Sunday, January 15, 2017

ভিক্ষুকমুক্ত নড়াইল জেলা

‘ভাই আমি অন্ধ মানুষ, হাত পাতলে এমনিতেই আমাকে দুই চার টাকা দিতেন, কিন্তু আমি তা চাচ্ছি না। বাদাম বিক্রি করে উপার্জন করছি। এভাবে যদি আপনারা বাদাম কিনে আমার আয়ের পথ সচল রাখেন, তাহলে আর ছোট কাজে (ভিক্ষা) যাওয়ার কোনো যুক্তি নাই। আপনারাই আমার চোখ।’ এভাবেই নড়াইলের রূপগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীবাহী বাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদাম বিক্রি করেন দৃষ্টিহীন লিটন শেখ (৪৫)। এখন আর ভিক্ষার জন্য হাত পাতেন না তিনি। অথচ এক বছর আগেও বাসযাত্রীদের কাছে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়িয়ে দিতেন। সেই হাতেই এখন বাদাম বিক্রি করেন লিটন। প্রতিদিন আয় করেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। লিটন প্রায় ২২ বছর ধরে ভিক্ষা করতেন।
লিটনের মতো ২০জন দৃষ্টিহীন, দু’জন বধির ও দু’জন বোঁবাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৯জন প্রতিবন্ধীব্যক্তির কেউ আর ভিক্ষা করেন না। সবমিলিয়ে ৭৯৮জন ভিক্ষুকের হাত এখন কর্মীর হাতে পরিণত হয়েছে। নড়াইলের তিনটি উপজেলা ও ৩৯টি ইউনিয়নে ৭৯৮জন ভিক্ষুককে চিহিৃত করে সব এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী আছেন ৫৫৫ এবং পুরুষ ২৪৩ জন। প্রায় ১০ মাসের চেষ্টায় নড়াইল ভিক্ষুকমুক্ত জেলায় পরিণত হয়েছে। এখন দেশের প্রথম ভিক্ষুকমুক্ত জেলা হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষায় আছে নড়াইল জেলা। চলতি মাসেই (জানুয়ারি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নড়াইলকে ভিক্ষুকমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা করবেন বলে আশা করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এদিকে, ভিক্ষুকদের কর্মমুখী ও পুনর্বাসন করতে এ পর্যন্ত (২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত) পাঁচটি গরু, পাঁচটি ওজন পরিমাপক যন্ত্র, ছয়টি সেলাই মেশিন, ৩০৭টি ছাগল, ৯১০টি হাঁস, ২৯০টি মুরগি, ১৩টি ভ্যান, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ২৫৩টি দোকান, দুই বান্ডিল টিন ও ছয় হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪৭ লাখ টাকার পুঁজি সমিতির মাধ্যমে ঋণ সৃষ্টি করে ভিক্ষুকদের মাঝে বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে, প্রাপ্যতার ভিত্তিতে ২৭৫ জনকে বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান এবং জিআর চালসহ ইজিপিপি ও ১০ টাকা কেজি দরের চালের সুবিধাও দেয়া হয়। এছাড়া আটজনকে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ৭৯৮জন পুনর্বাসিত ভিক্ষুককে দেখভালের জন্য একজন করে তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য সহকারী,
চৌকিদারসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের চাকুরিজীবীরা স্বেচ্ছাশ্রমে পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের তদারকি করেন। জেলার বিভিন্ন বাস্ট্যান্ড, ফেরিঘাট, হাট-বাজার, বাসা-বাড়ি, শহর-বন্দর, গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন লোকালয় ঘুরে দেখা গেছে, ভিক্ষার জন্য এখন কেউ অন্যের কাছে হাত পাতেন না। ভিক্ষুক হিসেবে কাউকে দেখাও যায় না। হঠাৎ করে বাইরের জেলা থেকে কোনো ভিক্ষুক নড়াইলে আসলে তাদের নিজ জেলায় ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রতিটি ভিক্ষুকের হাত এখন কর্মীর হাত। কেউ বাজারে বিক্রি করছেন সবজিসহ বিভিন্ন কাঁচামাল। অনেকে