দেশের
স্মরণকালের ভয়াবহ ব্যাংক কেলেঙ্কারির হোতা হলমার্ক গ্রুপের ব্যাংক থেকে
হাতিয়ে নেয়া প্রায় চার হাজার কোটি টাকার গন্তব্য সম্পর্কে অন্ধকারের রয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংক। এমনকি সোনালী ব্যাংকও জানে না তাদের ব্যাংক থেকে সরিয়ে
নেয়া অর্থ কী কাজে ব্যবহার করেছে আলোচিত এ প্রতিষ্ঠানটি। সোনালী ব্যাংকের
এক সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংক হলমার্ক নামক এ অখ্যাত কোম্পানির এ
পর্যন্ত যে পরিমাণ সম্পদের হিসাব পেয়েছে তার বাজার মূল্য ১০০ কোটি টাকার
ওপরে হবে না। তা-ও আবার এ সম্পদের প্রকৃত মালিকানা নিয়েও ঝামেলা রয়েছে।
এ
কারণে সোনালী ব্যাংক এসব সম্পদ ব্যাংকের আওতায় আনতে পারছে না। জানা গেছে,
হলমার্ক কেলেঙ্কারির প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বের করতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ
বিষয়ে তদন্তও করা হচ্ছে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক
কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, টাকার গন্তব্য সম্পর্কে বিশদ
তদন্ত করলেই বের হয়ে যাবে এ বিপুল টাকা কোথায় গেছে। এতে সোনালী ব্যাংকের
অর্থ আদায় করাও সহজ হতো। কিন্তু ঘটনা ঘটার প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হলেও এ
দিকে কেউ তদন্ত করছে না। শুধু কিভাবে টাকা বের করে নেয়া হয় সে তথ্য বের
করেই আপাতত সন্তুষ্ট রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ দিকে, হলমার্ক গ্রুপের
ব্যবসায়িক স্বার্থে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ইস্যু করা বিভিন্ন বিলের পরিমাণ
শনাক্ত করা হয় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংক এসব বিলের
গ্যারান্টি দিয়েছিল। বিলগুলো কিনেছিল ২৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। হলমার্ক
কেলেঙ্কারি শনাক্ত হওয়ার পর ওইসব বিলের দেনা ইস্যু করা বা অভ্যন্তরীণ বিল
কেনার (আইবিপি) দায় সোনালী ব্যাংক নিতে গড়িমসি করে। কিন্তু দুর্নীত দমন
কমিশন থেকে বলে দেয়া হয়,
হলমার্ক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বেনামি বা
অস্তিত্বহীন কোম্পানির নামে সোনালী ব্যাংকের ইস্যু করা বা গ্যারান্টি দেয়া
বিলের দায় সোনালী ব্যাংককেই নিতে হবে। পরে ব্যাংকগুলোর আবেদনের
পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি হস্তক্ষেপ করে। বছর খানেক আগে এক
ব্যাংকার্স সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ভুয়া বিলের দায় সোনালী ব্যাংককেই বহন
করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। তখন বলা হয় ভুয়া বিলের দায় সোনালী ব্যাংক বহন না
করলে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত সোনালী ব্যাংকের হিসাব থেকে সমন্বয় করবে
বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নির্দেশনা পরিপালন না করায় এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর এক
হাজার তিন শতাধিক বিলের বিপরীতে প্রায় সাড়ে ৮০০ টাকা সোনালী ব্যাংকের হিসাব
থেকে অন্য ব্যাংকের হিসেবে সমন্বয় করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অগ্রণী
ব্যাংকের দেড় শতাধিক বিলের বিপরীতে আরো ১০০ কোটি টাকা সমন্বয় করার আবেদন
অনিষ্পত্তি অবস্থায় রয়েছে। শিগিগিরই বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের হিসেব
থেকে সমন্বয় করে দেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের
দায়িত্বশীল এক সূত্র জানিয়েছে, বহুল আলোচিত সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথে
