Monday, January 16, 2017

গণতন্ত্র হরণ : রাবণ-বধের আয়োজন কোথায়?

আমরা সবাই গণতন্ত্রের পূজারি। কিন্তু গণতন্ত্রের- বিশেষ করে আসল গণতন্ত্রের বিগ্রহটি যে বহুকাল আগে মন্দির থেকে চুরি হয়ে গেছে, সেদিকে আমাদের কোনো খেয়াল নেই। আমরা মন্দিরের ভাঙা দেউলের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রমাগত কাঁদছি, হে মা, গণতন্ত্র, তুমি কোথায়? এই কান্নায় বাংলাদেশের সুশীলসমাজের সঙ্গে কেউ পাল্লা দিতে পারবে না। যদিও প্রকৃত গণতন্ত্রের অনুসারী এদের অনেকেই নন। গত শনিবার (১৪ জানুয়ারি) লন্ডনের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় অধুনা খ্যাতিমান কলামিস্ট পঙ্কজ মিশ্র একটি নিবন্ধে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের প্রতিভূ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যুদয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভের কারণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বর্ণবাদ, আধিপত্যবাদ, জাতিবিদ্বেষ কীভাবে শুধু আমেরিকা নয়, সারা বিশ্বে মাথা তুলেছে এবং গণতন্ত্র ও ধর্ম-বর্ণ নিরপেক্ষতাকে বিশ্ব রাজনীতিতে হটাতে চলেছে।
পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের এই অবক্ষয়ের ছায়া আমাদের উপমহাদেশেও পড়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের অবস্থার দিকে তাকালেও তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক বলে পরিচিত একদল বুদ্ধিজীবীর মধ্যেও চরম উল্লাস দেখা দিয়েছিল। তাদের একজন তো কাগজে একটা নিবন্ধ লিখে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। তার নিবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘গণতন্ত্রের অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া।’ বেশিদিন লাগেনি এই বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবীদের অনেকের মতিভ্রম ঘুচতে। শিগগিরই দেখা গেল, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতনে গণতন্ত্রের অমল ধবল পালে মন্দ মধুর হাওয়া লাগেনি, লেগেছে পুনরুজ্জীবিত ফ্যাসিবাদ বা নিও-ফ্যাসিবাদের গায়ে। এই ফ্যাসিবাদের গর্ভ থেকে একে একে বেরিয়ে এসেছেন, আমেরিকার নিক্সন, কিসিঞ্জার, বুশ এবং শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারা শুধু পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের বিগ্রহটিকে ধ্বংস করেননি, গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে সারা বিশ্বে যে যুদ্ধত্রাস ও তাণ্ডব সৃষ্টি করেছেন, তাকে নিও-ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন ও অভ্যুত্থান বলে পশ্চিমের খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের অনেকে স্বীকার করছেন। পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের অনুসারী আমাদের উপমহাদেশেও ইউরোপ-আমেরিকায় চরম ডানপন্থীদের (Far right) অভ্যুত্থানের ছায়াপাত হয়েছে। পাকিস্তানে মার্কিন মডেলের এই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে দেশে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি সেনাপ্রধানের গাড়িকে পথ ছেড়ে দেয়, সম্ভবত দেখা হলে তিনি সেনাপ্রধানকে কুর্নিশও করেন। সেনাবাহিনীর ওপর আধিপত্য আমেরিকার। সেনাবাহিনীর নির্দেশ চলে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার। এ অবস্থা দেখা দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর গণতন্ত্রে ফিরে আসার নামে যখন মার্কিন-তাঁবেদার ইয়েলৎসিনকে ক্ষমতায় বসানো হয়। তখনকার রুশ পার্লামেন্ট মার্কিন মডেলের গণতন্ত্র গ্রহণ করতে চায়নি। ফলে আমেরিকার ইচ্ছায় এবং ইয়েলৎসিনের নির্দেশে রুশ সেনাবাহিনী (এককালের খ্যাতিমান লাল ফৌজ) রাশিয়ার পার্লামেন্ট (ডুমা) আক্রমণ করে। অবরুদ্ধ পার্লামেন্ট গৃহে পার্লামেন্ট সদস্যদের খাদ্য পানীয় সরবরাহ বন্ধ করে রেখে তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। সে সময় লাল ফৌজের বেতন-ভাতাও আমেরিকাই জোগাত বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পশ্চিমা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের (যা প্রকৃত গণতন্ত্র নয়) গর্ভেই বর্ণবাদী। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মভিত্তিক গণতন্ত্রের জন্ম। পাকিস্তানে যা ইসলামী প্রজাতন্ত্র (ইসলামের সঙ্গে যার সম্পর্ক খুব কম) নাম ধারণ করেছে।
