Monday, January 23, 2017

পালা করে ঘুমাতে হয় ব্যারাকের পুলিশকে

ব্যারাকগুলোতে পালা করে ঘুমাতে হয় পুলিশ সদস্যদের। একজন ডিউটিতে গেলে আরেকজন ঘুমান। আবার কেউ অসময়ে ডিউটি থেকে ফিরলে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য তাকে অপেক্ষায় থাকতে হয় ঘুমিয়ে থাকা ব্যক্তি কখন উঠবেন সেজন্য। প্রতি বছর পুলিশের সদস্য বাড়ছে। বাড়ছে না আবাসন সুবিধা। ফলে গাদাগাদি করে থাকতে হয় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মেস ও ব্যারাকগুলোতে। কনস্টেবল ও নায়েকদের জন্য সরবরাহ করা পোশাকের কাপড়ের মান নিয়েও তারা আপত্তি তুলেছেন। বলেছেন, নিম্নমানের খাবার সরবরাহের কথা। ডিএমপির কন্ট্রোলরুম ব্যারাক, ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম ব্যারাক, স্পন্দন অতিথি ভবন ব্যারাকগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বড় হলরুমের মতো কক্ষগুলোতে সারি সারি বিছানা। একটির সঙ্গে আরেকটি ঠাসাঠাসিভাবে লাগানো। হাসপাতালের বেডের মতো খাটগুলোতে থাকেন দুই থেকে তিনজন করে পুলিশ সদস্য।
সেখানে আছেন ডিএমপির পুলিশ, নৌ-পুলিশ, শিল্প পুলিশ, টুরিস্ট পুলিশ, সিআইডি, এসবি, হাইওয়ে পুলিশ, পিবিআই পুলিশসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসআই পর্যায়ের সদস্যরা। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) নায়েক হাসনাত জানান, ব্যারাকগুলোতে থাকা খাওয়ার চরম কষ্টের কথা। তিনি বলেন, ‘ক্যান্টিনে খাওয়ার জন্য প্রতি বেলায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা খরচ হয়। এরপর চা-নাশতাসহ সারা দিনে খাওয়া বাবদ আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ টাকা গুনতে হয়। একজন নায়েক মাসে বেতন পান সাড়ে ১০ হাজার টাকার মতো। যার অর্ধেকটাই চলে যায় খাবারে। ডিএমপির কন্ট্রোলরুম ব্যারাকের এএসআই জাকির হোসেন জানান, ব্যারাকের সব ক’টি ভবনে টয়লেটগুলোর বেহাল দশা। রয়েছে ক্যান্টিনের সমস্যা। কন্ট্রোলরুম ব্যারাকে সব ক’টিতেই গাদাগাদি করে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। সেখানে তিন হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যকে কার্যত মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। তুলনামূলক কিছুটা ভালো আছেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সদস্যরা। সেখানে ৯টি পুলিশ কোম্পানি, একটি কেন্দ্রীয় কোম্পানিসহ প্রায় ১০ হাজার পুলিশের অবস্থান। কোম্পানি মেসগুলোতে প্রতি তিন জনে দুটি করে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়। তবে বরাদ্দের অতিরিক্ত পুলিশও থাকেন পুলিশ লাইনের ব্যারাকে।
খাওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে রেশন কার্ড জমা দিয়ে মাসে চারশ’ টাকা দিয়ে সরকারিভাবে খাবার পান। আর যারা রেশন তুলে নেন তাদের দিতে হয় মাসে ২৫০০ টাকা। রেশন কার্ড জমা না দিলে খাবার দেয়া হয় না। ব্যারাকে সকালের নাশতায় রুটি আর ভাজি, দুপুরে ও রাতে মাছ অথবা মাংস। সঙ্গে ভাত আর ডাল। যারা ডিউটিতে থাকেন তাদেরকেও নিজ নিজ কোম্পানির মেস থেকে খাবার সরবরাহ করা হয়। এজন্য মেসগুলোতে আলাদা বেতন ও পরিচয়পত্রধারী লোকজন আছেন। এ ছাড়া পুলিশ কনস্টেবলরাও মেসে বাবুর্চির কাজ করেন। ডিএমপির উপ-কমিশনার (কল্যাণ অ্যান্ড ফোর্স) জাকির হোসেন যুগান্তরকে জানান, পুলিশ লাইনে প্রায় ১০ হাজার পুলিশ সদস্য থাকছেন। ব্যারাকে আবাসনের ব্যবস্থা আছে ৫ হাজারের কাছাকাছি। তাই বাড়তি সদস্যদের ডাবলিং করে থাকতে হয়। রাজধানীর বাইরের জেলার পুলিশ ব্যারাকগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। দু’দিন আগে নারায়ণগঞ্জ আদালতের ব্যারাকে গিয়ে দেখা গেছে বেহাল দশা। ৪০ ফুট বাই ৮০ ফুটের লম্বা একটি কক্ষে আড়াআড়িভাবে হাসপাতালের বেড আকৃতির খাট ফেলা। