ব্যাটসম্যানদের
ধৈর্য্য আর নির্ভুল হিসাব-নিকাশের ‘পরীক্ষা’ হয় টেস্ট ক্রিকেটে। তাই
সাধারণত মারকুটে ব্যাটসম্যানদের কম দেখা দেখা যায় সাদা পোষাকে। সে কারণেই
হয়তো দীর্ঘদিন দেশের ক্রিকেটে সাব্বিরের পরিচয় ছিল সীমিত ওভারের ক্রিকেটার
হিসেবেই। ব্যাটিং স্টাইলের কারণেই ধরে নেয়া হয়েছিল সাব্বির রহমান ছোট
পরিসরের ক্রিকেটের খেলোয়াড়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর প্রথম দুই
বছর শুধু ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতেই বিবেচনা করা হয়েছে তাকে। যদিও সাব্বির
কখনোই সন্তুষ্টু ছিলেন না তার এই 'হার্ড হিটার' তকমা নিয়ে। ক্রিকেটের
সবচেয়ে অভিজাত শ্রেণি টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে নাম লেখানোর তাগিদ অনুভব
করতেন সব সময়। মেরে খেলতে পছন্দ করেন, কিন্তু সেটি ম্যাচের পরিস্থিতি
অনুযায়ী অবশ্যই। পাঁচ দিনের ক্রিকেট আর ৫০ কিংবা ২০ ওভারের ক্রিকেট যে এক
নয় সেটি তো তার না বোঝার কথা নয়? শুধু অপেক্ষায় ছিলেন সুযোগের। অবশেষে গত
অক্টোবরে দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে আসে সেই কাঙ্খিত
সুযোগ। সুযোগ পেয়েই মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রতিভা থাকলে হার্ড হিটাররাও
টেস্টে ভালো করতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে টেনেছেন বীরেন্দ্র শেবাগ কিংবা
ক্রিস গেইলের টেস্ট রেকর্ডের কথা। অবশ্য সাব্বিরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের
পরিসংখ্যানও তার পক্ষেই কথা বলবে।
৩৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার ব্যাটিং
গড় ৩৬। চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম টেস্টে অভিষেক
সাব্বিরের। আর প্রথম ম্যাচে খেলতে নেমেই ইতিহাসের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন
এই ‘হার্ড হিটার’। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের দেয়া ২৮৬ রানের লক্ষ্য তাড়া
করতে নেমে ১৪০ রানে টপ অর্ডারের ৫ ব্যাটসম্যানকে হারায় বাংলাদেশ। ৬ষ্ঠ
উইকেটে মুশফিকুর রহীমের সাথে ৮৭ রানে জুটি গড়ে প্রথমবারের মত ইংল্যান্ডের
বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন সমর্থকদের। ২২৭ রানে সর্বশেষ
স্বীকৃত ব্যাটসম্যান মুশফিক আউট হয়ে গেলেও লোয়ার অর্ডারকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে
যেতে থাকেন সাব্বির। এরই পথে আদায় করে নেন ব্যক্তিগত অর্ধশত। তবে শেষ
পর্যন্ত হিরো নয়, ট্রাজিক হিরোই হয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। পঞ্চম দিন সকালে অপর
প্রান্ত দিয়ে অল আউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে ১০২ বল খেলে
৬৪ রানে অপরাজিত সাব্বিরের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। একরাশ
আক্ষেপ নিয়ে অভিষেক টেস্টে ইতিহাস থেকে নিঃশ্বাস দূরত্বে থামতে হয়েছে তাকে।
সেই টেস্টের প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ১৯ রান।
মিরপুরে সিরিজের দ্বিতীয়
টেস্টে অবশ্য ভালো করতে পারেননি সাব্বির। তবে চট্টগ্রামে নির্বাচকদের
আস্থার যে প্রতিদান দিয়েছেন, তা তাকে সুযোগ করে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড সফরের
টেস্ট দলে। ওয়েলিংটনে সিরিজের প্রথম টেস্টে দারুণ খেলেও হেরে গেছে
বাংলাদেশ। এই টেস্টের উভয় ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করে(৫৪* ও ৫০) আবারো প্রমাণ
দিয়েছেন তার টেস্ট খেলার দক্ষতার। দুটি ইনিংসেই যথেষ্ট ধৈর্য্যরে পরিচয়
দিয়ে খেলেছে শতাধিক বল। গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহীম ও
ইমরুল কায়েসের ইনজুরির কারণে এই টেস্টে ব্যাটিংয়ে নিজেদের শতভাগ দিতে
পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু দলের সঙ্কটময় মূহুর্তে ঠিকই বুক চিতিয়ে কিউই
বোলারদের বাউন্সারের সাথে লড়াই করেছেন সাব্বির। সব মিলে তিন টেস্টে ৩টি হাফ
সেঞ্চুরি সাব্বিরের। গড় পঞ্চাশের বেশি। একজন খেলোয়াড়কে বিচারের জন্য মাত্র
তিনটি টেস্ট কিছুতেই মানদণ্ড হতে পারে না। তবে সাব্বিরের খেলা যারা
দেখেছেন, বুঝতে পারবেন প্রতিটি ম্যাচে পরিস্থিতি অনুযায়ী সাব্বিরের গেম
স্ট্রাটেজি কতটা নিখুঁত ছিল। নির্বাচকরাও যে তার ওপর রাখা আস্থার প্রতিদান
পাচ্ছেন সেটিও বোঝা যাচ্ছে।

No comments:
Post a Comment