ভারতে ‘হিন্দুত্বসভা’ প্রতিষ্ঠার নামে ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশে তা ইসলামী হকমাতের নামে উগ্র ধর্মান্ধ দলগুলো ওয়াহাবি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এমন যে মিয়ানমার বা বার্মা, সেখানে সু চির মতো গণন্ত্রের সংগ্রামে বহুকাল ধরে নির্যাতিত এক নারী ক্ষমতায় আসার পর সেনা শাসনের অনুসরণে দেশে চরমপন্থী বৌদ্ধদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গা দমনের নিষ্ঠুরতা চালাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছেন না। ভারতে গণতন্ত্র এখন চরম পরীক্ষার সম্মুখীন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গণতন্ত্র ও হিন্দুত্ববাদের মধ্যে মধ্যপন্থা অনুসরণ করে চলতে চাইছেন; কিন্তু উগ্র শিবসেনা, আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দুসভা প্রভৃতি উপদলগুলোর চাপে তা পারছেন না। ভারতে সাম্প্রদায়িক সমস্যা বাড়ছে। বাড়ছে আঞ্চলিক সমস্যাও। মিশ্র ধর্ম ও জাতির দেশ ভারতকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছে গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্রের অবক্ষয়ে আঞ্চলিক বিরোধ বাড়ছে। কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায়; কিন্তু বহু রাজ্যে বিজেপি-বিরোধী দল শাসন চালাচ্ছে। বাংলা (দুই বাংলাই) চিরদিন বাইরের শাসনের বিরোধী। পূর্ববাংলা বহুকাল আগে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা করেছে। অন্যদিকে পশ্চিমবাংলাও দিল্লির শাসন মেনে নেয়নি, এখনও মানছে না। ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে দিল্লির কংগ্রেসী অথবা অকংগ্রেসী শাসন দাঁত ফোটাতে পারেনি। বামফ্রন্টের শাসনে পশ্চিমবঙ্গ এক ধরনের আধা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেছে। এখন দিল্লির বিজেপি শাসনামলেও করছে। বিদ্রোহী তৃণমূল এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসক। চলছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব। গান্ধী-নেহেরুর গণতন্ত্র ছাড়া এই দ্বন্দ্ব মেটানো যাবে না। হিন্দুত্ববাদ চাপাতে গেলে পশ্চিমবঙ্গও স্বাধীন বাংলার পথ ধরতে চাইতে পারে। কাশ্মীরে যুদ্ধ বাড়বে। সারা ভারতেই বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দেবে ধর্ম ও অঞ্চলের ভিত্তিতে। এদিক থেকে বাংলাদেশকে একটি সৌভাগ্যবান দেশ বলতে হবে।
বঙ্গবন্ধু ধর্মীয় রাষ্ট্রের নিগড় ভেঙে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা না করলে আজ তালেবানতন্ত্র এখানেও মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। পাকিস্তানের মতো কিলিং ফিল্ডে পরিণত হতো বাংলাদেশ। তারপরও স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বে বারবার আঘাত করেছে পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদ। এদেশেও মার্কিন মডেলের ভুয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়ে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছে। আমাদের সুশীলসমাজের একটা বড় অংশ গুড গভর্নেসের নামে তাতে সায় জুগিয়েছে। শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় যখন তারা এই মার্কিন মডেলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, তখন হায় গণতন্ত্র, হায় গণতন্ত্র বলে মাতম জুড়েছে। এই মাতম এখনও শেষ হয়নি; কিন্তু যে গণতন্ত্রের নামে তারা বিলাপ জুড়েছেন, সেই গণতন্ত্র যে পশ্চিমা