‘টানা
সাত বছর ওএসডি ছিলাম। গত জুনে পিআরএলে (অবসরোত্তর ছুটি) যাই। এ সময়ের
মধ্যে আমি ছয় দফা পদোন্নতিবঞ্চিত হই। উপসচিব হিসেবেই আমাকে চাকরি থেকে
বিদায় নিতে হয়েছে। প্রতিবারই আমার চোখের সামনে দিয়ে ব্যাচমেটরা সচিব,
অতিরিক্ত সচিব অথবা যুগ্ম সচিব হয়েই অবসরে গেছেন। আমার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের
অভিযোগও নেই কর্তৃপক্ষের। বরং পদোন্নতি বিধিমালার ১০০ নম্বরের মধ্যে আমার
ছিল ৯২। অথচ পাস নম্বর ৮৫। তারপরও আমি কেন বঞ্চনার শিকার হলাম? কারও কোনো
জবাব নেই। তবে আমার ধারণা, দলীয় বিচারে পাস করতে পারিনি। সেখানে নম্বর
শূন্য।’ কথাগুলো বলছিলেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮২ (বিশেষ) ব্যাচের
একজন মেধাবী কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার যুগান্তরের কাছে চাপা ক্ষোভ ও হতাশার
কথা বলার সময় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। এ সময়ে তার দুই চোখে নেমে আসে অশ্রুধারা।
তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে ওই কর্মকর্তা আবার বলতে শুরু করলেন,
‘পদোন্নতিবঞ্চিত করার পাশাপাশি ওএসডি করে আমাকে বছরের পর বছর কর্মহীন করে
রাখা হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাষ্ট্র। কারণ অহেতুক আমাকে কাজ না
করিয়ে বসিয়ে বসিয়ে প্রতি মাসে বেতন-ভাতা দেয়া হয়েছে। আমার পেছনে সরকারের যত
টাকা ব্যয় হয়েছে, তার পুরোটাই জলে গেছে বলে আমি মনে করি। আর আমার ন্যায্য
অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। হেয় করা হয়েছে সামাজিকভাবে।
দেয়া হয়েছে
মানসিক যন্ত্রণা।’ শুধু এ কর্মকর্তাই নন, গত তিন বছরে বিভিন্ন স্তরে
কমপক্ষে ২৫০ কর্মকর্তা বছরের পর বছর ওএসডি থেকে দফায় দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত
হয়েছেন। আর এ সময়ে গড়ে প্রতি বছর অন্তত ৩৫০ কর্মকর্তাকে ওএসডি করে রাখা হয়।
তাদের অনেকে এরই মধ্যে পিআরএলে চলে গেছেন। ওই কর্মকর্তার মতো প্রায় অভিন্ন
সুরে ক্ষোভ ও হতাশার কথা যুগান্তরের কাছে জানালেন বিসিএস (প্রশাসন)
ক্যাডারের ১৯৮১, ১৯৮২, ১৯৮২ (বিশেষ), ১৯৮৪, ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ ব্যাচের একাধিক
কর্মকর্তা। তাদের অনেকেই প্রায় অভিন্ন সুরে আরও অভিযোগ করলেন, ‘আমাদের
ওএসডি করে কাজ না করিয়ে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা পানিতে ফেলা হচ্ছে। আর
অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে অহেতুক
সরকারের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।’ উল্লেখ্য, এ মুহূর্তে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে
ওএসডি আছেন ৪৪৬ জন এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে কাজ করছেন ১৫৬ জন কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব কর্মকর্তার অধিকাংশই বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয়
জোট ও ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তাদের সবাইকে
‘ক্ষমতাসীন দলবিরোধী তকমা’ লাগিয়ে পদোন্নতি ও নিয়োগের পরিবর্তে ওএসডি করে
রাখা হয়েছে। তবে তাদের কেউ কেউ সরকারের সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে
কনিষ্ঠদের অধীনে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। সরেজমিন দেখা
গেছে, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, খাদ্য ও সমাজকল্যাণ
মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ অধিদফতর ও দফতরগুলোয় একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা
কনিষ্ঠদের অধীনে কাজ করছেন। এক্ষেত্রে প্রায় সময়েই তাদের বিব্রতকর
পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। একটি অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি), যিনি
বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা, তার ক্ষোভের কথা
জানিয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার দফতর যে বিভাগের অধীনে, সেখানকার সচিব হলেন
১৯৮৪ ব্যাচের। চাকরি জীবনের পুরো সময়টাতেই ওকে আমি তুমি করেই ডেকেছি। আর ও
আমাকে স্বাভাবিক কারণেই সিনিয়র হওয়ায় স্যার সম্বোধন করেছে। কিন্তু এখন আমরা
দুইজনই বিব্রতকর অবস্থায় আছি। কেউ কাউকে স্যার বলি না। এমনকি কোনো কোনো
সময় ওই সচিবের সঙ্গে বৈঠক থাকলে আমি কৌশলে অনুপস্থিত থাকি।
সেখানে আমার
প্রতিনিধি হিসেবে অন্য কোনো কর্মকর্তাকে পাঠাই।’ ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি
আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। এরপর গত তিন বছরে
প্রশাসনের চার স্তরে (সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব) মোট ১
হাজার ৮০০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়। এতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা
সত্ত্বেও বঞ্চিত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার কর্মকর্তা। বিভিন্ন স্তরের
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মঞ্জুরীকৃত পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয়
যোগ্যতাসম্পন্ন জ্যেষ্ঠদের ডিঙ্গিয়ে ‘সরকারদলীয় পছন্দের’ কনিষ্ঠ
কর্মকর্তাদের দেয়া হয়েছে পদোন্নতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে
পদোন্নতিপ্রাপ্তদের আগের পদেই (নিচের স্তর) পদায়ন (ইনসিটু) অথবা নিজ নিজ
মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তি ও অন্যত্র প্রেষণ অথবা ওএসডি করে রাখা হয়েছে। কারণ
তাদের পদায়ন করার জন্য নির্ধারিত পদ নেই। এ মুহূর্তে ইনসিটু ও মন্ত্রণালয়ে
সংযুক্তি আছেন প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা এবং প্রেষণে আছেন ১ হাজার ৪৬ জন। প্রেষণ
ও চুক্তিতে নিয়োগ দেয়ায় বিভিন্ন দফতর ও অধিদফতরে নিজস্ব কর্মকর্তাদের
মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। কোনো কোনো দফতরে এ ক্ষোভ প্রকাশ্য
রূপ নিয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের চার স্তরে মঞ্জুরীকৃত ১ হাজার ৬১৬ পদের
বিপরীতে আছেন ২ হাজার ৭৪১ কর্মকর্তা। অর্থাৎ পদ ছাড়াই কর্মরত ১ হাজার ১২৫
জন। অন্যদিকে নিচের দুই স্তরে (সিনিয়র সহকারী সচিব ও সহকারী সচিব) ৪ হাজার
১০৪টি পদের মধ্যে ১ হাজার ২৯২টি খালি রয়েছে। এতে ভেঙে পড়েছে প্রশাসন
যন্ত্রের মূল কাঠামো (পিরামিড স্ট্রাকচার)। ব্যাহত হচ্ছে সার্বিক
কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি, যা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর পড়েছে নীতিবাচক
প্রভাব। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারের তিন
বছর পার হলেও কাক্সিক্ষত গতি আসেনি জনপ্রশাসনে। বিগত বিভিন্ন সরকারের মতোই
একই নীতি অনুসরণ করে বর্তমান প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। বরং আগের তুলনায় কোনো
কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে দলীয়করণ ও নানা বঞ্চনার ঘটনা। বাস্তবায়ন হয়নি
প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী
অঙ্গীকার ‘রূপকল্প ২০২১’। আর এ কারণেই নিশ্চিত হয়নি যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও
মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি ও নিয়োগ। সরকারি কর্মচারী আইন প্রণয়নে নানা উদ্যোগ
নিয়েও আগের সরকারগুলোর মতোই তা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এ
আইনটি প্রণয়ন করা হলে পদোন্নতি বঞ্চনা, ওএসডি ও নিয়োগসহ প্রশাসনের অন্যান্য
