আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এককভাবে করার ঘোষণা দিয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যতবার এককভাবে নির্বাচন করেছি ততবারই লাভবান হয়েছি। তাই আগামী নির্বাচন এককভাবেই করব। তিনশ’ আসনেই প্রার্থী দেব। আমরা আর কারও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হব না।’ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বিশাল মহাসমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এরশাদ এ কথা বলেন। তিনি ২০১৯ সালের নির্বাচনকে জীবনের শেষ নির্বাচন মন্তব্য করেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এরশাদ বলেন, ‘জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। কতদিন আর বাঁচব...। আমাকে বাঁচাতে হলে জাতীয় পার্টিকে আবার ক্ষমতায় আনতে হবে। তোমরা আমাকে নতুন জীবন দাও।’
এ সময় জাতীয় পার্টিকে শক্তিশালী করতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান এরশাদ। তিনি বলেন, ‘আমার শেষ জীবনের চাওয়া- জাতীয় পার্টিকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই। ক্ষমতায় যাওয়ার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। এর জন্য শক্তি প্রয়োজন, নির্ভর করছে তোমাদের ওপর। তোমরা দলকে শক্তিশালী করো।’ এরশাদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টি জেগে উঠেছে। জনগণ জেগে উঠেছে। কারণ কী? কারণ, তারা পরিবর্তন চায়। শান্তি চায়। নিরাপত্তা চায়।’ সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- এককভাবে নির্বাচন করে আমরা সবচেয়ে ভালো ফল করেছি। কিন্তু জোটগতভাবে নির্বাচন করে আসনের দিক থেকেও যেমন আমরা কম পেয়েছি, আবার দলগতভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তবে, পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়েছে বলে অনেক সময় ক্ষতি জেনেও তা মেনে নিতে হয়েছে। এবার আমি সুস্পষ্টভাবে জানাতে চাই- আর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে চাই না। আগামী নির্বাচনে দলের তৃণমূল পর্যায় থেকে মতামত নিয়ে প্রত্যেক আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মনোনীত করতে চাই। আপনারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী মনোনীত করে আমার কাছে প্রস্তাব পাঠাবেন।’ এরশাদ বলেন, ‘প্রার্থী মনোনীত করাই কিন্তু শেষ কথা নয়। লাঙলের প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে হলে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। তার জন্য প্রত্যেক জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম এবং কেন্দ্রভিত্তিক নিবেদিত কর্মীদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। আগামীকাল থেকে আপনাদের যাত্রা শুরু হবে। এই যাত্রার শেষ গন্তব্য ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ।’
পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গিয়ে দেশ ও জনগণের জন্য কী করব- তাও আজ আমি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। ক্ষমতায় গেলে আমরা প্রাদেশিক সরকার গঠন করব। এই সরকার দিয়ে আমরা উপকৃত হইনি, নিষ্পেষিত হয়েছি। এভাবে দেশ চলতে পারে না। তাই প্রাদেশিক সরকার চাই। আমরা ক্ষমতায় গেলে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ব্যবস্থা চালু করব। প্রত্যেক উপজেলায় গুচ্ছগ্রাম করে দেব। এখন যা আছে- তাতে উপজেলা শাসন করেন ইউএনও। আমরা উপজেলা পরিষদকে শক্তিশালী করব। কারণ আমরা চাই জনগণের নেতা জনগণকে শাসন করবে।’ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংসদ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এরশাদ বলেন, ‘আমরা ১৬ কোটি মানুষ এক এবং অভিন্ন। জাতীয় পার্টি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে।’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় দুই বছর পর দলের মহাসমাবেশ করল জাতীয় পার্টি। সকাল সোয়া ১০টায় শুরু হয় তা। দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং পায়রা ওড়ানোর মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এ সমাবেশে লক্ষাধিক নেতাকর্মী জমায়েত হন। শীতের সকালেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। পার্টি চেয়ারম্যান কী বলেন তা শোনার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন তারা। এরশাদ ছাড়াও মহাসমাবেশে দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এমপি, কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু এমপি, সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি, ফখরুল ইমাম এমপি, সাইদুর রহমান টেপা,
অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলাম, সুনীল শুভ রায়, মীর আবদুস সবুর আসুদ, মজিবুর রহমান সেন্টু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সোমনাথ দে, যুব সংহতির সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন, মহিলা পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান হেনা খান, সাধারণ সম্পাদক অনন্যা হোসাইন মৌসুমী, শ্রমিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন বক্তৃতা করেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এবং উত্তরের সভাপতি এসএম ফয়সল চিশতী যৌথভাবে মহাসমাবেশ পরিচালনা করেন। মহাসমাবেশে এরশাদ আরও বলেন, যে কোনো বছরের প্রথম দিনকে শুভ দিন ধরে নেয়া হয়। সেই শুভ দিনে জাতীয় পার্টির জন্ম। তাই আমরা এই দিনকে আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করি। এবার সেই আনন্দে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সারা দেশের মানুষের মনে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে যে আশার আলো জেগে উঠেছে তারই প্রতিফলন ঘটেছে আজকের এই মহাসমাবেশে। তিনি বলেন, আজকের নবীনরা সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত নয়। কোন অবস্থার প্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির জন্ম হয়েছিল তা হয়তো আজকের তরুণরা জানে না। সে কথা আজ তাদের জানাতে হবে। এরশাদ বলেন, আমাদের ভোটারদের ৭০ ভাগ ভোটারের বয়স ২৪ কিংবা তার নিচে। এই তারুণ্য এখন আমাদের শক্তি। তরুণরা যুগে যুগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।
তারাই পরিবর্তনের কাণ্ডারী। তারাই দেশের সম্পদ। আগামী নির্বাচনে এই তরুণরাই হবে প্রধান শক্তি। ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এরশাদ বলেন, ‘১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশের চরম ক্রান্তিলগ্নে আমার ওপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছিল। আমি কোনো অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসিনি। আমি অভ্যুত্থানে বিশ্বাস করি না। কাউকে হত্যা কিংবা কাউকে দেশান্তরিত করে আমি ক্ষমতা লাভ করিনি। তৎকালীন নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার তার মন্ত্রিসভা দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে ব্যর্থ হয়ে স্বেচ্ছায় রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে সামরিক আইন জারি করেছিলেন। সেনাবাহিনীর কাছে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে তখন আমাকে সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। একটি কথা সবাইকে বুঝতে হবে সামরিক অভ্যুত্থান আর সামরিক আইন জারি এক বিষয় নয়। সামরিক অভ্যুত্থানে রক্তক্ষয় হয়। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। আর সামরিক আইন জারি হয় আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সেই আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির দেয়া দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছিলাম।’ এরশাদ বলেন, ‘দেশে তখন চরম অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। দুর্নীতি-দুঃশাসন চরম আকার ধারণ করেছিল। রাষ্ট্রপতি সাত্তার নিজেই তার মন্ত্রিসভাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর বাড়িতে খুনের আসামি পাওয়া গিয়েছিল। তখন দেশে চলছিল চরম নৈরাজ্য। সেই অবস্থায় দেশকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
দেশের একজন সৈনিক হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে আমার ওপর যখন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা অর্পিত হয় তখন জনস্বার্থ বিবেচনা করে, আল্লাহর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রপতির দেয়া সেই ক্ষমতা আমি গ্রহণ করেছি।’ এরশাদ আরও বলেন, ‘ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছরের মধ্যেই দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে এনে আমি ১৯৮৪ সালে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলাম। তখন আমার কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। আমি আশা করেছিলাম- সব দল নির্বাচনে আসবে, নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করে আমি ব্যারাকে ফিরে যাব। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলো এই সুযোগটি গ্রহণ করতে চাইল না। তারা নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিল। ফলে সামরিক আইন আরও দীর্ঘায়িত হল। এর জন্য আমি দায়ী ছিলাম না। দায়ী ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক দলগুলো।’ সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়া এবং নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে দল গঠন করতে হল। একটি শুভ লক্ষ্য নিয়ে, একটি শুভ দিনে, দেশ ও জনগণের কল্যাণে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় পার্টির জন্ম হয়। ১৯৮৬ সালে আজকের মতো একটি দিনে জাতীয় পার্টির যাত্রা শুরু হয়। সেদিন দেশের প্রবীণ ও নবীন রাজনৈতিক নেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের নিয়ে আমি জাতীয় পার্টি গঠন করেছিলাম। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল আমাদের এই পার্টি। এরশাদ বলেন, আমার আমলের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট,
ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামোগত অসংখ্য উন্নয়নের চিত্র এখনও দৃশ্যমান। আমি শুধু উন্নয়ন-সমৃদ্ধি ও সংস্কার করেই ক্ষান্ত হইনি। সুশাসন ছাড়া উন্নয়নের সুফল জনগণ ভোগ করতে পারে না। তাই উন্নয়ন এবং সুশাসনকে আমি এক সূত্রে গ্রথিত করেছিলাম। আমার ৯ বছরের শাসনামলে দেশে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দুঃশাসন, খুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন ছিল না। মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছে। তাই আজও শান্তি-সুশাসনের প্রতীক হিসেবে দেশবাসী জাতীয় পার্টিকেই স্মরণ করে। তিনি বলেন, ২৬ বছর ধরে বঞ্চনা-গঞ্জনা-নির্যাতনের মধ্যেও আমরা আজ পর্যন্ত টিকে আছি। এই টিকে থাকার পেছনে আছে মহান আল্লাহপাকের অসীম রহমত ও জনগণের ভালোবাসা। জানি না কেন তিনি (আল্লাহ) আমাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন। হয়তো তার কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। যার প্রতিফলন ঘটবে আগামী নির্বাচনে। এরশাদ প্রশ্ন করেন, আজ দেশের কী পরিস্থিতি? আমরা ২৬ বছর আগে যখন ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলাম- তখন মানুষ যতটুকু শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বাস করতে পেরেছে, এখন কী সেভাবে পাচ্ছে? আমরা যে সুশাসন উন্নয়নের ধারা প্রবর্তন করেছিলাম, তা কি এখনও বহাল আছে? থাকতে পারছে? এখন আমরা দেশে কী দেখতে পাচ্ছি। আমরা খবরের কাগজ খুললেই প্রতিদিন দেখতে পাই- খুন-গুম, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, যৌতুকের বলি, এসিড সন্ত্রাস, ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর, দলীয় কোন্দলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের খবর। এই দৃশ্য দেখার জন্যই কী জনগণ দেশকে স্বাধীন করেছিল।
এরশাদ বলেন, এদেশের হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আমরা সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলাম। তাহলে কেন আজ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে? কেন পুরোহিত, পাদ্রি, ভিক্ষুরা হামলার শিকার হচ্ছে? কেন নিরীহ মানুষকে জঙ্গিদের হাতে প্রাণ দিতে হচ্ছে? কেন সংখ্যালঘুদের বাড়ি-ঘর লুট হচ্ছে? কেন তাদের জায়গা-জমি বেদখল হচ্ছে? এসব তো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নিদর্শন হতে পারে না। আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই- যারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের সম্পদ লুট করছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে এসবের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করতে হবে। এরশাদ আরও বলেন, ২৬ বছর ধরে আমরা কঠিন সময় অতিক্রম করে চলছি। এখনও আমরা এক কঠিন সময়ের মধ্যে আছি। আগামী দিনে আমরা কী করতে চাই, কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করব সে ব্যাপারে আপনাদের সামনে আমি কিছু বার্তা দিতে চাই। আমরা সাংবিধানিকভাবে চলতে বিশ্বাসী। সেই হিসেবে আগামী নির্বাচন ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ অনুষ্ঠিত হতে হবে। এই নির্বাচন হবে আমাদের বাঁচা-মরার লড়াই। আমরা ২৬ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছি। আগামী নির্বাচনে আমাদের ক্ষমতায় যেতে হবে- সেই লক্ষ্য নিয়ে আজ থেকে পথ চলা শুরু করতে হবে। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা আগামীতে কীভাবে নির্বাচনে অংশ নেব। এটা সত্য যে, আমাদের দেশের মতো অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও বর্তমানে জোটগত নির্বাচনের একটি প্রবণতা চলমান রয়েছে। এখন আমরা কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করব? কারও সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে- নাকি এককভাবে? সেই সিদ্ধান্তের কথা আজ আমি আপনাদের জানাতে চাই।’
