Monday, January 2, 2017

নিয়ম না মেনে সহস্রাধিক শিক্ষককে পদোন্নতি

বিভাগীয় পরীক্ষায় ফেল করা ১৫৪ শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে দু’দফা এসব শিক্ষক পদোন্নতি পান। তাদের সঙ্গে তখন আরও ৪৩৩ জনকে পদোন্নতি দিয়ে অধ্যাপক করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, এদের অনেকের চাকরিই স্থায়ী হয়নি। এছাড়া আরও ত্রুটি রয়েছে। এভাবে চাকরিবিধি লংঘন করে ৬ বছরে প্রায় এক হাজার শিক্ষককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণদের পদোন্নতি দেয়ায় বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে সরকারের কোটি কোটি টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। পদোন্নতিপ্রাপ্তরা সবাই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত। অভিযোগ উঠেছে, এ ধরনের পদোন্নতির ঘটনার পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) এবং বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। রহস্যজনক কারণে সিন্ডিকেটের সদস্যরা এ অবৈধ পদোন্নতির পেছনে কাজ করেন।
এ ক্ষেত্রে মোটা অংকের অর্থ বিনিময়ের অভিযোগও আছে। এমনকি এ সিন্ডিকেটের সদস্যরা বদলিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এই অবৈধ পদোন্নতির কারণে পদোন্নতি যোগ্য প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যুগান্তরকে বলেন, এ পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাচিবিক কাজটি করেছে মাউশি। তারা যেভাবে তথ্য উপস্থাপন করেছে, সে অনুযায়ীই পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে যদি কোনো অনিয়ম বা বেআইনি কাজ হয়ে থাকে, তাহলে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর ও ২৩ অক্টোবর দু’দফা ৫৮৭ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। ২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা তালিকা, ফিটলিস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এদের মধ্যে ১৫৪ জন বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। এর আগে ২০১৪ সালের অক্টোবরে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৩৬৭ অধ্যাপকের মধ্যে ২ শতাধিক ফেল করা এবং ১৪৮ জন পদোন্নতির অযোগ্য। শর্তপূরণ না করায় এদের অনেকের চাকরিও তখন স্থায়ী হয়নি। অথচ তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। এছাড়া ২০০৯ সালে সহকারী থেকে যাদের সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল,
তাদের অনেককে আবার ২০১০ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এসব অধ্যাপকের অনেকে আবার নামকরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ, শিক্ষা প্রশাসন ও প্রকল্পের বিভিন্ন পদে কর্মরত আছেন। জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে ৬৪৩ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভূতাপেক্ষভাবে তাদের অনেকেরই চাকরি স্থায়ী করা হয়। অথচ এর আগে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্তরা পরের বছরই অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্য হয়েছেন। এ ধরনের ৪৪৮ জন পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বঞ্চিতদের একটি দৃষ্টান্তের মধ্যে আছেন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব আনারুল হক। ১৪তম বিসিএসের ইতিহাস বিষয়ের এ কর্মকর্তা ২০০১ সালে সহকারী অধ্যাপক এবং ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনসহ পদোন্নতির আবশ্যিক শর্ত তার পূর্ণ আছে। ১০ বছর আগে এ শিক্ষক অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতির জন্য উপযুক্ত হয়েছেন। তার মতো আরও শতাধিক শিক্ষক পদোন্নতি বঞ্চিত বলে জানা গেছে। জানা গেছে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পদোন্নতি কাজ তদারক করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। ওই সময়ে সমিতি বেশি সংখ্যক শিক্ষককে পদোন্নতি দিতে মন্ত্রণালয়কে নানা প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে বাধ্য করে। এর মধ্যে প্রশাসনিক পদ অন্যান্য সব পদ পূরণ হয়ে যাওয়ার পরও কিছু শিক্ষককে অনেকটা ‘হাওয়ার’ ওপর পদোন্নতি দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে সমিতির মহাসচিব শাহেদুল খবীর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ফেল করা বা চাকরি স্থায়ী না হওয়া কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়ে থাকতে পারেন। এ ধরনের বেশিরভাগই জাতীয়করণকৃত কলেজের আত্তীকৃত শিক্ষক। আদালতে মামলার মাধ্যমে রায় নিয়ে কেউ কেউ মানবিক কারণে পদোন্নতির আদেশ পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার প্রমার্জন (ক্ষমা) প্রাপ্ত। আদালতের আদেশ সরকারকে প্রতিপালন করতে হয়। তবে প্রচলিত বিধিবিধানে এটা পারে না। এ ক্ষেত্রে মানবিক দিক দেখা হয়েছে। সদস্যদের স্বার্থ দেখার সাংগঠনিক কাজের বাইরে শিক্ষক পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমিতির কোনো অসৎ মানসিকতা নেই বলে দাবি করেন তিনি। মহাসচিবের বক্তব্যের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা আমেনা বেগম পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে ২০১২ সালে আদালতে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে তিনি পদোন্নতি পান। এই মামলার কারণে ২ বছর অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বন্ধ ছিল। তার পদাংক অনুসরণ করে পরে আরও দু’জন মামলায় পক্ষে রায় পেয়েছেন।
কিন্তু তাদের আজও পদোন্নতি দেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট রুলস (বিএসআর) অনুযায়ী, পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস বাধ্যতামূলক। ক্যাডার পদে প্রবেশের পর এ পরীক্ষার মাধ্যমেই চাকরি স্থায়ী হয়। এছাড়া ৫, ৬ ও ৭ ধারা অনুযায়ী সব ক্যাডারের প্রারম্ভিক পদে নিয়োগ প্রাপ্তদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিসকাল ও সন্তোষজনক চাকরিকাল শেষ করলেই শুধু চাকরি স্থায়ীকরণ হয়। যারা এসব যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবেন তাদের চাকরির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে পরীক্ষা প্রমার্জন (ক্ষমা) সাপেক্ষে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হবেন। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতি প্রাপ্ত হলে ৫ বছর ওই পদে কর্মরত থাকার পরে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রাপ্তির যোগ্য হবেন। কিন্তু এ ধরনের শিক্ষক কোনোভাবেই অধ্যাপক হতে পারবেন না। যারা যোগ্যতা অর্জন করেছেন তারাই শুধু সহকারী অধ্যাপক পদে ৩ বছর ফিডার সার্ভিস পূর্তিতে সহযোগী অধ্যাপক এবং ২ বছর ফিডার সার্ভিস পূর্তিতে অধ্যাপক হতে পারবেন। কিন্তু আইন ভঙ্গ করে ২০০৬ সাল থেকে প্রমার্জিতদের অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। পার্শ্ব (লেটারাল এন্ট্রি) প্রবেশের অর্থাৎ আত্তীকৃত, প্রদর্শক থেকে পদোন্নতিসহ বিভিন্নভাবে শিক্ষা ক্যাডারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। বিধি অনুযায়ী শিক্ষা ক্যাডারের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে যোগদানের তারিখ থেকে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে এ বিধানও মানা হয়নি।

No comments:

Post a Comment