‘আকাশে
হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ’ সেই পাহাড়ের ঝর্ণায় আমি উদাও হয়ে রই’ বিখ্যাত
এই নজরুল সঙ্গীতটি সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক এলাকার প্রাকৃতিক সোন্দর্য্য দেখে
বিমোহিত কবি নজরুল ১৯২৫ সালে ঐ স্থানে বসেই রচনা করেছিলেন। আর প্রকৃতির যে
অপরূপ সোন্দর্য দেখে বিদ্রোহী কবি রোমান্টিক হয়ে উঠেন সেখানে এসে যে যেকোনো
দর্শনার্থীই মুগ্ধ হবেন তাতে কি কোন সন্দেহ থাকে? তাইতো প্রকৃতির এই রূপ
দেখতে এখানে সারাবছর ছুটে আসেন অসংখ্য দর্শনার্থী। ব্যতিক্রম হয়নি এবছরও।
সরেজমিনে ইকোপার্কে ঘুরে দেখা গেছে এবছরও সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে
দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে। এখানে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা যুবক মো: আরিফ ও মো:
সোহেল বলেন, সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে আসতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। আরিফ বলেন,
এখানে না আসলে সত্যিই একটা কিছু মিস হয়ে যেত। শহরের একঘেঁয়ে কর্মব্যস্ত
জীবনে যখন নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে উঠেছিলাম ঠিক তেমনি সময়ে ইকোপার্কে এসে
পাহাড়, ঝর্ণা, লেক ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে পশ্চিমের সাগর দেখে যান নতুন
করে বাঁচার শক্তি পেলাম। তার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ঝর্ণা ও সবুজ পাহাড়ের
প্রকৃতি। অর্কিড হাউস ও গোলাপ বাগানটিও দেখার মতো। চট্টগ্রামের চন্দনাইশের
বাসিন্দা চট্টগ্রাম নাসিরাবাদ মহিলা কলেজের ছাত্রী আছমা আক্তার বলেন,
সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের নাম অনেক শুনেছিলাম। কিন্তু এর আগে আসা হয়নি।
এবার
হঠাৎ সুযোগ পেয়ে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে পরিকল্পনা করে ফেললাম
সীতাকুণ্ড ইকোপার্ক দেখব। যেই ভাবা সেই কাজ। মঙ্গলবার সবাই মিলে চলে এলাম।
এখানে এসে কেমন লাগছে প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে আছমা বলেন, খুবই
ভালো। নির্জন সবুজ পাহাড়ের মাঝে ঝর্ণা বিরামহীন ঝরে পড়ছে। আছে প্রাকৃতিক
লেক, আছে নাম জানা অজানা অসংখ্য প্রকার বৃক্ষরাজি, বাতাবাহার, গোলাপ বাগান,
অর্কিড হাউজ, ঔষধি গাছ। গেইটের কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের
মুরালটিও চমৎকার। সেখানেই ছোটদের জন্য গড়ে তোলা শিশুপার্কের দোলনায় চড়েছি
আমিও। অপরূপ লেগেছে পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে। এই টাওয়ার থেকে সোজা পশ্চিমে
তাকালে চোখে পড়ে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলের নীল পানিরাশি। আর
চারিদিকে যেন পাহাড় আর মেঘের মিতালী! আছমার মতে, যারা এখনো সীতাকুণ্ড
ইকোপার্কে আসেননি তারা যে কত যে কিছু মিস করছেন তা বলে বোঝানো যাবে না।
ইকোপার্কের ইজারাদার মো: সাহাব উদ্দিন বলেন, প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ এখানে
এলেই মুগ্ধ হবেন। এখানে রয়েছে সুপ্তধারা, সহ¯্রধারা ঝর্ণা, মিনি শিশুপার্ক,
গোলাপ চত্বর, অর্কিড হাউস, প্রাকৃতিক লেক, ৩টি ভ্যালি ব্রিজ, ১৫টির মত
পিকনিক স্পট, দর্শনার্থীদের বসার জন্য চেয়ার, গোলচত্বর, সুবিশাল গাড়ি
পার্কিং এরিয়া, শিমুল তলী ব্রীজ, নজরুলের মুরাল, গোলাপ বাগান, পদ্মপুকুর,
পর্যবেক্ষন টাওয়ারসহ বহু কিছু। পাহাড়ের নির্জন স্থানে গেলেই দেখা মেলে
বানর, হনুমান, বন মোরগ, মেছো বাঘ, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণসহ হাজারো রকম
পাখ-পাখালির। ফলে এসব দেখে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। এখন পর্যটন মৌসুম।
তাই দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি আমরা। আমাদের
কর্মীরা সারাদিন পাহাড়ে কড়া পাহারা দিচ্ছে। ফলে যারা এখানে আসেন তারা
নির্বিঘ্নে প্রাকৃতিক সোন্দর্য অবলোকন করে ফিরে যেতে পারেন। প্রসঙ্গত, ২০০১
সালের ১৭ জানুয়ারী সীতাকুণ্ডের ফকিরহাট এলাকায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনা ১৯৯৬ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেন সীতাকুণ্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন ও
ইকোপার্ক। সেই থেকে এখানে প্রকৃতির রূপ ও জীববৈচিত্র্য দেখতে প্রতিদিনই
ছুটে আসে অগণিত দর্শনার্থী। তবে যেকোন ছুটির দিনে এই ভিড় জনসমুদ্রে পরিণত
হয়। এবারো ব্যতিক্রম হয়নি। এ মৌসুমেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এ স্থানটি
দর্শনে ছুটে আসছেন অগণিত দর্শনার্থী।

No comments:
Post a Comment