নারায়ণগঞ্জের
চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলায় নূর হোসেন ও সাবেক তিন র্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬
আসামির ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। এ মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে বাকি ৯ জনকে
দেয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড। সোমবার সকালে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায়
ঘোষণা করেন জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। বিচারক বহু প্রতীক্ষিত এ
মামলার রায় ঘোষণা করতে সময় নেন মাত্র কয়েক মিনিট। আসামিদের সাজার অংশটিই
কেবল তিনি পড়ে শোনান। এ সময় মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে গ্রেফতার ২৩ জন আদালতে
উপস্থিত ছিল। এদের মধ্যে ১৭ জনই র্যাবের সদস্য। ১২ আসামি এখনও পলাতক।
সোমবার সকাল ১০টা ১ মিনিটে এজলাসে ওঠেন জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন।
তিনি আসন গ্রহণের পরপরই আসামিদের নাম ধরে ডেকে হাজিরা নিশ্চিত করেন বেঞ্চ
সহকারী। হাজিরা নেয়া শেষে বিচারক রায় পড়া শুরু করেন।
এ সময় জনাকীর্ণ এজলাসে
ছিল পিনপতন নীরবতা। ১০টা ৫ মিনিট থেকে ১০টা ১১ মিনিট পর্যন্ত তিনি রায়
পড়েন। বিচারক বলেন, নৃশংস বর্বর এই ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত
অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের উত্থাপিত
অভিযোগের ভিত্তিতে আসামি (২৬ জনের নামসহ) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া
হল।’ এরপর বিচারক অপর ৯ আসামির নামসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার রায় ঘোষণা করেন।
এ সময় ১৮ আসামি লোহার খাঁচা পরিবেষ্টিত কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিল। অপর ৫ আসামি
ছিল কাঠগড়ার পাশে। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরল ইসলাম ও
আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ গুমের
ঘটনায় দায়েরকৃত আলাদা দুটি মামলায় আসামিদের এই সাজা দেয়া হয়েছে। তিন বছর
আগে নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ
সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে খুন করা হয়। তাদের লাশ শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে
দেয়ার ঘটনায় সারা দেশ নড়ে ওঠে। ওই হত্যাকাণ্ডে র্যাবের জড়িত থাকার ঘটনা
ফাঁস হলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও শিরোনাম হয়।
মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ২৬ আসামি : নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র্যাব-১১ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) মো. আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মাসুদ রানা, র্যাব-১১ এর সদস্য হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দ বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, নূর হোসেনের সহযোগী মিজানুর রহমান দীপু ওরফে মিজান, রহম আলী, আলী মোহাম্মদ, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান ওরফে চার্চিল, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সেলিম, সানাউল্লাহ সানা ও শাহজাহান পলাতক। এই তিনজনই নূর হোসেনের বডিগার্ড। অভিযোগ আছে, তারাই নূর হোসেনের টাকা তুলতেন ও বিভিন্ন দফতরে পৌঁছে দিতেন।
বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড : র্যাব-১১ এর সাবেক ৯ সদস্য হলেন- এএসআই আবুল কালাম আজাদ (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছর), এএসআই কামাল হোসেন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কর্পোরাল রুহুল আমিন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), হাবিলদার নাসির উদ্দিন (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছর), কনস্টেবল বাবুল হাসান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর, সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছরসহ মোট ১৭ বছর) ও সৈনিক নুরুজ্জামান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর)। এদের মধ্যে হাবীবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ১৭ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন রায়টা যাতে কার্যকর হয় সে আশা করছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তার আন্তরিকতায় আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। হাইকোর্টে যাতে এই রায়টাই বহাল থাকে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নূর হোসেন মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নারী ব্যবসাসহ অপকর্ম করত। আমার স্বামী (নজরুল) এসবের প্রতিবাদ করত। নূর হোসেন জামায়াত-বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল করে। কিন্তু আমার স্বামী ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগ করত।’ নজরুল ইসলামের শ্বশুর ও সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম এজলাসে বসেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে বলেন, ‘রায়ে আমি আংশিক খুশি হয়েছি। নূর হোসেনের যারা গডফাদার তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এজাহারে হাজী ইয়াসিন, আমিনুল হক রাজুসহ সাতজনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কয়েকজন রাজনৈতিক গডফাদারের নাম বাদ পড়েছে। তাদের নাম এলে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতাম।’ আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা চাই এই রায় যাতে বাস্তবায়ন হয়। যারা আমার বাপিকে (বাবা) হত্যা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি উচ্চ আদালতে বহাল থাকুক এটাই আমার চাওয়া।’ রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এসএম ওয়াজেদ আলী খোকন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। তিনি বলেন, ‘আদালত যে রায় ঘোষণা করেছেন তাতে রাষ্ট্রপক্ষ, দেশবাসীসহ নারায়ণগঞ্জের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। অভিন্ন দুটি মামলায় রায় হয়েছে। দুই মামলাতেই ৩৫ জন করে আসামি । ২৩ জন আসামি গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে আছেন। ১২ জন আসামি পলাতক আছেন। হাজির ২৩ আসামির মধ্যে ২১ আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা কিভাবে অপহরণ হয়েছে, কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিভাবে লাশ গুম হয়েছে তার বিবরণ দিয়েছেন। দু’জন বাদীসহ ১০৭ জন সাক্ষী ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেছেন। সেসব জেরার জবাব দিয়েছেন। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আমরা ৩৪২ ধারায় সাক্ষ্য পরীক্ষা করেছি। আসামিদের বিরুদ্ধে কি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে প্রত্যেক আসামিকে আলাদাভাবে তা পড়ে শুনিয়েছি।’ আদালত কোনো পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে পিপি বলেন, ‘আদালত অবশ্যই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তবে সেটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ থাকবে। আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পরে পাওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, মামলাটি ৫৩ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে। আসামিদের মধ্যে একজনকে ১৭ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।’ বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। আমরা চাই এই রায় যাতে কার্যকর হয়।’ আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একজন অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’ নূর হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।’ এদিকে রায় ঘোষণা শেষে আদালত চত্বরে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের সহকর্মীরা মিছিল করে আনন্দ প্রকাশ করেন। তারা স্লোগানে স্লোগানে রায়ের বাস্তবায়ন চান। আইনজীবীদের মিছিলটি আদালত প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে।
রায় শুনে কান্না : রায় পড়ার সময় লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, লে. কমান্ডার রানা ছিলেন কাঠগড়ার পাশে। কাঠগড়ায় গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন নূর হোসেনসহ অপর আসামিরা। এ সময় নূর হোসেনকে বারবার পানি পান করতে দেখা গেছে। রায় শুনে তারেক সাঈদ কেঁদে ফেলেন। একই সময় নূর হোসেনকেও কাঁদতে দেখা যায়। তিনি চোখের পানি মুছে তারেক সাঈদকে সান্ত্বনা দেন। অন্য দু’একজন আসামি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে নূর হোসেন তাদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন।
আদালতে উপস্থিত আসামিদের স্বজন : রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন তারেক সাঈদের বাবা মুজিবুর রহমান ও এমএম রানার শাশুড়ি। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এ মামলা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা আইনি বিষয় আইনগতভাবে মোকাবেলা করব।’ রানার শাশুড়ি সুলতানা রহমান শিল্পী বলেন, ‘আমি কোনো কিছু বলতে চাই না।’ অবশ্য তার সঙ্গে আসা এক আইনজীবী রিতা ইসলাম বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, রানা খালাস পাবে। কিন্তু তা হয়নি। এখন আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’ তারেক সাঈদের স্ত্রী বা শ্বশুরবাড়ির কাউকে আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি। তারেক সাঈদ মোহাম্মদের শ্বশুর বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম।