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। পুলিশের সরকারিভাবে দেয়া পোশাক নিয়েও রয়েছে নানা অনিয়ম। প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে বছরে দুই সেট প্যান্ট-শার্ট ও এক জোড়া বুট দেয়া হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পুলিশের সদস্যরা জানান, রোদ, বৃষ্টিতে দায়িত্ব পালনকালে দুই সেট পোশাক দিয়ে বছর পার কখনই সম্ভব হয় না। প্রোটেকশন বিভাগের নায়েক আনোয়ার ও কনস্টেবল ফারুকসহ কয়েক পুলিশ সদস্য যুগান্তরকে জানান, সরকারিভাবে সরবরাহকৃত পোশাক মোটা কাপড়ের এবং খসখসে হয়।
কোনো কোনো পোশাকে কয়েকদিন পরেই রং উঠে যায়। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে বেতনের টাকায় বাড়তি পোশাক বানাতে হয়। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি লজিস্টিক জানান, পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএনসহ পুরো পুলিশ বাহিনীর পোশাক বাবদ গত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৯০ কোটি টাকা। এদের মধ্যে র‌্যাবের জন্য প্রায় সাত কোটি টাকা দিতে হয়। সেলাই বাবদ বরাদ্দ দিতে হয় ১৫ থেকে ১৫ কোটি টাকা। বাকি ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকার মধ্যে সব পুলিশকে পোশাক ও বুট, ক্যাপসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম দিতে হয়। এরপরও চেষ্টা করা হয় উন্নত মানের ও টেকসই কাপড় দিয়ে পুলিশের পোশাক সরবরাহ করার। বরাদ্দ ঘাটতির কারণে সবচেয়ে উন্নত কাপড় সরবরাহ সম্ভব হয় না। প্রাপ্ত তথ্যমতে ঢাকার বাইরের তুলনায় ঢাকাতেই পুলিশের আবাসন সংকট চরম। থানা, ব্যারাক, পুলিশ ফাঁড়ি ও পুলিশ লাইনগুলোতে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি পুলিশ সদস্যকে থাকতে হয়। বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মোট জনবল ৩৩ হাজার ৭৩৯ জন। তার তুলনায় আবাসন ও ব্যারাকে সংস্থান অর্ধেকেরও কম। সারা দেশে পুলিশের সদস্য আছেন মোট ১ লাখ ৯৪ হাজার ২৮৩ জন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ২৭ হাজার ৩৪৮টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। নতুন ৫০ হাজার জনবল নেয়ার অংশ হিসেবে বর্তমান সরকারের সময়ে ৪০ হাজার ৯০৬টি পদ সৃষ্টি হয়েছে। এসব পদ সৃষ্টির সঙ্গে দেখা দিয়েছে ব্যারাক ও আবাসনের সমস্যা। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে রাজধানীর সায়েদাবাদ, মিরপুর, নীলক্ষেত এলাকায় বহুতল বেশ কয়েকটি ভবন করা হয়েছে। এসব ভবনে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের। কনস্টেবল বা নায়েক পদে কর্মরতদের জন্যও ব্যারাক নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন আছে। সব পুলিশ সদস্যের আবাসন সমস্যা নিরসন, ব্যারাক সুবিধা, দাফতরিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। নারী পুলিশ সদস্যদের আবাসন সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন জেলায় ৫৫টি মহিলা ব্যারাক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment