Monday, January 2, 2017

জিএসপি নয়, নতুন বাজার খুঁজুন : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার মাসব্যাপী ২২তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন করেছেন। একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ২০১৩-১৪ সালে দেশের সর্বোচ্চ রফতানি আয়কারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় রফতানি ট্রফি দেন। এ সময় শেখ হাসিনা রফতানি পণ্যের বাজার বহুমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জিএসপির পেছনে না ছুটে নতুন বাজার খুঁজে দেখার জন্য ব্যবসায়ী ও শিল্প-মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে ২০১৭ সালের জন্য ‘প্রডাক্ট অব দি ইয়ার’ (জাতীয়ভাবে বার্ষিক পণ্য) ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ৬৬টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে এদিন রফতানি ট্রফি ও সনদ দেয়া হয়। এর মধ্যে ২৯টি প্রতিষ্ঠান স্বর্ণ, ২২টি রৌপ্য এবং ১৫টি ব্রোঞ্জ ট্রফি পায়। সর্বোচ্চ রফতানি আয়ের জন্য স্বর্ণ পদক পায় জাবের এন্ড জুবায়ের ফ্রেব্রিক্স। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উদীয়মান চামড়া শিল্প খাতের অন্তর্নিহিত সব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে আমি ২০১৭ সালের জন্য চামড়া ও পাদুকাসহ চামড়াজাত পণ্যকে জাতীয়ভাবে বার্ষিক পণ্য বা প্রডাক্ট অব দি ইয়ার হিসেবে ঘোষণা করছি।’ এ পণ্যকে সব ধরনের সহযোগিতা ও প্রণোদনা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার শুধু পোশাক শিল্পের মধ্যে রফতানি আয়কে সীমাবদ্ধ না রেখে রফতানি পণ্যের বাজার বহুমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। এজন্য ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তা আরও কার্যকর করার পন্থা অবলম্বন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সাড়ে ৪ দশকে চামড়া খাতে রফতানি প্রায় ৭১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রথম সারির বৈশ্বিক পণ্যগুলোর চামড়াজাত পণ্য এখন বাংলাদেশেই প্রস্তুত হয়।
এ পণ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সংযোজন সম্ভব হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগিয়ে যাব সেই চিন্তা-চেতনা নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা করে যাচ্ছি। অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য বেসরকারি খাতকে আমরা উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এ খাতের যেন পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে সেজন্য বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন, বিদ্যুৎ উৎপাদনও আমরা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছি। আজ আমাদের অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে বিকশিত হয়েছে বেসরকারি খাত। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক্ষেত্রে আমি বলব, বেসরকারি খাতেরও যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে শুধু নিজেরাই সম্পদশালী হবেন- সেই চিন্তা-ভাবনা যেন না থাকে। মনে রাখতে হবে, আপনাদের যে সুযোগ-সুবিধাগুলো দিচ্ছি সেই সুযোগ নিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে যারা শিল্প কল-কারখানা গড়ে তুলবেন তাদের খেয়াল রাখতে হবে আমরা রফতানিকে গুরুত্ব দেই। আবার এটাও ভাবতে হবে আমার নিজের দেশে বাজার সৃষ্টি করতে হবে। নিজের দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। আজকে আমার দেশের মানুষের যদি আর্থিক সচ্ছলতা আসে আমার দেশের মানুষের যদি ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে তাহলে মানুষ যেমন ভালো থাকবে তেমনি আপনাদের শিল্পের প্রসার ঘটবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু দেশে নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় আপনারা যেন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারেন সেই সুযোগটাও আমরাই সৃষ্টি করে দিয়েছি। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া, নেপাল) এবং বিসিআইএম-ইসির (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া, মিয়ানমার- অর্থনৈতিক করিডোর) প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। ব্যবসায়ীদের নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাজারই শুধু না, কোন দেশের কোন এলাকায় কোন পণ্যের চাহিদা বেশি এবং কোন পণ্যের উৎপাদন আমাদের দেশে সম্ভব তা আপনাদের খুঁজে বের করতে হবে। সেই সঙ্গে সঙ্গে সেসব পণ্য আপনাদের উৎপাদন করে নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বলেন, কোনো দেশ জিএসপি দিল না সেজন্য স্যারদের পেছনে না ঘুরে আপনারা নিজেরাই অন্য বাজার খুঁজে বের করেন। তখন ওরাই আপনাদের পেছনে দৌড়াবে। কারণ আমাদের দেশ পণ্য যতটা দ্রুততার সঙ্গে সরবরাহ করতে পারবে অন্য দেশ তা পারবে না। কাজেই আমাদের ব্যবসায়ীদেরও সে উদ্যোগ নিতে হবে। বাজার খুঁজে ফেরা আর আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রটা প্রসারিত করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের রফতানিকে বহুমুখীকরণ করতে হবে। গবেষণার প্রতি গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, আমার মনে হয় এফবিসিসিআইর একটি পৃথক গবেষণা সেল থাকা উচিত। যাদের কাজ হবে গবেষণা করা পৃথিবীর কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা, সেই পণ্য উৎপাদন করার মতো সক্ষমতা আমাদের দেশের রয়েছে কিনা, আমাদের কাঁচামাল আছে কিনা, সেগুলো আমদানি করা। এ ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। শেখ হাসিনা বলেন, দেশকে যদি আমরা দারিদ্র্যমুক্ত করতে চাই তাহলে অন্যান্য দিকে থেকেও আমাদের এগোতে হবে। শিল্পায়নটাও দরকার। সে দিকে লক্ষ্য রেখে আমরা একশ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের বিভিন্ন জায়গায় করে দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বলেন, আপনারা যদি বিনিয়োগ করতে চান তাহলে এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে করতে হবে, কারণ সেখানে সব ধরনের সুবিধা আমরা সৃষ্টি করে দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজকে কিন্তু বাংলাদেশে অনেকেই বিনিয়োগ করতে আসতে চাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আপনারাও কিন্তু আপনাদের পার্টনার খুঁজে নিতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীন সরকারের সহায়তায় পূর্বাচলে নির্মাণ করা হচ্ছে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার। যেখানে ২০১৯ সালে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হবে। অনুষ্ঠানে তোফায়েল আহমেদ জানান, এ বছর ২১টি দেশ (বাংলাদেশসহ) মেলায় অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো হল- ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাশ, নেপাল, হংকং, জাপান, ভুটান, বাহরাইন, ভিয়েতনাম এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।

No comments:

Post a Comment