কার্যক্রম কিছুটা হলেও শৃংখলায় থাকত বলে মন্তব্য বিভিন্ন স্তরের একাধিক
কর্মকর্তার। জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বুধবার
যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতি
নিশ্চিত করা হয়েছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাকে
পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়েছেন- এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, ‘এমন তর্ক
থাকবেই। যাচাই-বাছাই করে যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।’
সরকারবিরোধী কর্মকর্তার তকমা লাগিয়ে অনেক কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর ওএসডি
করে রাখা হয়েছে- এমন অভিযোগের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এসব বাজে কথা।
সরকারি চাকরিজীবীরা প্রফেসনাল। তাদের কোনো দল আছে বলে আমি মনে করি না। আর
দলীয়ভাবে বিবেচনার কোনো প্রশ্নই আসে না।’
বরং নীতিমালার বাইরে গিয়ে অনেক
ক্ষেত্রে পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। কারণ বিসিএস ১৯৮২ নিয়মিত, বিশেষ,
১৯৮৪ এবং ১৯৮৫ ব্যাচ অনেক বড়। সেখানে শত শত কর্মকর্তা পদোন্নতিযোগ্য হয়ে
বসে রয়েছেন। এ কারণে সামাজিক ও মানবিক বিবেচনায় পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়া
হচ্ছে। নিয়ম হচ্ছে, যেখানে পদ খালি হবে, সেখানে পদোন্নতি দেয়া হবে।
প্রশাসনবিষয়ক কলামিস্ট ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার এ
প্রসঙ্গে যুগান্তরকে জানান, তিনি আগে থেকেই পদ ছাড়া পদোন্নতির বিপক্ষে।
এখনও তার অবস্থান পরিবর্তন হয়নি। পদ ছাড়া পদোন্নতি হলে প্রশাসনের গতি কমে
যায়। বিশেষ করে দক্ষ, যোগ্য ও মেধাবীরা পদোন্নতিবঞ্চিত হলে প্রশাসনে ভয়াবহ
নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কাজের প্রতি কর্মকর্তাদের অনীহা দেখা দেয়। এসব সমস্যা
সমাধানে দ্রুত সরকারি কর্মচারী আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আইনটি
কার্যকর হলে প্রশাসনের শৃংখলা ফিরে আসবে। তবে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তার
মধ্যে উল্লিখিত চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করলেও অষ্টম পে-স্কেল কার্যকর
হওয়ায় খুশির জোয়ার বয়ে যায় চাকরিজীবীদের মধ্যে। কারণ নতুন স্কেলে বেতন-ভাতা
দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি প্রশাসনে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার
বৃদ্ধি পায় চোখে পড়ার মতো। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সচিবালয়সহ
দেশের প্রায় সব সরকারি দফতরে ই-ফাইলিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিটি
দফতরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে হালনাগাদ তথ্য। কর্মকর্তাদের
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
উদ্ভাবনী কাজের জন্য প্রথমবারের মতো দেয়া হয়েছে কর্মকর্তাদের ‘জনপ্রশাসন
পদক’। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া হয়রানি ও জনদুর্ভোগের বিষয়ে
ব্যবস্থা নিচ্ছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় প্রতিটি দফতরে চালু হয়েছে
হেল্প ডেস্ক। এবারই প্রথমবারের মতো জেলা প্রশাসক সম্মেলনে অন্তর্ভুক্ত করা
হয়েছে ‘ইনোভেশন সামিট’। এ কারণে গত বছর চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন
অনুষ্ঠিত হয়। আর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে বড় তিনটি
মন্ত্রণালয়কে পুনর্বিন্যাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে শিক্ষা
মন্ত্রণালয়কে দুই বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে স্বরাষ্ট্র এবং
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

No comments:
Post a Comment