মো.
মনিরুল ইসলাম। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার। জঙ্গিবাদ দমনে
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি)
প্রধান। পুলিশে নবগঠিত এ ইউনিটের স্বপ্নদ্রষ্টাও তিনি। জঙ্গিবাদসহ রাজধানীর
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ পুলিশ কর্মকর্তার আকাশচুম্বী সাফল্য রয়েছে। দেশের
গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও তিনি পরিচিত। পুলিশের এ কর্মকর্তার সহধর্মিণী
শায়লা ফারজানা বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত।
সদাহাস্য
মনিরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার তার কার্যালয়ে যুগান্তরকে সাক্ষাৎকার দেন। এতে
তিনি জঙ্গি দমনে সরকার নেয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি জঙ্গি
দমনে নিজের ভাবনার কথাও জানান। তিনি বলেন, জঙ্গিদের দ্রুত বিচারের আওতায়
আনতে হলে জরুরি ভিত্তিতে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে
সফল এ পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক যুগান্তরের অপরাধ বিভাগের
প্রধান মোয়াজ্জেম হোসেন নান্্নু।
যুগান্তর : গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা হিসেবে আপনার কাজ ছিল ঢাকা মহানগরের অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করা। এক্ষেত্রে আপনি কি নিজেকে শতভাগ সফল বলে মনে করেন?
মনিরুল : শতভাগ সফল বলা যাবে না। তবে অপরাধীদের গ্রেফতার ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অনেক সফলতা রয়েছে।
যুগান্তর : গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদ দমনে আপনাকে বিশেষ মনোযোগী হতে দেখা যায়। এ কাজ করতে গিয়ে আপনার নানা তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতার দু’একটি ঘটনা সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও জানেন। হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করার পেছনের কারণ কী?
মনিরুল : বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশে যোগদানের পর জঙ্গিবাদ নিয়ে আমি একটু জানার চেষ্টা করতাম। ২০০৪-২০০৫ সালে রাজশাহী পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত অবস্থায় সেখানে যারা প্রশিক্ষণরত অফিসার ছিলেন তাদের পড়াতে গিয়ে নিজেও জঙ্গিবাদ দমনে আকৃষ্ট হই। এরও আগে ঝিনাইদহে চাকরিকালীন সেখানে আরেক ধরনের জঙ্গিবাদ ‘চরমপন্থী’ দমনে কাজ করেছি। সেখান থেকেই সংঘবদ্ধ এ অপরাধ দমনের দিকে ঝোঁক বাড়ে। এছাড়া ২০০৯ সালে আমি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে যোগ দেয়ার পরই জঙ্গি অপতৎপরতার কিছু লক্ষণ টের পাচ্ছিলাম। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেল, এর আগে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা জামিনে বের হয়ে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বড় ধরনের কিছু করার চেষ্টা করছে। যেহেতু বিষয়টি মতাদর্শিক। তাই সুযোগ পেলেই এরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই গোয়েন্দা পুলিশ জঙ্গিবাদ দমনে কিছু ভূমিকা রাখে।
যুগান্তর : জঙ্গিবাদ দমন নিয়ে শুরু থেকে অন্য একটি সংস্থা কাজ করছে। তাদেরও অনেক সাফল্য রয়েছে। একই বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আপনার বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে রূপ নেয় ...
মনিরুল : জঙ্গি গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের অনেক সাফল্য রয়েছে। শুরু থেকেই সংস্থাটি জঙ্গিবাদ দমনে অনেক কাজ করেছে। তবে অভিযান পরিচালনা ছাড়া র্যাব কোনো মামলা (বিশেষ নির্দেশনা ব্যতীত) তদন্ত করে না। এক্ষেত্রে ডিবি এ ধরনের সিরিয়াস ক্রাইমের মামলা বা অর্গানাইজড ক্রাইমের মামলা তদন্ত করে। তাই আমি নিজে থেকেই জঙ্গিদের কার্যক্রম অনুসন্ধানসহ অভিযান পরিচালনায় ডিবি অফিসারদের অনুপ্রাণিত করি। এছাড়া ডিএমপি রুলস-২০০৬ অনুযায়ী তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়েই আমি জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করতে থাকি।
যুগান্তর : আপনার নেতৃত্বে কিছু সাফল্য এলে সরকার জঙ্গিবাদ দমনে আলাদা ইউনিট (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশানল ইউনিট) গঠন করে। ওই ইউনিটের নেতৃত্ব দেয়ার পর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে আপনি ‘স্বপ্নপূরণ’ হওয়ার কথা লিখেছিলেন। আপনার কক্সিক্ষত সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কি?