এরশাদ বলেন, ‘জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ পর্যন্ত যতগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে অর্থাৎ তৃতীয় থেকে দশম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত মোট ৮টি নির্বাচনের মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচন বাদে ৭টি নির্বাচনে আমরা অংশ নিয়েছি। তার মধ্যে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও সপ্তম এই চারটি নির্বাচনে আমরা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। বাকি অষ্টম, নবম ও দশম এই তিনটি নির্বাচন আমরা জোটগতভাবে করেছি। অষ্টম নির্বাচন ছিল ইসলামী ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যৌথভাবে এবং নবম ও দশম মহাজোটগতভাবে। এই নির্বাচনগুলো যদি পর্যবেক্ষণ করা হয়- তাহলে দেখা যায়, তৃতীয় ও চতুর্থ নির্বাচনে আমরা এককভাবে ক্ষমতায় যেতে পেরেছি। পঞ্চম নির্বাচনে আমরা ৩৫টি আসন লাভ করেছি। সপ্তম নির্বাচনে ৩৪ আসন। অষ্টম নির্বাচনে আমি অংশ নিতে পারিনি। ফলে আমাদের আসন সংখ্যা ১৪-তে নেমে এসেছে। তাই পার্টি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন সিদ্ধান্ত আর নেব না।’ সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির জন্যই আমি আমার জীবনকে উৎসর্গ করেছি। জাতীয় পার্টিকে বাঁচিয়ে রেখে এই পার্টির মধ্যেই বেঁচে থাকতে চাই। আমার জীবনের সামনে আর কতটুকু সময় বাকি আছে জানি না। হয়তো আগামী নির্বাচনই হবে আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। এই নির্বাচনে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। আমি ক্ষমতার জন্য ক্ষমতায় যেতে চাই না। জাতীয় পার্টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, দেশকে উন্নয়ন-সমৃদ্ধি-সংস্কার দেয়ার জন্য এবং জনগণের শান্তি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি সুখী-সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্যই ক্ষমতায় যেতে চাই। আমার চাওয়া-পাওয়ার আর কিছু বাকি নেই। জীবনের শেষ সময়টুকু দেশ ও জাতির জন্য উৎসর্গ করে নিজেকে মানুষের মনে অমর করে রাখতে চাই।’ সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ বলেন,
এবার সুযোগ এসেছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এককভাবে ক্ষমতায় যেতে হবে। পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদকে সে ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টির সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছে অন্য কোনো সরকারের আমলে সে উন্নয়ন হয়নি। যারা দল থেকে চলে গেছে তাদের দলে ফিরে আসার আহ্বান জানান সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, অতীতে সংসদ অকার্যকর ছিল। জাতীয় পার্টিই সংসদকে কার্যকর করেছে। পার্টিকে শক্তিশালী করতে পারলে আগামী নির্বাচনেই এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব। রওশন আরও বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় এরশাদ ক্ষমতা ছাড়েন। কিন্তু দেশে এখন গণতন্ত্র কোথায়? এরশাদ শাসনামলের প্রশংসা করে তিনি বলেন, জেলে থাকা অবস্থায় এরশাদ ৫টি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। এতেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এরশাদ কতটুকু জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি বলেন, দেশের অবস্থা এখন ভালো নয়। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে এরশাদের বিকল্প নেই। রওশন এরশাদের বক্তব্য চলাকালে সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মীরা হৈচৈ শুরু করেন। তারা এরশাদের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে রওশন এরশাদের বক্তব্য শুনতে চান। তারা দাবি জানান, ক্ষমতা ছাড়ার পর এরশাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছিল সেসব মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। পরে রওশন এরশাদ জানান, এরশাদের মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কাজ হবে ইনশাআল্লাহ। শক্তি সঞ্চার করতে পারলে অবশ্যই মামলা প্রত্যাহার হবে। সাবেক মন্ত্রী ও পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, দুর্ভাগ্যের বিষয়- বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেককেই জাতীয় পার্টি সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলতে দেখা যায়। তারা নানাভাবে জাতীয় পার্টিকে হেয়প্রতিপন্ন করেন।
