা আর্য নই, ফলে আর্য ইরান
ও মধ্য এশিয়ার অনেক জাতির সঙ্গে আমাদের ফারাক আছে। তারা মুসলমান হতে
পারেন, কিন্তু ইরানের সংস্কৃতি আর বাঙালির সংস্কৃতি এক নয়। আরবে ইসলামের
নবী-পয়গম্বররা এসেছেন, ফলে আরব সংস্কৃতির প্রতি বাঙালি মুসলমানের দুর্বলতা
থাকা অন্যায় কিছু নয়। তেমনি আর্য সভ্যতা ও উত্তর ভারতের প্রতি বাঙালি
হিন্দুর দুর্বলতাও অন্যায় নয়। কিন্তু এগুলো গুরুতর সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ।
বাংলাভাষীদের নিজের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। সেই ইতিহাস থেকে
বিচ্ছিন্ন হওয়াটা আত্মঘাতী। কিভাবে এই আত্মঘাতী পথ পরিহার করা যায় তা নিয়ে
ভাবতে হবে। এটা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ। বাঙালির পোশাকের ওপর
বাংলা সংস্কৃতির কোন ছাপ থাকবে না, তাকে আরব দেশীয় কিম্বা উত্তর ভারতের
কোর্তা কামিজ হতে হবেÑ এর কোন যুক্তি নাই। তেমনি শার্ট প্যান্ট স্যুট টাই
পরলেই আমরা আধুনিক হয়ে যাবো, সেটাও হাস্যকর চিন্তা। দেখা যাচ্ছে বিশেষ আর
সামান্যের ভেদ নিছকই দার্শনিক তর্ক নয়। এই তর্কে আশার আলো ওখানে যে এই
বিষয়গুলো ক্রমশ পরিচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে। ফলে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে
বাংলাদেশের জনগণ কিভাবে তাদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতির ও ইতিহাসের সঙ্গে
সম্পৃক্ত হবে এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধের মীমাংসা সম্পন্ন করে
শক্তিশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে ফিরে দাঁড়াবে তার চিহ্নগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক
স্পষ্ট। সংস্কৃতির উদাহরণ দিচ্ছি, সহজে কিছু কথা বোঝাবার জন্য। যদি কিছুটা
তা বুঝে থাকি তাহলে এই দিকটিও আমরা বুঝব যে ইসলামের ইতিহাস শুধু আরবদের
ইতিহাস নয়, বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসও বটে। আবির্ভাব ও বিকাশের নিজস্ব
ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস জানা ও বোঝাই এ কালে আমাদের বড় একটি কাজ। ঠিক তেমনি
আর্য ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস নয়,
আর্য অনার্যের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসকে
আর্যের বিজয় আর অনার্যের পরাজয় হিসেবে পাঠ করার অভ্যাস থেকেও মুক্ত হওয়ার
দরকার আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকে প্রায়ই হতাশা ব্যক্ত
করেন। দুর্নীতি, নাগরিক ও মানবিক অধিকারের বিপর্যয়, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা
ইত্যাদি নিয়ে সারা বছরই আমরা লেখালিখি করেছি। বলা বাহুল্য, আইনবহির্ভূত
হত্যাকা , গুম-খুন, হেফাজতে মৃত্যু সর্বোপরি সন্ত্রাস দমনের নামে
রাষ্ট্রের দানবীয় সন্ত্রাসী রূপ আমাদের ভয়ঙ্কর হতাশ করে। নতুন বছরে সেই
দিকগুলো নিয়ে হা-হুতাশের ইচ্ছা আমার নাই। আমরা নিজেদের কিভাবে দেখি এবং
আগামি দিনে কী হতে চাই সেই বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি
জরুরি। যেটা আশার কথা সেটা হোল বাংলাভাষী বা বাঙালি হিসেবে নিজের ইতিহাস
বুঝতে গিয়ে আমরা একবার আরব ইতিহাস আর অন্য দিকে বর্ণহিন্দুর ইতিহাসের মধ্যে
নিজেদের আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছি। বাংলা, বাংলা ভাষা এবং রাজনৈতিক
জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদের আবির্ভাবের তাৎপর্য বোঝার পথ ও পদ্ধতি নির্ণয়ের
সাধনা আমরা করি নি। মনে হয়, এই পর্ব দ্রুত শেষ হতে চলেছে। এর প্রধান কারণ
হচ্ছে, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের প্রবল ও প্রকট উত্থানের কারণে আমাদের বোঝানো
হয়েছিলÑ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির অগ্রাধিকার কায়েমের
যুদ্ধ, ধর্ম যেখানে প্রাইভেট কিম্বা সমাজ ও ইতিহাসের গৌণ বিষয়। এর
প্রতিক্রিয়া হিসেবে উগ্র জাতিবাদীরা বিভিন্ন ভাবে দাবি করেছে একাত্তরে
ইসলাম পরাজিত হয়েছে। জয় হয়েছে বাঙালির। অতএব আগামি দিনে বাংলাদেশে ইসলাম
নির্মূলই বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ। একমাত্র রাজনীতি। এই রাজনীতির
কদর্য রূপ গত দুই দশকের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের জনগণের কাছে স্পষ্ট। উগ্র
জাতিবাদের শেষ ছোবল আমরা দেখেছি ২০১৩ সালে। উগ্র জাতিবাদের শেষ ছোবল কাজ
করে নি। আজ ২০১৬ সালের শেষ দিনে আমি নিশ্চিতÑ আমরা বিশাল একটি সাংস্কৃতিক
উল্লম্ফন দিয়েছি। যার অর্থ হচ্ছেÑ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাসের সঙ্গে
আমাদের নতুন ভাবে সম্পর্ক নির্মাণের পথ ও পদ্ধতি আগের চেয়ে অনেক বেশি
স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন। আমরা পিছিয়ে যাই নি, এগিয়ে গিয়েছি। এর রাজনৈতিক
অভিপ্রকাশ আমরা আগামিতে অবশ্যই দেখব। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও
ইতিহাস পরস্পর-বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তাদের বিবর্তন ও বিকাশ, রূপান্তর ও
পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করবার ক্ষমতা রাখি।
এই শক্তিটুকু আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। নতুন বছরে এই আশাই ব্যক্ত করছি।
নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও বিরোধের মীমাংসা সম্পন্ন করে শক্তিশালী জনগোষ্ঠী
হিসেবে ফিরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। তার চিহ্নগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট।
৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, শ্যামলী, ঢাকা
৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, শ্যামলী, ঢাকা

No comments:
Post a Comment