সোমবার
সন্ধ্যা ৭টা। চারদিকে সবাই মাঘের প্রচণ্ড শীতে জড়সড়। এমন অবস্থার মধ্যে
শরীরে পাতলা শাড়ির আঁচলটি শিশু সন্তানের শরীরে পেঁচিয়ে জুবুথুবু হয়ে
গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকার একটি স্টুডিওতে ঢুকলেন এক হতদরিদ্র মা।
সকালে ছোট ছেলের স্কুলে ভর্তির জন্য তার ছবি লাগবে। মা ও ছেলের দুজনেরই পা
খালি। শরীরে নামমাত্র পাতলা কাপড় ছাড়া কোনো শীত বস্ত্র নেই মা-ছেলে কারোরই।
স্টুডিওতে এ সংবাদদাতার সাথে আলাপকালে ওই মা ও শিশু ঠকঠক করে কাঁপছিলেন।
সেই সকালে আগের রাতের বাসিভাত খেয়েছেন। সারাদিন তাদের পেটে আর কিছুই
জোটেনি। কষ্ট করে ওই মহিলা বললেন তার নাম ফাতেমা বেগম। নিজের বয়সটা সঠিক
করে বলতে পারেন না। তিনি জানান, উপজেলার ছোটভাকলা ইউনিয়নের হাউলি কেউটিল
এলাকায় রেল লাইনের পাশে বোনের বাড়িতে কোনোমতে তাদের মাথা গোঁজার ঠাই
রয়েছে। নিজের কোন জায়গা জমি বা বাড়ি-ঘর নেই। স্বামী ছলেমান মণ্ডল প্রায় ছয়
বছর আগে ছোট ছেলে সাগরকে তিন মাসের পেটে রেখে তাকে ত্যাগ করে চলে গেছেন।
বেঁচে আছে নাকি মারা গেছেন তাও জানেন না। একসময় তার স্বামীর সংসারে
মোটামুটি ভালই দিন কাটছিল। হঠাৎ কি অপরাধে সংসার ছেড়ে তিনি কোথায় গেলেন
জানেনা। বড় ছেলে আকাশ ও ছোট সাগরকে নিয়ে এক অথৈই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন
তিনি। গরম কোনো কাপড়-চোপর নেই জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘বাড়িতে
দুই-তিনখানা কাঁথা আছে। ওই গুলোই বিছিয়ে ও গায়ে জড়িয়ে কোনমতে রাত কাটাই।
বাইরে গায়ে দেয়ার তেমন কিছু নেই। জুতা সেন্ডেল পাবো কোথায়, প্রায়ই দুই-এক
বেলা না খেয়ে থাকি। মাইনসের (মানুষের) বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে কি আর সব কিছু
মেলে? শরীলে কত অসুখ-বিসুখ কিন্তু টাকার অভাবে ডাক্তারের কাছে যেতে পারি
না।’
তিনি আরো জানান, ‘বড় ছেলেটা গোয়ালন্দ প্রপার হাই স্কুলে এবার ভর্তি
হইছে। ছোটডা বাড়ির কাছে চর বালিয়াকান্দী প্রাইমারি স্কুলে ওয়ানে পড়ে। ছেলে
দুইডার কষ্ট দেখলে বুক ফাইটা কান্দন আসে। ওরা যখন ক্ষিদার জ্বালায়, কান্দে,
তহন তা সইতে না পেরে মনে কয় গলায় দড়ি দিয়া মরি। কিন্তু ওগের (ওদের) কথা
ভাইবা মরবারও পারিনা। এলাকার মেম্বর-চেয়ারম্যান ও নেতাগোরে কাছে কত গেছি,
কেউ পাত্তা দেয় না।’ এ দিকে মা ও ছেলের অসহায়ত্ব দেখে মেসার্স তমা স্টুডিও
মালিক কোনো টাকা না নিয়েই প্রয়োজনীয় ছবি করে দেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত
এলজিইডি বিভাগের একজন কর্মচারী ও এ সংবাদদাতা মহিলার হাতে কিছু অর্থ সহায়তা
দিলে তিনি আবেগে কেঁদে ফেলেন। মহিলার অসহায়ত্বের ব্যাপারে উপজেলা মহিলা ও
শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা আ: ছালাম সিদ্দিকীকে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আমার এই
মুহূর্তে কিছুই করার নেই।’ ছোট ভাকলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ
হোসেনকে মুঠোফোনে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেই ভিজিডি ও ১০ টাকা
মূল্যের চালের কার্ড চূড়ান্ত করলাম। এখনতো ভাই তাকে দেয়ার মতো কিছু নেই।’

No comments:
Post a Comment