Saturday, January 28, 2017

ইতিহাসের অনন্য সাক্ষী সামরিক জাদুঘর

যারা হাসিমুখে দেশের স্বাধীনতার জন্য বিসর্জন দিয়েছেন প্রাণ, সেসব বীরের বীরত্বের কাহিনী ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অমর করে রাখতে রাজধানীতে স্থাপন করা হয়েছে সামরিক জাদুঘর। বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটারের পশ্চিম পাশে এ জাদুঘরের অবস্থান। সামরিক বাহিনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য ও মুক্তিযুদ্ধে তাদের কর্মকাণ্ড এবং বিশ্বে বিভিন্ন মিশনের সফলতা ও অস্ত্রের প্রদর্শনী হয়েছে এখানে।
জাদুঘরের বিস্তৃত মাঠ পেরিয়ে দ্বিতল ভবন। মাঠের সীমানা দিয়ে পুরনো ট্যাংক, বিমান, ছোট জাহাজ সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর সব কর্মকাণ্ডের আলোকচিত্র, ব্যবহৃত যুদ্ধাস্ত্র এবং ছোটবড় গাড়ি। দ্বিতল ভবনজুড়েই রয়েছে বিভিন্ন প্রদর্শনী। মুক্তিযুদ্ধের পর তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন যানবাহন এবং অস্ত্র এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল, সেক্টর কমান্ডারদের পোট্রেট, কিছু ব্যবহার্য জিনিস, সশস্ত্র বাহিনীর যেসব ব্যক্তি মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন তাদের পোট্রেট ও সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। রয়েছে সাবেক সব সেনাপ্রধানের তৈলচিত্র, বীরশ্রেষ্ঠ-বীর প্রতীকদের নামের তালিকা। দেখতে পাবেন নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তার জীবনবৃত্তান্ত পিলখানা শহীদ কর্নারে। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী যে জিপটি ব্যবহার করে বিভিন্ন যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করতেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে উদ্ধারের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত গাড়িও দেখা যাবে এখানে। জাদুঘরের নিচতলায় পশ্চিম পাশের কক্ষের একাংশে সম্প্রতি স্থাপন করা হয়েছে মুজিব কর্নার। যেখানে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত অনেক আলোকচিত্র রয়েছে। এ ছাড়া ‘ইতিহাস দর্পণ’ নামে একটি আইটি কর্নার আছে এ জাদুঘরে।
এখানে দু’টি কক্ষের মধ্যে একটিতে ১১টি আকর্ষণীয় টাচ স্কিন কম্পিউটারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধসম্পর্কিত চলচ্চিত্র ও দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে করণীয় এবং অন্যটিতে বড় স্ক্রিনে ‘১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ নামে এক ঘণ্টা ৫০ মিনিটের চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা হয়। ভবনের দোতলায় রয়েছে আটটি গ্যালারি। প্রথম গ্যালারিতে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে কুঠার, তীর, ধনুকসহ পুরনো অস্ত্রশস্ত্র। দ্বিতীয় গ্যালারিতে রয়েছে ডিবিবিএল ও এসবিবিএল গান, বিশেষ ব্যক্তিদের ব্যবহৃত হাতিয়ারসহ যুদ্ধাস্ত্র। তৃতীয় গ্যালারিতে রয়েছে এলএমজি, এসএমজিসহ মাঝারি অস্ত্র। মর্টার, স্ক্যালো, এইচএমজিসহ ভারি অস্ত্র সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শন করা হচ্ছে চতুর্থ গ্যালারিতে। পঞ্চম গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর শীত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যাজ, ফিতাসহ অনেক কিছু। সম্প্রতি ছয় বছরের ছেলে রুবেলকে নিয়ে জাদুঘর পরিদর্শনে যান রিয়াদ হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ছোটবেলায় বাবার মুখে যুদ্ধের কাহিনী অনেক শুনতাম। সেসব কথা মনে পড়লেই শ্রদ্ধা আর গর্বে মন ভরে ওঠে। তাই আমি আমার ছেলেকেও সেসব বীর আর ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করাতে নিয়ে এসেছি। আমার সন্তানও যেন তাদের মতো বীর হয়ে বড় হয়। ১৯৮৭ সালে রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে জাদুঘরটি প্রথম প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে এটি বিজয় সরণিতে এটি স্থানান্তর করা হয়। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এ জাদুঘরটি প্রায় ১০ একর জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অদূরে অবস্থিত।

No comments:

Post a Comment