এরশাদকে তারা স্বৈরাচার বলেন। তার শাসনামলকে স্বৈরশাসন বলতে পছন্দ করেন। জিএম কাদের বলেন, ‘আপনারা জ্ঞানী, শিক্ষিত, বিবেকবান মানুষ। তাই আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা- এরশাদের আগে বা পরে এমন একজন শাসকের নাম বলুন- যিনি এরশাদের চেয়ে কম স্বৈরশাসক।’ পার্টির মহাসচির এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমরা বারবার আশাহত হয়েছি। আর আশাহত হতে চাই না। এবার এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যেতে চাই। আর নির্যাতিত হতে চাই না। এরশাদের হাতের ছোঁয়ায় সারা দেশে সোনা ফলাতে চাই। আজ আমরা দুর্বল নই। এরশাদের যে কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে সারা দেশের লাখ লাখ নেতাকর্মী প্রস্তুত আছে।’ তিনি বলেন, মানুষ এরশাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এরশাদকেই তারা ক্ষমতায় দেখতে চায়। রুহুল আমিন হাওলাদার আরও বলেন, এরশাদের বিরুদ্ধে যারা মামলা করেছেন তাদেরও আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। যারাই এরশাদের বিরুদ্ধে অবিচার করছেন তাদেরই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এরশাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনি দুই বছরের মধ্যে নির্বাচন দেয়ার ষোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি দল নির্বাচনে না আসায় ১৯৮৪ সালে সেটি সম্ভব হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে এরশাদ দল গঠন করেন ও ১৯৮৬ সালে নির্বাচন দেন। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বক্তব্য দেয়ার সময় নেতাকর্মীরা এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্লোগান দিতে থাকেন। সাবেক মন্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, গত ২৬ বছরে জাতীয় পার্টিকে ধ্বংস করতে অনেকে নানা অপচেষ্টা চালিয়েছেন। কেউ পারেননি। ভবিষ্যতেও কেউ এ পার্টি ধ্বংস করতে পারবেন না। জাতীয় পার্টি হল রাজনীতির বড় ফ্যাক্টর। বর্তমান সরকারের সব উন্নয়নের দাবিদার হল জাতীয় পার্টি। কারণ জাতীয় পার্টি যদি নির্বাচনে না যেত তাহলে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারত না। অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম তার বক্তব্যের শুরুতে চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ উপস্থিত অন্য নেতাদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘উপজেলা পদ্ধতির মাধ্যমে পল্লীবন্ধু ঘুমন্ত গ্রামগুলোকে যেভাবে জাগিয়ে তুলেছেন, ঠিক তেমনিভাবে এই মহাসমাবেশের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি জেগে উঠেছে, উজ্জীবিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ দেশের সাধারণ মানুষ দিশেহারা।
একদল চায় ক্ষমতাকে কিভাবে পাকাপোক্ত করা যায়, আরেক দল চায় কিভাবে ক্ষমতায় যাওয়া যায়। এই দুই দলের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দেশের সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।’ অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম বলেন, ‘মানুষের জীবনে আজ কোনো নিরাপত্তা নেই। গুম, খুন আর দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বন্ধ। যুব সমাজের কর্মসংস্থান নেই। এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। এজন্য জাতীয় পার্টিকে সংগঠিত করে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পল্লীবন্ধু এরশাদের শাসন আমলের নয় বছরের সুন্দর দিনগুলোর কথা দেশবাসীর কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশের এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকার দেখতে চায়। তারা জানে এরশাদ ক্ষমতায় এলে দেশ আবার এগিয়ে যাবে, মানুষ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবে।’ দলীয় কার্যক্রম তুলে ধরে জাতীয় পার্টির এ প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘আমরা জাতীয় সংসদে বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা করে আসছি এবং রাজপথে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছি। বাংলার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও বেগম রওশন এরশাদের গতিশীল নেতৃত্বে আগামীতে জাতীয় পার্টি আরও শক্তিশালী হবে ইনশাআল্লাহ। আসুন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় পার্টিকে সংগঠিত করি।’

No comments:
Post a Comment