মনিরুল : স্বপ্নপূরণের বিষয়টি আপেক্ষিক। তবে জঙ্গিবাদ দমনে সিটিটিসি ইউনিটের সদস্যরা অনেক পরিশ্রম করছেন। বেশ ক’টি অভিযানে সফলতার পরিচয় দিয়ে এরই মধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ ইউনিটের সদস্যরা বহির্বিশ্বেও ইউনিটের নাম ছড়িয়ে দিয়েছে। এজন্য আমি ইউনিটের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানাব। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়কে, যারা আমার প্রতি আস্থা রেখেছিলেন।
যুগান্তর : তাহলে বলা যায়, নিজ উদ্যোগেই আপনি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করেন। আর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবারের পুলিশ সপ্তাহে আপনিসহ আপনার টিমের ২১ জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ...
মনিরুল : বলতে পারেন, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকেই এ কাজ করার তাগিদ অনুভব করি। আমি কৃতজ্ঞ আমার টিমের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি। কারণ এটি একটি টিমওয়ার্ক। সবাই চেষ্টা না করলে এটি সম্ভব ছিল না।
যুগান্তর : আপনারা জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন। অভিযানে মাস্টারমাইন্ডদের অনেকেই মারা যাচ্ছে। অনেকে গ্রেফতার হচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার জামিনে ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকমতো মনিটরিং না করার কারণে গ্রেফতারের পর আবার জামিন নিয়ে জঙ্গিরা বেরিয়ে যাচ্ছে ...
মনিরুল : জামিন তো পেতেই পারে। জামিন একজন নাগরিকের আইনগত অধিকার। তবে এসব মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা দরকার। আলাদা ট্রাইব্যুনাল করা গেলে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্তরা দ্রুত বিচারের আওতায় আসবে বলে আমি মনে করি। এজন্য নতুন আইন করার প্রয়োজন নেই। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।
যুগান্তর : প্রথমে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কাজ শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে দেশের প্রতিটি জেলায় এর ব্যপ্তি ঘটে। নবগঠিত এ ইউনিট পরিচালনা করতে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়ের সহায়তা নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?
মনিরুল : সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের ভেতর আটতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এখন টাইলসসহ অন্য কাজ চলছে। এটি শেষ হলে পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন নিয়ে কাজ শুরু করবে সিটিটিসি।
যুগান্তর : একাধারে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশেষ এ ইউনিটের কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন অভিযানের ব্যাপারে প্রায় প্রতিদিনই আপনাকে প্রেস ব্রিফিং করতে হয়। প্রতিদিনই টেলিভিশন এবং পত্রিকায় আপনার ছবি ছাপা হওয়ায় আপনি একপ্রকার মিডিয়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। দেশ-বিদেশের মানুষ আপনাকে চেনে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মনিরুল : এগুলো সবই আপনাদের জন্য। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। আমি শুধু কাজ বুঝি।
যুগান্তর : আপনার অফিসে বড় আকৃতির সাউন্ড সিস্টেম জানান দেয়, আপনি একজন সঙ্গীতপ্রেমী। জঙ্গিবাদ দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে আপনি গান শোনার সময় পান?
মনিরুল : আমি গানপাগল একজন মানুষ। গান ছাড়া আমার ঘুম আসে না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গান শুনি। অফিসে কাজের ফাঁকে যখনই সময় পাই গান শুনে কিছুটা ক্লান্তি দূর করি। গান ছাড়া আমি বই পড়তেও খুব ভালোবাসি। যখনই সময় পাই, তখনই দেশ-বিদেশের নানা লেখকের বই পড়ি।
যুগান্তর : এতে কাজের কোনো সমস্যা হয় না?
মনিরুল : আমার অফিস পাবলিক অফিস না। এখানে যে কারও আসার সুযোগ কম।
যুগান্তর : আপনার পছন্দের শিল্পী কারা?
মনিরুল : আমি ক্লাসিক গান পছন্দ করি। সেক্ষেত্রে মেহেদি হাসান, গোলাম আলীর গজল আমার খুব প্রিয়। এছাড়া মান্না দে’র গান শুনি। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে ভালো লাগে। প্রতি রাতে অদিতী মহসীনের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত না শুনলে ঘুম আসতে চায় না।
যুগান্তর : আপনি কি মনে করেন, আপাতত বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে মুক্ত?
