মিয়ানমারের
ক্ষমতাসীন দল ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি’ (এনএলডি) নেত্রী নোবেল বিজয়ী
অং সান সুচি’র বিশেষ দূতের বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। রোহিঙ্গা
সংকট নিয়ে আলোচনা করতে চলতি জানুয়ারিতেই বিশেষ দূত ঢাকায় আসছেন। তিনি
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে নির্ভরযোগ্য
সূত্রে জানা গেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিয়ো মিন্ট থান
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক
অনুবিভাগের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
তাদের মধ্যে বৈঠককালে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত একটি নোট ভারভাল (কূটনৈতিক
পত্র) হস্তান্তর করেন। এই চিঠিতে সুচি’র বিশেষ দূতের ঢাকা সফরের আগ্রহের
কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ দূত ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল
হকের সঙ্গে বৈঠক করতে চান বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা
জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়সূচি চূড়ান্ত
হওয়ার পর সুচি’র বিশেষ দূতের সফরের দিনক্ষণ নিশ্চিত হবে। তবে বিশেষ দূত
জানুয়ারিতেই ঢাকায় আসছেন এই বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত
মিয়ো মিন্ট থানকে গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। তখনই
রাষ্ট্রদূত মৌখিকভাবে জানান যে, সু চি বিশেষ দূত পাঠাতে চান। মিয়ানমারে
অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সামরিক শাসনের পর সু চি’র এনএলডি ক্ষমতায় গেলে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক
মিয়ানমার সফর করেন। এবার সু চি পররাষ্ট্র সচিবের সমকক্ষ একজন কর্মকর্তাকে
বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকা ও ইয়াঙ্গুনের
মধ্যে সম্পর্কে অচলাবস্থার মধ্যে বিশেষ দূতের আসন্ন সফরকে খুবই
তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ঢাকায় একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা
রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, সু চি’র বিশেষ দূতকে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে।
কেননা বাংলাদেশ মনে করে, মিয়ানমার এই দূত পাঠানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের
গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ দূতের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে মিয়ানমারের
পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য এনএলডি নেতা বো বো ও
ইয়াঙ্গুন থেকে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, তারা পার্লামেন্টের বিষয়াদি
দেখাশোনা করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দেখাশোনা করে।
আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ সফরে আগ্রহ ব্যক্ত করেন। জানা
গেছে, ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদা সম্প্রতি বাংলাদেশ
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে
বৈঠককালে তাদের অবহিত করেন যে, সু চি একজন বিশেষ দূত পাঠাতে চান। ঢাকায়
আসার পূর্বে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াঙ্গুনে সু চি’র সঙ্গে বৈঠক
করেছেন। তখন সু চি বিশেষ দূত পাঠানোর প্রস্তাব বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে
পৌঁছে দিতে মারসুদাকে অনুরোধ করেন। ৯ অক্টোবর সীমান্ত চৌকিতে সন্ত্রাসী
হামলায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী ‘বর্ডার গার্ড পুলিশ’ (বিজিপি)-এর ৯ জন
সদস্য নিহত হন। এর জের ধরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু
করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এই অভিযানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে
দমন-পীড়ন শুরু হয়।
রোহিঙ্গাদের হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, নারীদের ধর্ষণসহ
ভয়াবহ নির্যাতনের কারণে সংখ্যালঘু এই মুসলমানরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে
বাংলাদেশে আসতে থাকেন। সাম্প্রতিক সংকট শুরুর পর থেকে প্রায় ৫০ হাজার
রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। আগে থেকে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা
বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। বাংলাদেশ সম্প্রতি সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে
মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানায়। তবে মিয়ানমার বলেছে, বাংলাদেশে মিয়ানমারের
নাগরিক আছেন মাত্র ২ হাজার চারশ’ ১৫ জন। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের কারণে
নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে পড়েছেন। সম্প্রতি
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ১৩ জনসহ ২২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিবৃতি দিয়ে সু চি’র
কড়া সমালোচনা করেছেন।

No comments:
Post a Comment