আদালত চত্বরে নিরাপত্তা : রায় ঘোষণা কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে আগে থেকেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আদালতের প্রবেশমুখে বসানো হয় আর্চওয়ে। আসামিদের আনার পথে নেয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। আদালত অঙ্গনে মোতায়েন করা হয় ১০ প্লাটুন পুলিশ। সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে পুলিশের দুটি প্রিজনভ্যানে ১৮ আসামিকে আদালতে আনা হয়। তাদের লোহার খাঁচাবেষ্টিত কাঠগড়ায় রাখা হয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কাশিমপুর কারাগার থেকে আনা হয় নূর হোসেন, তারেক সাঈদ, রানা ও আরিফসহ ৫ আসামিকে। এদের মধ্যে নূর হোসেনকে লোহার খাঁচায় ও অপর চার আসামিকে খাঁচার সামনে রাখা হয়। আদালতে নেয়ার সময় প্রিজনভ্যানের ভেতরে নূর হোসেনেক বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আদালতের সামনে উপস্থিত লোকজনের দিকে তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। দুয়েকজন পরিচিতজনকে হাত তুলে সালামও দেন। আদালতে তোলার সময় নূর হোসেন নেভিব্ল– প্যান্ট, ক্রিম কালার শার্ট ও সোয়েটার পরে ছিলেন। কাঠগড়ায় নেয়ার আগে নূর হোসেনসহ সব আসামির জুতা খুলে নেয়া হয়। তারেক সাঈদের পরনেও ছিল শার্ট, তার ওপরে মেরুন রঙের সোয়েটার। রানার পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট, শার্ট ও জ্যাকেট। আসামিদের কয়েকজনকে ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় আদালতে তোলা হয়। রায় শেষে ১০টা ২৪ মিনিটে একে একে আসামিদের বের করে দেয়া হয়। দু’জন করে আসামি নিয়ে সরাসরি প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়নি। তবে সবার হাতেই হাতকড়া পরানো ছিল। সবশেষে বের করা হয় নূর হোসেনকে। বের করার আগে তাকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দেয়া হয়। আসামিদের এজলাস থেকে বের করে সরাসরি প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। এ সময় আইনজীবী, নিহতের পরিবার ও সাধারণ জনতা উল্লাস প্রকাশ করেন।
মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ২৬ আসামি : নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, র্যাব-১১ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) মো. আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) মাসুদ রানা, র্যাব-১১ এর সদস্য হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দ বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, সৈনিক আল আমিন, সৈনিক তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, নূর হোসেনের সহযোগী মিজানুর রহমান দীপু ওরফে মিজান, রহম আলী, আলী মোহাম্মদ, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান ওরফে চার্চিল, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, ম্যানেজার শাহজাহান ও ম্যানেজার জামাল উদ্দিন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে সেলিম, সানাউল্লাহ সানা ও শাহজাহান পলাতক। এই তিনজনই নূর হোসেনের বডিগার্ড। অভিযোগ আছে, তারাই নূর হোসেনের টাকা তুলতেন ও বিভিন্ন দফতরে পৌঁছে দিতেন।
বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড : র্যাব-১১ এর সাবেক ৯ সদস্য হলেন- এএসআই আবুল কালাম আজাদ (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছর), এএসআই কামাল হোসেন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কর্পোরাল রুহুল আমিন (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), হাবিলদার নাসির উদ্দিন (সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছর), কনস্টেবল বাবুল হাসান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর), কনস্টেবল হাবিবুর রহমান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর, সাক্ষ্য-প্রমাণ সরানোর দায়ে ৭ বছরসহ মোট ১৭ বছর) ও সৈনিক নুরুজ্জামান (অপহরণের দায়ে ১০ বছর)। এদের মধ্যে হাবীবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ১৭ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।