জড়িতদের শনাক্ত করার পাশাপাশি টাকার গন্তব্য স্থল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া
অতীব জরুরি। কেননা,
ব্যাংকের টাকা জনগণের আমানত। ব্যাংকের টাকা খোয়া যাওয়ার
অর্থ হলো জনগণের অর্থ খোয়া যাওয়া। এ অর্থ আদায় করার কৌশল নির্ধারণ করাই
এখন সময়ের দাবি। ওই সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকের আলোচিত তিনটি শাখা,
রূপসী বাংলা, আগারগাঁও ও গুলশান শাখা থেকেই বেরিয়ে যায় এ অর্থ। এ তিনটি
শাখা থেকে অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে তদন্ত করলেই বেরিয়ে যেত হলমার্ক গ্রুপ
কোথায় টাকা লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে গত তিন বছর কেন্দ্রীয়
ব্যাংক থেকে এ দিকে পা বাড়ায়নি। ফলে আড়ালেই থেকে যায় বহুল আলোচিত এ ব্যাংক
কেলেঙ্কারির প্রকৃত সুবিধাভোগীরা। এ পরিস্থিতিতে জনগণের অর্থ উদ্ধার করা
কঠিন হয়ে পড়েছে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের এক
দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, হলমার্কের কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করা এখন কঠিন
হয়ে পড়েছে। কেননা, ইতোমধ্যে তারা যে ৪৯ একর জমির কাগজপত্র বন্ধক হিসেবে
সোনালী ব্যাংকের কাছে জমা দিয়েছে, তার বেশির ভাগই ভুয়া। সোনালী ব্যাংকের এক
তদন্তে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোনালী ব্যাংকের একটি
টিম হলমার্কের বন্ধক দেয়া জমির প্রকৃত মালিকানা, এর বাজার মূল্য
যাচাই-বাছাই করে। কিন্তু হলমার্কের বন্ধক দেয়া বেশির ভাগ জমির কাগজপত্র ঠিক
নেই। জমির বড় অংশই অর্পিত সম্পত্তি ও সরকারি খাস জমি, স্থানীয় ভূমি অফিস
থেকে হলমার্কের নামে নামজারি হয়নি। নামজারির জন্য হলমার্ক সাভার উপজেলার
সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর আবেদন করলে তদন্তে দেখা যায় ওইসব জমির বৈধ
মালিক হলমার্ক গ্রুপ নয়। বেশির ভাগই বিভিন্ন ব্যক্তির নামে।
তবে সেগুলো
ভুয়া দলিল করে নিজেদের জমি বলে দাবি করছে হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংকের
তদন্তে দেখা দেয়া, হলমার্ক গ্রুপ যেসব জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছে,
তার মধ্যে অনেক অর্পিত সম্প্রতি এবং সরকারি খাস জমি। সাভার উপজেলার কান্দি
বৈলারপুর মৌজার বন্ধক দেয়া জমির মধ্যে প্রায় ছয় একর জমি খাস এবং প্রায় এক
একর জমি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে শনাক্ত করা হয়। নন্দীখালী মৌজার বন্ধকী
জমির মধ্যে সাড়ে তিন একর খাস জমি এবং এক একর অর্পিত সম্পত্তি। ভারারী মৌজার
প্রায় চার একর খাস জমি রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের কাছে হলমার্ক গ্রুপ সাভার
বাজারের কাছের যে জমি বন্ধক দিয়েছে তার মালিক হচ্ছে ঢাকা জেলা পরিষদ। ওই
জমি বন্ধকীর ব্যাপারে জেলা পরিষদ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছে। বংশী নদীর পাশে
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমিও বন্ধক দিয়ে ঋণ নিয়েছে হলমার্ক গ্রুপ। প্রসঙ্গত,
২০১২ সালে অখ্যাত কোম্পানি হলমার্কের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে জালিয়াতির
মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এ কেলেঙ্কারির
এমডিকে অপসারণ করা হয়। শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে
দুদক থেকে। কিন্তু এ অর্থের কারা সুবিধাভোগী তাদের বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য
বের করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক বা দুদক থেকে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পুরো
ব্যবসা-বাণিজ্যেই স্থবিরতা নেমে এসেছিল।

No comments:
Post a Comment