গত
৫ জানুয়ারি যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু
নির্বাচনের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসনই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন স্থানীয়
সরকার বিশেষজ্ঞসহ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য
নির্বাচনের জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন (ইসি) অপরিহার্য, কিন্তু শুধু
এটাই যথেষ্ট নয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সবচেয়ে
জরুরি নিরপেক্ষ প্রশাসন। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকার এবং তার রূপরেখা ও
ভূমিকা কেমন হবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে কড়া পাহারায় ভোট গ্রহণ ও
সঠিকভাবে গণনা করে প্রকৃত ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে সামগ্রিক যে প্রশাসনিক
ব্যবস্থা দায়িত্ব পালন করে থাকে তার গুরুত্ব অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে
না। বিভিন্ন ব্যারোমিটার বিবেচনায় নিয়ে তারা মনে করেন, শুধু ইসির একার
পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় ইসি যতই
শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হোক না কেন, নির্বাচনকালীন প্রশাসন কোনো পক্ষ নিয়ে
কাজ করলে নির্বাচন কমিশন তা প্রতিহত করতে পারবে না। তারা আরও মনে করেন,
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানেন, যে সরকার ক্ষমতায় আসবে সে সরকারই তাদের রক্ষা
করাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে। তাই ইসি কোনো শাস্তি
দিলেও শেষমেশ তা কার্যকর করতে পারবে না। সঙ্গত কারণে প্রশাসনের যারা
বেনিফিশিয়ারি তারা নিজেদের স্বার্থেই সরকারের পরিবর্তন চাইবেন না। কেননা,
সরকার পরিবর্তন হলে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তাই জেনেশুনে কেউ এ
রকম ঝুঁকি নেবেন না। বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উপরোক্ত মতের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। তাই এযাবৎ
দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত কোনো জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কোনো দল পরাজিত
হয়নি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ওই
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় সম্পর্কে কোনো সন্দেহ না থাকলেও দলীয় স্বার্থে
সরকার রাষ্ট্রীয় রেডিও-টেলিভিশন, যানবাহনসহ পুরো প্রশাসনকে ব্যবহার করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দু’জন জেনারেল সামরিক ও বেসামরিক
পোশাকে ১৫ বছর দেশ শাসন করেন। বেসামরিক পোশাকে রাজনৈতিক দল গঠন করে তারা যে
তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, সেসব নির্বাচনে জয়লাভের
জন্য তারা প্রশাসনকে কাজে লাগান। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন
আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে
বিএনপি।
১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পুনঃপ্রতিষ্ঠা
করা হয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি। প্রশাসনকে দলীয়করণের মাধ্যমে পরবর্তী জাতীয়
সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে বিএনপি সরকার গঠনের এক
বছর পার হতে না হতেই প্রয়োজনীয় শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের
প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব
পদে সাতশ’র বেশি কর্মকর্তাকে একসঙ্গে পদোন্নতি দিয়ে নজির সৃষ্টি করে। দলীয়
স্বার্থে পদোন্নতি প্রদানের যে উদাহরণ বিএনপি সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে সপ্তম
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে।
১৯৯৬ সালের সপ্তম ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যথাক্রমে
বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রশাসনে
নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সক্ষম হওয়ায় প্রশাসনকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় যাওয়ার
আশা পূরণ হয়নি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি
বাংলাদেশ সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের সব স্তরে দলীয়করণের নতুন মাত্রা যোগ করে।
স্বাধীনতার পর চাকরিতে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা ‘আওয়ামীপন্থী’
হিসেবে বহুল পরিচিত ছিল, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় ১৯৭৪ সালের
গণকর্মচারী (অবসর) আইনের অপব্যবহার করে তাদের চাকরি থেকে অবসর প্রদান করা
হয়। ২০০৭ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে
ক্ষমতাসীন বিএনপি প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নেয়। নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে
প্রশাসনের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে ডিসি, এসপি,
ইউএনও, ওসি ইত্যাদি পদে নিজেদের পছন্দসই লোক রাখতে প্রতিটি পদের বিপরীতে
একাধিক বিকল্প কর্মকর্তার তালিকা তৈরি করা হয়, যাতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের সময়ে প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হলেও তাদের নিজেদের লোক এসব পদে
থাকে।
তবে বহুল আলোচিত ১/১১-এর কারণে তাদের সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ২০০৯ সালে
ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার প্রয়োজনীয় শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও
দলীয় স্বার্থে পদোন্নতি প্রদান শুরু করে এবং সে ধারা বর্তমানেও বহাল রয়েছে।
জনপ্রশাসনে পদোন্নতি, পদায়ন ইত্যাদিতে দলীয়করণ এযাবৎকালের ইতিহাসে
সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেকে মনে করেন, প্রয়োজনীয় শূন্যপদ না থাকা
সত্ত্বেও পদোন্নতি দিয়ে আওয়ামী লীগ আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে
পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার সমর্থন পেতে চায়। গত ৮ জানুয়ারি যুগান্তরের
প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সরকারের গত তিন বছরে প্রশাসনের
প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে চার স্তরের পদে (সচিব, অতিরিক্ত সচিব,
যুগ্মসচিব ও উপসচিব) পদোন্নতিতে অনিয়ম, দলীয়করণ ও পদায়নে বিশৃংখলার এক
চিত্র ফুটে উঠেছে। গত তিন বছরে প্রশাসনের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও
উপসচিব পদে মোট ১ হাজার ৮০০ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এতে
প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার
কর্মকর্তা। এ সময়ে গড়ে প্রতি বছর অন্তত ৩৫০ জন কর্মকর্তাকে বিশেষ
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়। এসব কর্মকর্তার অধিকাংশই বিএনপি
নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ও ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া
প্রশাসনের উপর্যুক্ত চার স্তরে মঞ্জুরিকৃত ১ হাজার ৬১৬ পদের বিপরীতে আছেন ২
হাজার ৭৪১ কর্মকর্তা। অর্থাৎ পদ ছাড়াই কর্মরত ১ হাজার ১২৫ জন। উল্লেখ্য,
সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ১৩৩ প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মচারীদের, এখানে কর্মচারী
বলতে কর্মকর্তাও বোঝাবে) নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নির্ধারণে জাতীয় সংসদ
কর্তৃক আইন প্রণয়নের নির্দেশনা থাকলেও এবং আওয়ামী লীগ এ ধরনের আইন পাসের
প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত তা পূরণ হয়নি। প্রশ্ন উঠতে পারে, নির্বাচনে
সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কেন? সংবিধান জাতীয় সংসদ
নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করলেও কমিশনের পক্ষে এ
নির্বাচন পরিচালনা করে মূলত মাঠ প্রশাসন।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এ সংসদ
নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে কাকে নিয়োগ
দেয়া হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা না থাকলেও কমিশন কর্তৃক
ডিসিকে রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনওকে সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ প্রদান
একটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাস্তবে তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তাদের এ কাজের
জন্য অপরিহার্য করে তুলেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে
রিটার্নিং অফিসার মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিসাইডিং অফিসার,
সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের নিয়োগ দেন। এ আদেশে প্রদত্ত
ক্ষমতাবলে একজন রিটার্নিং অফিসার তার কর্তৃত্বাধীন এলাকায় সুষ্ঠুভাবে
নির্বাচন পরিচালনার স্বার্থে প্রয়োজনীয় যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
প্রতিটি কন্সটিটুয়েন্সিতে একজন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়।
তিনি রিটার্নিং অফিসারকে তার দায়িত্ব পালনে সব ধরনের সহায়তা প্রদান করেন।
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক কোনো শর্ত আরোপ সাপেক্ষে তিনি রিটার্নিং অফিসারের
নিয়ন্ত্রণে থেকে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা ভোগ ও কার্যাবলী সম্পন্ন করেন।
নির্বাচনের সময় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসিসহ পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃংখলা
বাহিনী। ডিসি, ইউএনও, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এসপি, ওসি- এসব কর্মকর্তার
নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের পদোন্নতি, বদলিসহ তাদের বিরুদ্ধে শৃংখলামূলক
ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকায় সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদের
দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। তাই নির্বাচন কমিশন যতই
শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হোক, নির্বাচন পরিচালনাকারী মাঠ প্রশাসনের
কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ না থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
সবশেষে যা বলতে চাই তা হল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশে অবাধ, সুষ্ঠু ও
নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই।
সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ
হলে জনগণ ভয়ভীতি ছাড়া এবং প্রভাবমুক্ত থেকে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে
পারেন। ফলে নির্বাচিত সংসদে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। নির্দলীয়
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও
নিরপেক্ষ হওয়ায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। এতে দেশের সুনাম
বাড়ে। সংসদ নির্বাচনের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এসবের বড়
ভাগীদার হয়ে পড়ে প্রশাসন। আগামীতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা
পরোক্ষভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন, তারা যেন
কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা ব্যবহৃত না হন। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনগুলো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে
পরিচালনা করে প্রশাসন যে সুনাম অর্জন করেছে, তা যেন কোনোক্রমেই ক্ষুণ্ণ না
হয়। একইসঙ্গে গণতন্ত্র বিকাশের পথকে সুগম করতে এবং গণতন্ত্রকে
প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে সহায়তা করতে ক্ষমতাসীন দলকে নির্বাচনে
প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে হবে।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com
আবদুল লতিফ মন্ডল : সচিব, কলাম লেখক
latifm43@gmail.com

No comments:
Post a Comment