প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে বলেন, ‘রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এখন রায়টা যাতে কার্যকর হয় সে আশা করছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তার আন্তরিকতায় আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। হাইকোর্টে যাতে এই রায়টাই বহাল থাকে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ তিনি আরও বলেন, ‘নূর হোসেন মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, নারী ব্যবসাসহ অপকর্ম করত। আমার স্বামী (নজরুল) এসবের প্রতিবাদ করত। নূর হোসেন জামায়াত-বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল করে। কিন্তু আমার স্বামী ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগ করত।’ নজরুল ইসলামের শ্বশুর ও সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম এজলাসে বসেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় যুগান্তরকে বলেন, ‘রায়ে আমি আংশিক খুশি হয়েছি। নূর হোসেনের যারা গডফাদার তাদের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। এজাহারে হাজী ইয়াসিন, আমিনুল হক রাজুসহ সাতজনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। কয়েকজন রাজনৈতিক গডফাদারের নাম বাদ পড়েছে। তাদের নাম এলে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতাম।’ আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ে ডা. সুস্মিতা সরকার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা রায়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। আমরা চাই এই রায় যাতে বাস্তবায়ন হয়। যারা আমার বাপিকে (বাবা) হত্যা করেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি উচ্চ আদালতে বহাল থাকুক এটাই আমার চাওয়া।’ রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এসএম ওয়াজেদ আলী খোকন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। তিনি বলেন, ‘আদালত যে রায় ঘোষণা করেছেন তাতে রাষ্ট্রপক্ষ, দেশবাসীসহ নারায়ণগঞ্জের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। অভিন্ন দুটি মামলায় রায় হয়েছে। দুই মামলাতেই ৩৫ জন করে আসামি । ২৩ জন আসামি গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে আছেন। ১২ জন আসামি পলাতক আছেন। হাজির ২৩ আসামির মধ্যে ২১ আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা কিভাবে অপহরণ হয়েছে, কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, কিভাবে লাশ গুম হয়েছে তার বিবরণ দিয়েছেন। দু’জন বাদীসহ ১০৭ জন সাক্ষী ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা করেছেন। সেসব জেরার জবাব দিয়েছেন। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আমরা ৩৪২ ধারায় সাক্ষ্য পরীক্ষা করেছি। আসামিদের বিরুদ্ধে কি অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে প্রত্যেক আসামিকে আলাদাভাবে তা পড়ে শুনিয়েছি।’ আদালত কোনো পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে পিপি বলেন, ‘আদালত অবশ্যই পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তবে সেটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ থাকবে। আদালত সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় পরে পাওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, মামলাটি ৫৩ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে। আসামিদের মধ্যে একজনকে ১৭ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।’ বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। আমরা চাই এই রায় যাতে কার্যকর হয়।’ আসামিপক্ষের আইনজীবীদের একজন অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।’ নূর হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।’ এদিকে রায় ঘোষণা শেষে আদালত চত্বরে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারের সহকর্মীরা মিছিল করে আনন্দ প্রকাশ করেন। তারা স্লোগানে স্লোগানে রায়ের বাস্তবায়ন চান। আইনজীবীদের মিছিলটি আদালত প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করে।
রায় শুনে কান্না : রায় পড়ার সময় লে. কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ, লে. কমান্ডার রানা ছিলেন কাঠগড়ার পাশে। কাঠগড়ায় গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন নূর হোসেনসহ অপর আসামিরা। এ সময় নূর হোসেনকে বারবার পানি পান করতে দেখা গেছে। রায় শুনে তারেক সাঈদ কেঁদে ফেলেন। একই সময় নূর হোসেনকেও কাঁদতে দেখা যায়। তিনি চোখের পানি মুছে তারেক সাঈদকে সান্ত্বনা দেন। অন্য দু’একজন আসামি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলে নূর হোসেন তাদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন।