মনিরুল : জঙ্গিবাদ আসলে একটি আদর্শিক সংগঠন। আমি মনে করি, এ মতাদর্শের একজন থাকলেও বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সেই অর্থে আমি ঝুঁকিমুক্ত বলব না।
যুগান্তর : যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন এবং এ নিয়ে আপনাকে প্রচুর ব্যস্ত থাকতে হয়। পরিবারকে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কোনো অভিযোগ আছে কি?
মনিরুল : যেহেতু আমার স্ত্রীও একজন সরকারি কর্মকর্তা, তাই তিনি আমার বিষয়টি বোঝেন। এ কারণে সমস্যা খুব একটা হয় না। দু’জনে মিলেই সময় বের করে সে সময়টুকু সন্তানদের দেই।
যুগান্তর : পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আপনি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি আপনি কীভাবে নিশ্চিত করেন?
মনিরুল : আমি যেহেতু দেশের জন্য কাজ করি, তাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়টি আমার ভাবতে হয়। তবে নিরাপত্তার বিষয়ে আমি আমার সন্তানদের কিছু টিপস দেই।
যুগান্তর : যুগান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
মনিরুল : আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে এবং যুগান্তরের সব পাঠককে শুভেচ্ছা।
যুগান্তর : আপনার তো দুটি সন্তান, তারা কী করছে?
মনিরুল : আমার বড় সন্তান মেয়ে। সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছেলেটি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। (দুই সন্তানের নাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হল না)।
যুগান্তর : যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
মনিরুল : যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তাদের জন্য আমার প্রথম বার্তা হবে, এটি ধর্মের কোনো পথ নয়। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। তারা ইসলামের ক্ষতি করছে, ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা দিচ্ছে। তরুণ সমাজকে ভুল বুঝিয়ে বিপথে নিচ্ছে। খুন-খরাবিসহ সম্পদের ক্ষতি করছে। অর্থাৎ তারা তিন ধরনের ক্রাইম করছে। তাদের প্রতি আমার বার্তা হল, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ধর্মীয় চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা এ পথ থেকে সরে আসুক। আর নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান হল- দেশকে জানতে হবে, মাতৃভূমিকে জানতে হবে। স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে হবে। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। এটা করা গেলে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
যুগান্তর : গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা হিসেবে আপনার কাজ ছিল ঢাকা মহানগরের অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করা। এক্ষেত্রে আপনি কি নিজেকে শতভাগ সফল বলে মনে করেন?
মনিরুল : শতভাগ সফল বলা যাবে না। তবে অপরাধীদের গ্রেফতার ও চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অনেক সফলতা রয়েছে।
যুগান্তর : গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদ দমনে আপনাকে বিশেষ মনোযোগী হতে দেখা যায়। এ কাজ করতে গিয়ে আপনার নানা তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে। সেসব অভিজ্ঞতার দু’একটি ঘটনা সংবাদমাধ্যমের কর্মীরাও জানেন। হঠাৎ করেই জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করার পেছনের কারণ কী?
মনিরুল : বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশে যোগদানের পর জঙ্গিবাদ নিয়ে আমি একটু জানার চেষ্টা করতাম। ২০০৪-২০০৫ সালে রাজশাহী পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত অবস্থায় সেখানে যারা প্রশিক্ষণরত অফিসার ছিলেন তাদের পড়াতে গিয়ে নিজেও জঙ্গিবাদ দমনে আকৃষ্ট হই। এরও আগে ঝিনাইদহে চাকরিকালীন সেখানে আরেক ধরনের জঙ্গিবাদ ‘চরমপন্থী’ দমনে কাজ করেছি। সেখান থেকেই সংঘবদ্ধ এ অপরাধ দমনের দিকে ঝোঁক বাড়ে। এছাড়া ২০০৯ সালে আমি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশে যোগ দেয়ার পরই জঙ্গি অপতৎপরতার কিছু লক্ষণ টের পাচ্ছিলাম। গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেল, এর আগে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা জামিনে বের হয়ে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা বড় ধরনের কিছু করার চেষ্টা করছে। যেহেতু বিষয়টি মতাদর্শিক। তাই সুযোগ পেলেই এরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গিয়েই গোয়েন্দা পুলিশ জঙ্গিবাদ দমনে কিছু ভূমিকা রাখে।
যুগান্তর : জঙ্গিবাদ দমন নিয়ে শুরু থেকে অন্য একটি সংস্থা কাজ করছে। তাদেরও অনেক সাফল্য রয়েছে। একই বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আপনার বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে রূপ নেয় ...