বিশ্বেও কার্যত নেই, এই সত্যটা তারা স্বীকার করতে চাইছেন না। দেশ শাসনে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অনেক ভুল আছে, ব্যর্থতা আছে; কিন্তু একথা স্বীকার করতে হবে, উপমহাদেশের এই দেশটিতে অনেক ঝড়-ঝাপ্টার মুখে গণতন্ত্রের নিভু-নিভু দীপ শিখাটি জ্বালিয়ে রেখেছে আওয়ামী লীগই। এটা পাকিস্তানের মতো মার্কিন মডেলের নকল গণতন্ত্র নয়। এটা বহু নির্যাতিত, বারবার স্বৈরতন্ত্রের আঘাতে আহত মানবীয় চরিত্রের ভুল-ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির যে নির্বাচনকে দেশের সুবিধাবাদী সুশীলসমাজের একাংশ বৈধ বলে স্বীকার করতে নারাজ, তারা একথা বুঝেও না বোঝার ভান করছেন যে, এই নির্বাচনের বিকল্প ছিল তালেবানতন্ত্র। ২০১৪ সালের নির্বাচন দেশকে অন্তত এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করেছে। তবু হালে বাংলাদেশেও গণতন্ত্র হোঁচট খাচ্ছে। এর কারণ, প্রকৃত গণতন্ত্র মানবীয় চরিত্রের উপাদানে গঠিত। মানুষ যেমন দু’পায়ে হাঁটে, গণতন্ত্রকেও তেমনি দু’পায়ে হাঁটতে হয়। একটি পা না থাকলে গণতন্ত্র খঞ্জ হয়ে যায়; হাঁটতে পারে না। গণতন্ত্রের এই দু’পা হল সরকারি দল ও বিরোধী দল। সরকার যেমন গণতান্ত্রিক হবে, তেমনি গণতান্ত্রিক হবে বিরোধী দলও। এভাবেই কোনো দেশে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র গড়ে ওঠে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বাংলাদেশে এখন একটি বড় বিরোধী দল আছে; কিন্তু তারা গণতন্ত্রের অনুসারী নয়। স্বাধীনতার মূল চেতনার দ্বারাও তারা অনুপ্রাণিত নয়। দীর্ঘদিন চক্রান্তের ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির পথ অনুসরণ করে এখন তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসতে চাইছে। এটা তাদের আন্তরিক ইচ্ছা কিনা, তা পরীক্ষিত হওয়া দরকার। বিএনপিকে দেশে সভা-সমাবেশ করার সুযোগ দিয়ে সরকারের উচিত,
বিএনপির আন্তরিকতা পরীক্ষা করা। যদি বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ ঘটায়, তাহলে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা সরকারের উচিত হবে না। কিন্তু যদি দেখা যায়, বিএনপি আবার জ্বালাও-পোড়াও নীতিতে ফিরে গেছে, তাহলে সরকারকে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের মানুষও বুঝবে সরকার বাধ্য হয়েই কঠোর হয়েছেন। জননিরাপত্তা রক্ষার জন্য সরকারের রয়েছে শক্তিশালী পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব। বর্তমানের বিপর্যস্ত বিএনপিকে সরকারের ভয় পাওয়া উচিত নয়। ভয় পেলে সরকারের দুর্বলতাই প্রকাশ পাবে। আগেই বলেছি, আমরা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে চিৎকার করছি বটে; কিন্তু আসল গণতন্ত্রের বিগ্রহটি বহু আগে মন্দির থেকে চুরি হয়ে গেছে। চুরি করেছে পুঁজিবাদী দানব। এই দানবের হাতে গণতন্ত্রের নিত্য নিয়ত নির্যাতন আমরা দেখছি। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমরা এখন বিশ্বজুড়ে ‘মানুষ জন্তুর হুংকার শুনছি।’ এর প্রতিকার ও প্রতিরোধের ভাবনা অনেকেই ভাবছেন; কিন্তু এখনও তার পথ খুঁজে পাননি। গণতন্ত্রের আসল মূর্তিটি অপহরণ করে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শিবির যে নকল গণতন্ত্রের মূর্তি সর্বত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তার প্রতিভাস পড়েছে আমাদের উপমহাদেশেও। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই দুটি ধারা অতীতের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি মুক্ত হয়ে আবার রুখে না দাঁড়ালে এই অবস্থার পরিবর্তন নেই। গ্রিক সিটি স্টেটের গণতন্ত্রের যুগ থেকে, রুশ বিপ্লব পর্যন্ত প্রসারিত মানবতার যুদ্ধ আবার শুরু করা না গেলে কুড়ি শতকের হিটলার-মুসোলিনীর মতো একুশ শতকের বুশ, ব্লেয়ার, ডোনাল্ড ট্রাম্পদের উত্থান সহজে রোধ করা যাবে না।
লন্ডন ১৫ জানুয়ারি, রোববার, ২০১৭

No comments:

Post a Comment