আদালতে উপস্থিত আসামিদের স্বজন : রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন তারেক সাঈদের বাবা মুজিবুর রহমান ও এমএম রানার শাশুড়ি। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এ মামলা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমরা আইনি বিষয় আইনগতভাবে মোকাবেলা করব।’ রানার শাশুড়ি সুলতানা রহমান শিল্পী বলেন, ‘আমি কোনো কিছু বলতে চাই না।’ অবশ্য তার সঙ্গে আসা এক আইনজীবী রিতা ইসলাম বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, রানা খালাস পাবে। কিন্তু তা হয়নি। এখন আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’ তারেক সাঈদের স্ত্রী বা শ্বশুরবাড়ির কাউকে আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি। তারেক সাঈদ মোহাম্মদের শ্বশুর বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম।
আদালত চত্বরে নিরাপত্তা : রায় ঘোষণা কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে আগে থেকেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আদালতের প্রবেশমুখে বসানো হয় আর্চওয়ে। আসামিদের আনার পথে নেয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা। আদালত অঙ্গনে মোতায়েন করা হয় ১০ প্লাটুন পুলিশ। সকাল ৯টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে পুলিশের দুটি প্রিজনভ্যানে ১৮ আসামিকে আদালতে আনা হয়। তাদের লোহার খাঁচাবেষ্টিত কাঠগড়ায় রাখা হয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কাশিমপুর কারাগার থেকে আনা হয় নূর হোসেন, তারেক সাঈদ, রানা ও আরিফসহ ৫ আসামিকে। এদের মধ্যে নূর হোসেনকে লোহার খাঁচায় ও অপর চার আসামিকে খাঁচার সামনে রাখা হয়। আদালতে নেয়ার সময় প্রিজনভ্যানের ভেতরে নূর হোসেনেক বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আদালতের সামনে উপস্থিত লোকজনের দিকে তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। দুয়েকজন পরিচিতজনকে হাত তুলে সালামও দেন। আদালতে তোলার সময় নূর হোসেন নেভিব্ল– প্যান্ট, ক্রিম কালার শার্ট ও সোয়েটার পরে ছিলেন। কাঠগড়ায় নেয়ার আগে নূর হোসেনসহ সব আসামির জুতা খুলে নেয়া হয়। তারেক সাঈদের পরনেও ছিল শার্ট, তার ওপরে মেরুন রঙের সোয়েটার। রানার পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট, শার্ট ও জ্যাকেট। আসামিদের কয়েকজনকে ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় আদালতে তোলা হয়। রায় শেষে ১০টা ২৪ মিনিটে একে একে আসামিদের বের করে দেয়া হয়। দু’জন করে আসামি নিয়ে সরাসরি প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। সাবেক সেনা কর্মকর্তা আসামিদের ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়নি। তবে সবার হাতেই হাতকড়া পরানো ছিল। সবশেষে বের করা হয় নূর হোসেনকে। বের করার আগে তাকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে দেয়া হয়। আসামিদের এজলাস থেকে বের করে সরাসরি প্রিজনভ্যানে তোলা হয়। এ সময় আইনজীবী, নিহতের পরিবার ও সাধারণ জনতা উল্লাস প্রকাশ করেন।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭
এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম,
অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল
ইসলাম, জাহাঙ্গীর ও ইব্রাহিম- এ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। ওই রাতেই তাদের
হত্যা করে লাশের সঙ্গে ইটের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এর পর দিন ২৮
এপ্রিল নিখোঁজ নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি
প্রথম মামলা করেন। ৩০ এপ্রিল বিকালে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে প্রথমে ৬ জনের লাশ
উদ্ধার করা হয়। ১ মে সকালে আরও একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ৮ মে নিহত
আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দ্বিতীয় মামলা করেন। এ ঘটনার
সঙ্গে সম্পৃক্ততার দায়ে ১৭ এবং ১৮ মে তিন র্যাব কর্মকর্তা লে. কর্নেল
তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং লে. কমান্ডার এমএম রানাকে
গ্রেফতার করা হয়। ৫ জুন এমএম রানা, ৬ জুন আরিফ হোসেন এবং ১৮ জুন তারেক সাঈদ
মোহাম্মদ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন। ২০১৫ সালের ৮
এপ্রিল পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চার্জ
গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু হয়। এতে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়।
এদের মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ২৩ জন। বাকি ১২ জন পলাতক। গ্রেফতারকৃত আসামিদের
মধ্যে ২১ জন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
দিয়েছেন। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ১২৭ জনকে। ১০৬ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। ৫৩
কার্যদিবস শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সোমবার মামলার রায় ঘোষণা
করা হয়।

No comments:
Post a Comment