মনিরুল : জঙ্গি গ্রেফতার ও অস্ত্র উদ্ধারে র্যাবের অনেক সাফল্য রয়েছে। শুরু থেকেই সংস্থাটি জঙ্গিবাদ দমনে অনেক কাজ করেছে। তবে অভিযান পরিচালনা ছাড়া র্যাব কোনো মামলা (বিশেষ নির্দেশনা ব্যতীত) তদন্ত করে না। এক্ষেত্রে ডিবি এ ধরনের সিরিয়াস ক্রাইমের মামলা বা অর্গানাইজড ক্রাইমের মামলা তদন্ত করে। তাই আমি নিজে থেকেই জঙ্গিদের কার্যক্রম অনুসন্ধানসহ অভিযান পরিচালনায় ডিবি অফিসারদের অনুপ্রাণিত করি। এছাড়া ডিএমপি রুলস-২০০৬ অনুযায়ী তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়েই আমি জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করতে থাকি।
যুগান্তর : আপনার নেতৃত্বে কিছু সাফল্য এলে সরকার জঙ্গিবাদ দমনে আলাদা ইউনিট (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশানল ইউনিট) গঠন করে। ওই ইউনিটের নেতৃত্ব দেয়ার পর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে আপনি ‘স্বপ্নপূরণ’ হওয়ার কথা লিখেছিলেন। আপনার কক্সিক্ষত সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কি?
মনিরুল : স্বপ্নপূরণের বিষয়টি আপেক্ষিক। তবে জঙ্গিবাদ দমনে সিটিটিসি ইউনিটের সদস্যরা অনেক পরিশ্রম করছেন। বেশ ক’টি অভিযানে সফলতার পরিচয় দিয়ে এরই মধ্যে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এ ইউনিটের সদস্যরা বহির্বিশ্বেও ইউনিটের নাম ছড়িয়ে দিয়েছে। এজন্য আমি ইউনিটের সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানাব। সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞতা জানাই আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়কে, যারা আমার প্রতি আস্থা রেখেছিলেন।
যুগান্তর : তাহলে বলা যায়, নিজ উদ্যোগেই আপনি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করেন। আর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এবারের পুলিশ সপ্তাহে আপনিসহ আপনার টিমের ২১ জনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে ...
মনিরুল : বলতে পারেন, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকেই এ কাজ করার তাগিদ অনুভব করি। আমি কৃতজ্ঞ আমার টিমের প্রত্যেক সদস্যের প্রতি। কারণ এটি একটি টিমওয়ার্ক। সবাই চেষ্টা না করলে এটি সম্ভব ছিল না।
যুগান্তর : আপনারা জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালাচ্ছেন। অভিযানে মাস্টারমাইন্ডদের অনেকেই মারা যাচ্ছে। অনেকে গ্রেফতার হচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকে আবার জামিনে ছাড়াও পেয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকমতো মনিটরিং না করার কারণে গ্রেফতারের পর আবার জামিন নিয়ে জঙ্গিরা বেরিয়ে যাচ্ছে ...
মনিরুল : জামিন তো পেতেই পারে। জামিন একজন নাগরিকের আইনগত অধিকার। তবে এসব মামলার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করা দরকার। আলাদা ট্রাইব্যুনাল করা গেলে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্তরা দ্রুত বিচারের আওতায় আসবে বলে আমি মনে করি। এজন্য নতুন আইন করার প্রয়োজন নেই। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ট্রাইব্যুনালের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।
যুগান্তর : প্রথমে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় কাজ শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে দেশের প্রতিটি জেলায় এর ব্যপ্তি ঘটে। নবগঠিত এ ইউনিট পরিচালনা করতে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের শীর্ষপর্যায়ের সহায়তা নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?
