Saturday, January 21, 2017

ট্রাম্প যেভাবে তুরুপের তাসে সফল

ব্যবসায়ী থেকে এখন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সফলতার তাসে কিভাবে চাল দিতে হয় ভালোই জানা আছে তার। যার সর্বশেষ নজির দেশটির সুপ্রিম ক্ষমতায় তার আসীন। যে মধ্যবিত্ত চাকুরেরা মার্কিন অর্থনীতির বেহাল অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অভিবাসী বিদেশি কর্মীদের কাছে চাকরি খোয়াবার ভয়ে চিন্তিত, লাতিন আমেরিকা আর এশীয় শরণার্থীদের নিয়ে বিরক্ত এবং বিশেষ করে মুসলিমদের ব্যাপারে সন্ত্রস্ত।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন মধ্যবিত্তের এই মানসিকতার আঁচ পেয়ে গিয়েছিলেন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্ভুল বুঝেছিলেন, এই নাগরিক হতাশাই তার তুরুপের তাস। প্রচার–‌কৌশল সাজিয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই। নির্বাচনী জনসভায় বেপরোয়া, যথেচ্ছ গালাগাল করেছেন অভিবাসী আর শরণার্থীদের নামে। বলেছেন মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তুলে দেওয়ার কথা, মুসলিমদের আমেরিকায় ঢুকতে না দেওয়ার কথা। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট হলে, অভিবাসীদের হাতে হারানো চাকরি মার্কিনিদের ফিরিয়ে দেবেন। বিপিও–র ফোকর গলে বিদেশে পাড়ি–‌দেওয়া চাকরি আবার ফিরে আসবে আমেরিকায়। এবং লোকে ট্রাম্পের কথায় ভরসা রেখেছেন। তা না–‌হলে ভোটের আগে একের পর এক পুরনো কেচ্ছা ফাঁস, মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশের লাগাতার ব্যঙ্গ–বিদ্রুপ, নিজের দলেরই নেতৃত্বের একাংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও ট্রাম্প জিততেন না। সে যতই জনতার ভোটের হিসেবে ডেমোক্র্যাট প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটনের থেকে পিছিয়ে থাকুন, কলেজ ভোটের হিসেব তিনিই মিলিয়ে দিয়েছেন। নিউ ইয়র্কের কুইন্সের জমি–বাড়ি ব্যবসায়ী ফ্রেড ট্রাম্পের চতুর্থ সন্তান ডোনাল্ড ট্রাম্প ছোটবেলা থেকেই লাভ–ক্ষতির হিসেবে দড়। প্রখর ব্যবসাবুদ্ধি ছাড়াও মার্কিন বণিক মহলে তার পরিচয়, তিনি ‘‌রুথলেস’‌। নির্মম। নিজেই জানিয়েছেন, বাবার থেকে ‘‌মাত্র’‌ ১০ লাখ ডলার ‘‌ধার’‌ নিয়ে নিজেও জমি–বাড়ির ব্যবসায়ে নেমে পড়েছিলেন। ১৯৭১ সালে নিজেই বাবার কোম্পানির মালিক হয়ে বসেন।
তবে ফ্রেড ট্রাম্প ছিলেন নেহাতই স্থানীয় প্রোমোটার। ফ্ল্যাটবাড়ি বানাতেন কুইন্স, ব্রুকলিন এলাকায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প হাত বাড়ালেন নিউ ইয়র্কের উচ্চবিত্তদের এলাকা ম্যানহাটানের বড় বড় প্রজেক্টে। ছোট ফ্ল্যাটবাড়ি নয়, বড় বড় টাওয়ার বানাতে শুরু করলেন। লাভের অঙ্ক একশ’ গুণ হয়ে গেল। এখন নিউ ইয়র্কে ট্রাম্পের বানানো সেই সব টাওয়ারই বিখ্যাত এবং বিত্তশালীদের প্রথম পছন্দ। কাজেই অবাক হওয়ার কিছু নেই যে প্রাক্তন মডেল, ট্রাম্পের তৃতীয় স্ত্রী, আমেরিকার ‘‌ফার্স্ট লেডি’‌ মেলানিয়া ম্যানহাটান ছেড়ে হোয়াইট হাউসে থাকতে চান না। ভবিষ্যতে মেলানিয়া হয়তো যাতায়াত করবেন ‘‌রাষ্ট্রপত্নী’‌ হওয়ার সরকারি দায়িত্ব থেকে বিলাস–বৈভবের জীবনে, কিন্তু শপথ নেওয়ার আগে ছেলেদের আলাদা করে দিয়েছেন ট্রাম্প। জানিয়েছেন, তার বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের ‘‌পূর্ণ’‌ দায়িত্ব তিনি দুই ছেলে ডোনাল্ড জুনিয়র এবং এরিকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। সেই ব্যবসা নিয়ে ছেলেদের সাথে তার আর কোনো কথা হবে না, নিশ্চিত করে দিয়েছেন ট্রাম্প। পাছে লোকে বলে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে তিনি নিজের ব্যবসার সুবিধে করে দিচ্ছেন!‌ অবশ্য ট্রাম্পের সরকারে লাখপতি, কোটিপতিদের ছড়াছড়ি। এবং নিজের লোকেদের দূরে রাখার আদর্শও সেখানে ধোপে টিকছে না,
কারণ নিজের জামাতা জ্যারেড কুশনার–কে অন্যতম উপদেষ্টা নিয়োগ করেছেন ট্রাম্প। তার আরও কিছু নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন, বহুজাতিক বিপুলায়তন জ্বালানি সংস্থা ‘‌এক্সন মোবিল’‌–এর প্রাক্তন সিইও রেক্স টিলারসন–কে বিদেশ সচিব নিযুক্ত করা বা প্রাক্তন নৌসেনা জেনারেল জেমস ম্যাটিস–কে প্রতিরক্ষা সচিবের পদে বসানো। তাও লোকের ভরসা আছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, শপথ নেওয়ার সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করবেন। সবাই তাকিয়ে আছেন সেদিকেই। কারণ, লোকে কী চায়, সেটা ট্রাম্প খুব ভাল বোঝেন। ১৯৯৬ থেকে ২০১৫, টানা ২০ বছর মিস ইউনিভার্স, মিস ইউএসএ, মিস টিন ইউএসএ সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার একচেটিয়া স্বত্ব ছিল ট্রাম্পের হাতে। ডোনাল্ড ট্রাম্প জানেন, লোকে কী খায়।

No comments:

Post a Comment