আবার গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করছেন। স্কুল-কলেজের আশেপাশেসহ বিভিন্ন লোকালয়ে ছোট মুদি দোকান দিয়েছেন কেউ কেউ। এদেরই একজন জামাল হোসেন (৬৩)। ১১ বছর যাবত ভিক্ষা করতেন তিনি। এখন নড়াইলের রূপগঞ্জ বাজারে তরকারি বিক্রি করেন। জামাল হোসেন জানান, আগে ভিক্ষা করে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা পেতেন। এখন কাঁচামাল বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০টাকা আয় করেন। তবুও খুশি তিনি। কারণ, ভিক্ষাবৃত্তির মতো লজ্জাজনক কাজ ছেড়ে দিয়ে এখন নিজে আয় করেন। তার স্ত্রী ববিতা মিষ্টির প্যাকেট তৈরি করেন। নড়াইল-যশোর সড়কের পাশে সীতারামপুরের খাস জমিতে একচালা ঘরে বসবাস তাদের। নাকসী গ্রামের উজেলা বেগম (৩৫) বলেন, আমার স্বামী হাটতে পারেন না। ১৭ বছর ধরে ভিক্ষা করতেন তিনি। এডিসি স্যার নাকসীতে বিদ্যালয়ের সামনে আমাদের একটি মুদি দোকান করে দিয়েছেন। আমি দোকান চালাই এবং আমার স্বামী নড়াইল শহরে ফার্ণিচার তৈরির ঘরে কাঠ ঘষাঘষির কাজ করেন। এখন আমরা ভিক্ষা করি না। আমার বড় ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী। আরো দুই সন্তানও লেখাপড়া করছে। নাকসী চিত্রা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ঠান্ডা বিবি (৭০) বলেন, নয় বছর ধরে হাঁপানি রোগে ভুগছি। মাসে অনেক টাকার ওষুধ লাগে। আগে ভিক্ষা করলেও তিনটি ছাগল পেয়ে তা পালন করছি। স্বামী মারা গেছেন ১৬ বছর। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। জুলেখা বেগম (৫৫) বলেন,
২৫ বছর ধরে ভিক্ষা করেছি। ভিক্ষুক পুনর্বাসনের টাকা পেয়ে ছেলেকে মাদরাসা বাজারে হোটেল (ভাত ও রুটি বিক্রি) করে দিয়েছি। নিহারোন বেগম বলেন, আর ভিক্ষা করতে চাই না। এটি লজ্জাজনক। রূপগঞ্জ বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মুনছুর মোড়ল বলেন, আগে যারা ভিক্ষা চাইতো, তাদের অনেকেই আমাদের পাশে বসে সবজিসহ বিভিন্ন তরকারি বিক্রি করছেন। বাসযাত্রী রওশন আরা বলেন, হাত পেতে নয়, বাদামসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে আয় করছেন অনেক দৃষ্টিহীন প্রতিবন্ধীব্যক্তিরা। এদের কাছ থেকে বাদাম কিনে ভালো লাগছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নড়াইল জেলা শাখার আহবায়ক খন্দকার শওকত বলেন, ইসলাম ধর্মেও ভিক্ষাবৃত্তিকে নিষেধ করা হয়েছে। নড়াইলের মতো আমাদের দেশটাকে ভিক্ষুকমুক্ত করা প্রয়োজন। নড়াইলকে ভিক্ষুকমুক্তকরণের স্বপ্নদ্রষ্টা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিক্ষুকমুক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সব এলাকা থেকে ভিক্ষুকদের তালিকা করে তাদের পুনর্বাসনের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। জেলার প্রবেশদ্বারসহ বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষুকমুক্ত সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। নড়াইলের সাফল্যের পর বিভাগীয় কমিশনার মহাদয়ের উদ্যোগে এখন খুলনা বিভাগকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলায় কাজ শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক হেলাল মাহমুদ শরীফ বলেন, ‘জানুয়ারিতেই নড়াইল জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করা হবে। আশা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নড়াইলকে ভিক্ষুকমুক্ত জেলা হিসেবে ঘোষণা দিবেন। অন্যথায় মুখ্যসচিব বা কোনো সচিব মহোদয় ঘোষণা করবেন। এখন দিনক্ষণের অপেক্ষায় আছি।’

No comments:

Post a Comment