মনিরুল : সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের ভেতর আটতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এখন টাইলসসহ অন্য কাজ চলছে। এটি শেষ হলে পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন নিয়ে কাজ শুরু করবে সিটিটিসি।
যুগান্তর : একাধারে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বিশেষ এ ইউনিটের কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন অভিযানের ব্যাপারে প্রায় প্রতিদিনই আপনাকে প্রেস ব্রিফিং করতে হয়। প্রতিদিনই টেলিভিশন এবং পত্রিকায় আপনার ছবি ছাপা হওয়ায় আপনি একপ্রকার মিডিয়া ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। দেশ-বিদেশের মানুষ আপনাকে চেনে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মনিরুল : এগুলো সবই আপনাদের জন্য। এখানে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। আমি শুধু কাজ বুঝি।
যুগান্তর : আপনার অফিসে বড় আকৃতির সাউন্ড সিস্টেম জানান দেয়, আপনি একজন সঙ্গীতপ্রেমী। জঙ্গিবাদ দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে আপনি গান শোনার সময় পান?
মনিরুল : আমি গানপাগল একজন মানুষ। গান ছাড়া আমার ঘুম আসে না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে গান শুনি। অফিসে কাজের ফাঁকে যখনই সময় পাই গান শুনে কিছুটা ক্লান্তি দূর করি। গান ছাড়া আমি বই পড়তেও খুব ভালোবাসি। যখনই সময় পাই, তখনই দেশ-বিদেশের নানা লেখকের বই পড়ি।
যুগান্তর : এতে কাজের কোনো সমস্যা হয় না?
মনিরুল : আমার অফিস পাবলিক অফিস না। এখানে যে কারও আসার সুযোগ কম।
যুগান্তর : আপনার পছন্দের শিল্পী কারা?
মনিরুল : আমি ক্লাসিক গান পছন্দ করি। সেক্ষেত্রে মেহেদি হাসান, গোলাম আলীর গজল আমার খুব প্রিয়। এছাড়া মান্না দে’র গান শুনি। ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনগীতি শুনতে ভালো লাগে। প্রতি রাতে অদিতী মহসীনের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত না শুনলে ঘুম আসতে চায় না।
যুগান্তর : আপনি কি মনে করেন, আপাতত বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে মুক্ত?
মনিরুল : জঙ্গিবাদ আসলে একটি আদর্শিক সংগঠন। আমি মনে করি, এ মতাদর্শের একজন থাকলেও বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত নয়। সেই অর্থে আমি ঝুঁকিমুক্ত বলব না।
যুগান্তর : যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন এবং এ নিয়ে আপনাকে প্রচুর ব্যস্ত থাকতে হয়। পরিবারকে তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের কোনো অভিযোগ আছে কি?
মনিরুল : যেহেতু আমার স্ত্রীও একজন সরকারি কর্মকর্তা, তাই তিনি আমার বিষয়টি বোঝেন। এ কারণে সমস্যা খুব একটা হয় না। দু’জনে মিলেই সময় বের করে সে সময়টুকু সন্তানদের দেই।
যুগান্তর : পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আপনি সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি আপনি কীভাবে নিশ্চিত করেন?
মনিরুল : আমি যেহেতু দেশের জন্য কাজ করি, তাই দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তার বিষয়টি আমার ভাবতে হয়। তবে নিরাপত্তার বিষয়ে আমি আমার সন্তানদের কিছু টিপস দেই।
যুগান্তর : যুগান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।
মনিরুল : আমার পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে এবং যুগান্তরের সব পাঠককে শুভেচ্ছা।
যুগান্তর : আপনার তো দুটি সন্তান, তারা কী করছে?
মনিরুল : আমার বড় সন্তান মেয়ে। সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছেলেটি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। (দুই সন্তানের নাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ করা হল না)।
যুগান্তর : যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?
মনিরুল : যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তাদের জন্য আমার প্রথম বার্তা হবে, এটি ধর্মের কোনো পথ নয়। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। তারা ইসলামের ক্ষতি করছে, ইসলাম সম্পর্কে মানুষের মনে বিরূপ ধারণা দিচ্ছে। তরুণ সমাজকে ভুল বুঝিয়ে বিপথে নিচ্ছে। খুন-খরাবিসহ সম্পদের ক্ষতি করছে। অর্থাৎ তারা তিন ধরনের ক্রাইম করছে। তাদের প্রতি আমার বার্তা হল, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ধর্মীয় চেতনা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা এ পথ থেকে সরে আসুক। আর নতুন প্রজন্মের প্রতি আমার আহ্বান হল- দেশকে জানতে হবে, মাতৃভূমিকে জানতে হবে। স্বাধীনতার ইতিহাস জানতে হবে। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। এটা করা গেলে জঙ্গিরা কোণঠাসা হয়ে পড়বে।

No comments:
Post a Comment