আগামী
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন ইস্যুতে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কর্মসূচি পালন
করা হবে। একই সঙ্গে তিনশ’ আসনে দলীয় প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার
প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির নেতারা। সে ক্ষেত্রে প্রতি আসনের তালিকায় একাধিক
প্রার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ
বৃদ্ধি এবং দল পুনর্গঠনের বিষয়টি আরও গতিশীল করছেন দলের নেতারা। রাজধানীতে
সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে দু’ভাগ করে যে কোনো সময় ঘোষণা হতে পারে ঢাকা মহানগর
বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণের কমিটি। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের নাম
প্রকাশের সম্ভাবনাও আছে। এ নিয়ে পুরোদমে কাজ চলছে। একই সঙ্গে সবার
অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও অবাধ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলনের
জন্য দলটি ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রে এসব তথ্য
জানা গেছে। আগামী নির্বাচনে দলের প্রস্তুতির বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা
ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিরপেক্ষ
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীন সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু এবং
সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এটা হলে তো আমাদের নির্বাচনে যেতে কোনো
সমস্যা নেই।
বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। আমরা নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতা
পালাবদলে বিশ্বাস করি। বিএনপির মতো বড় ও জনপ্রিয় দলের পক্ষে নির্বাচনের
জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নিতে হয় না। আমরা সব সময় একটি গ্রহণযোগ্য ও
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত।’ দলটির একাধিক নেতা বলেন, ইতিমধ্যে
স্বাধীন কমিশন গঠনের ব্যাপারে বিএনপি কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তাদের
দাবির পক্ষে দেশের অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও একমত পোষণ করেছে। সে
অনুযায়ী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক রাষ্ট্রপতিও নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে
বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে যাচ্ছেন।
রাষ্ট্রপতি নিজেও বারবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিও চান সব দলের
অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতির
বক্তব্যেও তা উঠে এসেছে। তাই নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি
চলমান যে রাজনৈতিক সংকট রয়েছে তা সমাধান করবেন। তবে দলের সিনিয়র নেতাদের
মধ্যে এ নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে। দলটির নেতারা মনে করেন, শুধু স্বাধীন কমিশন
হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। দেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো দলীয়
সরকারের অধীন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হয়নি। এ বিষয়টিও তারা মাথায় রাখছেন।
রাষ্ট্রপতির সংলাপের পর যদি দেখা যায়, সার্চ কমিটি বা নির্বাচন কমিশন গঠনে
রাজনৈতিক দলগুলোর মতের প্রতিফলন ঘটেনি, সে ক্ষেত্রে বিএনপি আন্দোলনের
কর্মসূচি নিয়েও চিন্তা করছে। তবে সে কর্মসূচিও হবে শান্তিপূর্ণ।
বিএনপির
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সবকিছু
নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশন গঠন পর্যন্ত। প্রথম হল সার্চ কমিটি গঠন। এর
মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারব সরকারের মনোভাবটা কী। আর নির্বাচন কমিশন গঠনের
পর আমরা বুঝতে পারব সরকারের পরিকল্পনা কী। আগের মতো রকিবউদ্দীন মার্কা
(বর্তমান কমিশন) নির্বাচন কমিশন গঠন করলে, আগের মতোই হবে। অতএব এ নিয়ে দলের
সর্বোচ্চ ফোরামে আলাপ-আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে। জানা গেছে,
প্রথমেই স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টিতে সভা-সেমিনার
করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও যোগাযোগ রাখছে দলটি। দাবি অনুযায়ী,
নির্বাচন কমিশন গঠন না হলে দলটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনেও নামতে পারে। একই
সঙ্গে দলের হাইকমান্ড নির্বাচনের কাক্সিক্ষত ফল পেতে তিনশ’ আসনেই দলের
প্রার্থী তালিকাও তৈরি করছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি আসনে একাধিক
যোগ্যপ্রার্থী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। মামলার কারণে কোনো নেতা যদি
প্রার্থী হিসেবে অযোগ্য বিবেচিত হন সে ক্ষেত্রে তালিকার দ্বিতীয় ব্যক্তিকে
ধানের শীষের প্রার্থী করা হবে। একই সঙ্গে জোট নেতাদের জন্য কোন কোন আসনে
ছাড় দেয়া হবে, তা নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে
সরকারে গেলে বিএনপি কী কী জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ করবে- এসব নিয়েও প্রস্তুতি
চলছে। বর্তমান সরকারের আমলে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যেসব সাংবিধানিক
প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সেখানে যোগ্যদের নিয়োগ দিয়ে ঢেলে
সাজানো হবে- এমন পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির। নেতারা বলেন, আগামী নির্বাচনে
দেশের মানুষ বিএনপিকে কেন ভোট দেবে, তার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে
সভা-সমাবেশ ও সেমিনারে দলটির নেতারা বক্তব্য দেবেন। বিশেষ করে, দেশে
গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহিতামূলক সরকার প্রতিষ্ঠা, ভোটের অধিকার
নিশ্চিত করার বিষয় বক্তব্যে তুলে ধরা হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যুগান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিউ
টাইমে নির্বাচন হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনটা তো ডিউলি হয়নি, ওটা
তো একটা সিলেকশন। ১৪ দলীয় জোট এর সঙ্গে এরশাদের জাতীয় পার্টিও রয়েছে। ওই
নির্বাচনটা তো ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে আসন ভাগাভাগির সিলেকশন। তারা যদি ৩০০
আসনে ইলেকশন করত তাহলেও তো বোঝা যেত ওটা একটা নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি
যায়নি। এর পরও সব আসনে নির্বাচন হয়নি। ১৫৩ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি
হয়েছে। তাই বলব, যখনই নির্বাচন হয়, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সরকারের
ভূমিকাটাই হচ্ছে প্রধান।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ
চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, আমরা দেশে শান্তি ও স্থিতিশীল পরিবেশ দেখতে চাই।
সেজন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। দেশের মানুষও তাই চায়। আমরা সামনের
দিনগুলোতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নষ্ট রাজনীতির বিপরীতে পজেটিভ রাজনীতি
দিয়ে মোকাবেলা করব। যার কারণে বিএনপিকে দেশের মানুষ পছন্দ করে। সামনের দিনে
এটা হবে বিএনপির বড় একটি কাজ। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগরের
যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আউয়াল মিন্টু যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি নির্বাচনের জন্য
সব সময়ই প্রস্তুত। এর উদাহরণ হচ্ছে ‘৯১ সাল। আওয়ামী লীগ সেবার কোনো
পাত্তাই পায়নি। জানা মতে ওই সময় ২০-২৫ জেলাতে বিএনপির সংগঠনই ছিল না। তার
পরেও বিএনপি জয়লাভ করেছে। বিএনপি কোনো ভাঙাচোরা দল নয়। দেশের সবচেয়ে
জনপ্রিয় দল। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বিএনপিতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা
হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির
নির্বাচনটা হচ্ছে সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। আরেকটি নির্বাচন সহসাই হবে।
প্রধানমন্ত্রী তো তার অবস্থান থেকে সরে গেলেন। সমস্যা তো ওখানে। সংসদীয়
অসনগুলোতে আমাদের দুই-তিনজন করে যোগ্য প্রার্থী রয়েছে। কোনো কোনো স্থানে
তার চেয়েও বেশি। তিনি বলেন, আমি মনে করি, রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সবার। তিনি এমন
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন, যার ওপর সবার আস্থা ও বিশ্বাস
থাকবে। আমরা আশা করি রাষ্ট্রপতি দেশের স্বার্থে ইসি গঠনে সঠিক পদক্ষেপটাই
নেবেন।

No comments:
Post a Comment